সত্যেন্দ্রনাথ
বসুর শিক্ষাচিন্তা
মোহাম্মদ
নূরে আলম সিদ্দিকী
মাহবুব
আহসান খান
সত্যেন্দ্রনাথ
বসু ‘সত্যেন বোস’ বা ‘বিজ্ঞানী বোস’ নামেই বেশি পরিচিত। ১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি উত্তর
কোলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলের পাশে ২২ নম্বর ঈশ্বর মিল লেনে তাঁর জন্ম।১ পিতা সুরেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন
রেলওয়ের হিসাবরক্ষক এবং মাতা আমোদিনী দেবী ছিলেন গৃহিণী। সত্যেন্দ্রনাথ
শিক্ষাজীবন শুরু করেন নর্মাল স্কুলে; তবে
এন্ট্রাস ক্লাসে পড়াশোনা করেন হিন্দু স্কুলে। ১৯০৯
খ্রিস্টাব্দে তিনি এন্ট্রাস পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১১
খ্রিস্টাব্দে আইএসসি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে বিএসসি (গণিতে অনার্স) এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে
এমএসসি (মিশ্র গণিতে) পাস করেন। তিনটি পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম
স্থান অধিকার করেন। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, অধ্যাপক ডি এন মল্লিক, অধ্যাপক শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায়
প্রমুখ যশস্বী ব্যক্তিকে তিনি শিক্ষকরূপে পেয়েছিলেন। সহপাঠী
ছিলেন মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানচন্দ্র
ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, নিখিলরঞ্জন সেন, পুলিনবিহারী সেন, শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ প্রমুখ। উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ উত্তরকালে
বিজ্ঞান গবেষণায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
সত্যেন্দ্রনাথের
কর্মজীবন শুরু স্যার আশুতোষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান কলেজে পদার্থবিদ্যা
ও ফলিত গণিত বিষয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে।
১৯২১ সালে
তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার রিডার হিসাবে যোগ দেন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ‘বোস সংখ্যায়ন’ সম্পর্কিত সত্যেন্দ্রনাথের গবেষণাপত্রটি
বিজ্ঞানী আইনস্টাইন অনুবাদ করে একটি জার্মান পত্রিকায় প্রকাশ করলে বিজ্ঞানজগতে ব্যাপক
সাড়া পড়ে এবং তা সত্যেন্দ্রনাথের বিশিষ্ট অবদানরূপে স্বীকৃত হয়। ১৯২৪ সালে তিনি দু-বছরের জন্য
ইউরোপ যান। এ সময় তিনি মাদাম কুরির ল্যাবরেটরিতে
ও জার্মানিতে কাজ করেন এবং মাদাম কুরি, আইনস্টাইন, অটো হান, মাইনার প্রমুখ বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর
ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে আসেন। অতঃপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীকালে বিজ্ঞান অনুষদের ডীন হন। তিনি ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয়
বিজ্ঞান কংগ্রেসের পদার্থবিদ্যা শাখার সভাপতিত্ব করেন এবং ১৯৪৪ সালে মূল সভাপতি নির্বাচিত
হন। সত্যেন্দ্রনাথ ১৯৪৭ সালে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৫৬
খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ইমেরিটাস প্রফেসর নিয়োগ দেয়। এরপর তিনি বিশ্বভারতীয় উপাচার্য
হিসেবে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি পদার্থবিদ্যায়
ভারতীয় জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন। সত্যেন্দ্রনাথ ১৯৭৪ সালে মৃত্যুবরণ
করেন।
বিজ্ঞানী
সত্যেন্দ্রনাথ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দেন। তিনি ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে
‘হিরোশিমা-নাগাসাকি দিবস’ উপলক্ষে জাপানে আয়োজিত আন্তর্জাতিক ‘বিজ্ঞান
ও দর্শন’ সম্মেলনসহ বিশেষ আমন্ত্রণে বিভিন্ন
দেশে শান্তি-সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলেন।
বিজ্ঞানী
সত্যেন্দ্রনাথ ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন-ভাষণ প্রদান করেন। তাঁর এসব ভাষণের বেশির ভাগের
বিষয়ই ছিল শিক্ষা। এছাড়াও তিনি ‘জগদীশচন্দ্র স্মারক বক্তৃতা’, ‘মেঘনাদ সাহা স্মারক বক্তৃতা’, ‘মহেন্দ্রলাল স্মারক বক্তৃতা’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কিছু ভাষণ
প্রদান করেন। ‘শিক্ষা’ বিষয়ে সত্যেন্দ্রনাথের প্রাতিষ্ঠানিক
পড়াশোনা না থাকলে দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিজ্ঞতা এবং প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের
বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ তাঁকে আধুনিক দৃষ্টিবঙ্গিসহ শিক্ষা-বিশ্লেষণে উদ্বুদ্ধ করেছে। ১৯৪৭ সালে কোলকাতায় ফিরে যাওয়ার
পরই তাঁর শিক্ষাচিন্তা মূলত পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতকেন্দ্রিক
হয়ে পড়ে। সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক নৈকট্যের
কারণে তাঁর এই শিক্ষাচিন্তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তির
জীবনে শিক্ষার গুরুত্ব ও অপরিহাযৃতা সম্পর্কে কারো কোন দ্বিমত না থাকলেও শিক্ষার লক্ষ্য
কী হবে সে বিষয়ে দার্শনিক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে মতভেদ বিদ্যমান। এ মতভেদ অস্বাভাবিক নয় কারণ শিক্ষার
লক্ষ্য সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে জীবনের লক্ষ্যের উপর। অন্যদিকে
দেশ-জাতি-সময়ভেদে কিংবা সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পট পরিবর্তনে জীবনের লক্ষ্য পরিবর্তিত
হয়। শিক্ষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে
দেখা যায় যে,
বিভিন্ন
যুগে বিভিন্ন দেশে শিক্ষার লক্ষ্য বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। প্রাচীন
ভারতে শিক্ষার লক্ষ্য ছিল মোক্ষ বা মুক্তি।২
প্রাচীন গ্রিসে সোফিস্টদের কাছে শিক্ষার লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে পূর্ণভাবে
বিকশিত করা। সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল প্রমুখের প্রভাবে
এথেন্সে শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে দাঁড়ায় : ব্যক্তির রুচি, প্রকৃতি ও সামর্থ্য অনুযায়ী তার
অভ্যন্তর সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো।
একই সময়ে
স্পার্টায় ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী শিক্ষাব্যবস্থা। সেখানে
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিবর্তে শিক্ষার লক্ষ্য ছিল সুসংবদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্রীয় জীবন
গঠন। এথেন্সে সুসংহত সমাজ জীবনের প্রয়োজনীয়তাকে
অবহেলা করা হয়েছিল, ফলে
অধিকতর সমাজবদ্ধ প্রতিবেশী রাষ্ট্র স্পার্টার আক্রমণে এথন্সের পতন ঘটে। গ্রিক ও রোমান সভ্যতার পতনের
পর ইউরোপে শিক্ষাক্ষেত্রে অন্ধকার মেনে আসে।
এ সময়ে
ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থা খ্রিষ্টধর্মের অনুশাসনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত। রেনেসাঁর প্রভাবে এই শিক্ষা ব্যবস্থার
প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দেয় দুটি আন্দোলন : মানবতাবাদ ও প্রকৃতিবাদ। মতবাদ দুটির মধ্যে কোন মৌলিক
বৈসাদৃশ্য না থাকলেও তাদের পদ্ধতি ও প্রতিপাদ্য ছিল ভিন্ন। আন্দোলন
দু’টির প্রভাবেই কালক্রমে পৃথিবীর
বিভিন্ন দেশে শিক্ষার লক্ষ্য, প্রকৃতি
ও পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়। বিংশ শতাব্দীতে প্রয়োগবাদ শিক্ষার
লক্ষ্য নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার
লক্ষ্য সম্পর্কে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক একমত না হলেও কয়েকটি সুপ্রচলিত লক্ষ্যের
কথা উল্লেখ করা যায়। এগুলো হলো: ব্যক্তিগত সঙ্গতিবিধান, সমাজ সংরক্ষণ, জ্ঞানমূলক উন্নয়ন, কৃষ্টিমূলক ঔৎকর্ষ, চরিত্র গঠন, সুনাগরিকতা, জীবিকা নির্বাহের যোগ্যতা অর্জন, সম্পূর্ণ জীবনযাপন ও সামাজিক
যোগ্যতা অর্জন। অন্যদিকে শিশুর বিকাশ প্রক্রিয়ার
উপর ভিত্তি করে শিক্ষার লক্ষ্যকে প্রকাশ করা যায় এভাবে: ‘‘... শিশুর শারীরিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক, সামাজিক এবং নৈতিক দিকগুলির সম্পূর্ণ
বিকাশ সাধনের মাধ্যমে তার ব্যক্তিসত্তার সুষ্ঠুতম ও সর্বোত্তম পরিণতিতে পেঁঁৗঁছাতে
তাকে সাহায্য করে ’’।৩ প্রাচীন ভারতে মোক্ষ বা মুক্তিকেন্দ্রিক
শিক্ষায় পার্থিব জীবনকে মিথ্যা মনে করে ঈশ্বরকে জানাই ছিল পরম সত্য। মধ্যযুগে মুসলিম শাসনামলে ধর্মকেন্দ্রিক
ইসলামি শিক্ষা বিকাশ লাভ করে। এ শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য ছিল
শিক্ষার্থীকে কোরানের অনুশাসন অনুযায়ী সত্যিকারের মুসলমানরূপে গড়ে তোলা।৪ একই সমেয় হিন্দুসমাজে স্বতন্ত্র
একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত ছিল যা ‘টোল’ নামে পরিচিতি। এ ধরনের টোলে গণিত, বিজ্ঞান বা অন্যান্য বিষয় পাঠদান
করা হলেও এ ব্যবস্থা শিক্ষার লক্ষ্য পূরণে সক্ষম ছিল না। ১৮৩৫
সালে ইংরেজদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ভারতবর্ষে পাশ্চাত্যশিক্ষা প্রবর্তিত হলেও এ
শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ইংরেজি-অভিজ্ঞ কর্মচারি তৈরি করা। ফলে
ইংরেজ শাসনামলে শিক্ষা এ দেশের মানুষের জন্য তেমন কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনি। বস্তুত, প্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে
শিক্ষাব্যবস্থা সঠিক লক্ষ্যানুসারী না হয়ে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবে ভিন্নখাতে প্রবাহিত
হয়েছে। ফলে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে
শিক্ষার ক্ষেত্রে এর প্রকৃত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত, তা
নিরূপণ করা অত্যাবশ্যক হয়ে ওঠে।
সত্যেন্দ্রনাথ
ভারতে শিক্ষার লক্ষ্য সম্পর্কে তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি
১৯৬২ সালে অক্টোবর মাসে হায়দারাবাদে অনুষ্ঠিত ‘আংরেজী
হঠাও’ সম্মেলনে বলেন, ‘‘আমাদের প্রয়োজন দেশের লোকদের
শিক্ষিত করা,
যে সমস্ত
বস্তু জ্ঞান তাদের কাজে লাগে, তাদের
নীরোগ রাখে, বিত্তশালী করে, তাদের মুখের খাবার যোগায়- সেই
জ্ঞান দেশের সর্বত্র স্বল্প আয়াসেই যেন পাওয়া যায়, এটাই
আমি চাই’’।৫ সত্যেন্দ্রনাথের এ বক্তব্য
থেকে শিক্ষার যে লক্ষ্য পাওয়া যায় তা হলো : জীবিকা নির্বাহের যোগ্যতা অর্জন ও মানুষের
শারীরিক বিকাশ। তিনি মনে করতেন প্রাচীন ভারতীয়
সভ্যতার অবনতির জন্য দায়ী ধর্মীয় দর্শনের ভিত্তিতে পরিচালিত শিক্ষা। এ প্রসঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ ‘শিক্ষা ও বিজ্ঞান’ শীর্ষক ভাষণে বলেন:
নালন্দা
ও তক্ষশীলার মতো আমাদের শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতে ধারাবাহিকভাবে যে পারলৌকিকতার পোষকতা করা
হত- যা ছিল আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতির মেরুদণ্ডস্বরূপ - তাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত
শাশ্বত সত্যের অতন্দ্র মনন, চিন্তন, নিদিধ্যাসনের উপরে। এরই ফলে ব্যক্তিবিশেষ আত্মজ্ঞান
লাভ করতে এবং পৃথিবীকে দু’দিনের
পান্থশালা মনে করতে সক্ষম হতেন। আর এই উপলব্ধি তাঁকে ব্যাকুল
করে তুলত এই জীবনের দুর্ভোগ ও পরীক্ষা থেকে মুক্তিলাভের জন্য। এ ধরনের মনন চিন্তনের দার্শনিক
উৎকর্ষ আমরা যতই তারিফ করি না কেন এ কথা অস্বীকার করবার যো নেই যে, এ জগৎ দুদিনের পান্থশালা, ক্রমাগত এই প্রচার পার্থিব ব্যাপারে
ঔদাসীন্যের উদ্র্যেক করেছে। ভারতীয়রা এরই জন্য শীঘ্রই জাগতিক
ব্যাপারে আধিপত্য হারাল এবং অনতিবিলম্বে পরাস্ত ও পর্যুদস্ত হয়ে গেল বর্বরদের হাতে।৬
এজন্য
তিনি চেয়েছেন প্রাচীন আদর্শ-ভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে কর্মমুখী শিক্ষা। তাঁর মতে, ছাত্রদের অন্ন সংস্থানের যোগ্য
করে তোলা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব।৭ বিবেকানন্দ হিন্দুধর্ম প্রচার
করতে গিয়ে জাগতিক মঙ্গল ও শিক্ষা বিস্তারের উপর জোর দিয়েছিলেন বলে তিনি বিবেকানন্দের
প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন:
বিবেকানন্দ
বিশ্বাস করতেন যে জীবনকে উপোসী রেখে পারলৌকিক মঙ্গলের পিছনে ছুটা মরীচিকার পিছনে দৌড়ানোর
মতই নিরর্থক। খালি পেটে যে ধর্ম হয় না, তা তার আগে খুব কমজনেই এমন করে
বুঝিয়েছেন। সেইজন্য যে আন্দোলনের সূত্রপাত
তিনি করে গেলেন,
তার অন্যতম
আদর্শ ছিল সেবার মধ্য দিয়ে মানুষের মঙ্গল সাধনা এবং মানুষের মঙ্গল বলতে তিনি তার সামগ্রিক
কল্যাণ বুঝতেন। সাধারণ মানুষের জীবনের কোন অংশই
তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। শিক্ষা বিস্তার এবং নতুন ধর্মাদর্শ প্রচার দুয়েতেই তাঁর
সমান আগ্রহ ছিল।৮
সত্যেন্দ্রনাথ
তাঁর লেখায় ও বক্তৃতায় বিভিন্ন সময়ে জাপানের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেছেন যে, জাপান পাশ্চাত্যের আধুনিক জ্ঞান
আয়ত্ত করেই এত উন্নতি লাভ করেছে।৯ ‘আংরেজী হঠাও’ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি
বলেন:
স্বভাবতই
প্রশ্ন ওঠে এত অল্প সময়ে দেশের সেই দুরবস্থা থেকে বর্তমান এই অতি সম্পদের মধ্যে কি
করে জাপান আবার উঠে দাঁড়ালো। শিক্ষা ও উন্নতি ওতপ্রোতভাবে
জড়িত। আমি তাই চেষ্টা করেছিলাম জানতে
যে, সেখানে শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা
কিরকম ভাবে হয়েছে। জাপানে কম করে নয় বৎসর শিক্ষার
জন্য প্রত্যেক ছেলে ও মেয়েকে স্কুলে পাঠানো হয়। প্রায়
সকলেরই স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। এরজন্য কারুর পয়সা লাগে না।১০
অর্থাৎ
তিনি শিক্ষাকে উন্নতির পূর্বশর্ত হিসেবে দেখতেন এবং চাইতেন জাতীয় উন্নতি সাধনই হোক
শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য। তাঁর মতে, বস্তু ও সংসার সম্পর্কে উদ্ভট
ও আলৌকিক ধারণা থাকলে মানুষের জীবনযাত্রা পদে পদে ব্যাহত হয়। তিনি
মনে করতেন, শিক্ষা, বিশেষ করে বিজ্ঞানশিক্ষা সত্যকে
উদঘাটন করে বাস্তব সম্পর্কে খাঁটি ধারণা দেবে যা মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ে যাবে:
বিজ্ঞান
আমাদের এটুকু শিখতে সাহায্য করে যে, প্রকৃতির
মধ্যে যে সত্য লুকিয়ে আছে, বিজ্ঞান
সে সত্যকেই উদঘাটিত করে দেয়। আমাদের মনের বাইরে কোনকিছু ঘটে
গেলেই সেটা কোন দৈব দানবের কীর্তি হবে এমন কথা মনে করার কোন কারণ নেই। একটু বিশ্লেষণ করে দেখলে নিশ্চই
তার মূল কারণটা বেরিয়ে পড়বে। অসুখ করলেই যদি আমরা মনে করি
যে, এ নিতান্ত দৈবের ঘটনা, দেবতার সন্তুষ্টি সাধন ছাড়া আমাদের
আর কিছুই করবার নেই এতে, তবে
আমাদের টিকে থাকা শক্ত হবে।১১
শিক্ষাচিন্তায়
শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীকে সুনাগরিকরূপে গড়ে তোলার কথা বলেছেন:
এমনভাবে
আজ শিক্ষাদীক্ষার বন্দোবস্ত করা চাই-যাতে শিক্ষান্তের সঙ্গে সঙ্গে দেশের কাজের জন্য
তাদের ডাক আসে।১২
সত্যেন্দ্রনাথের
চিন্তায় মানবতাবাদের প্রতিফলনও দেখা যায় যেখানে শিক্ষাপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রে মানুষ অবস্থিত:
আমাদের
জাতীয় পতাকা জীবনের সর্বক্ষেত্রে উচ্চে তুলে ধরার জন্য যদি আমরা মিলিতভাবে চেষ্টা করি
তাহলে ছোট খাটো ভুল বোঝাবুঝি ও নির্বোধ ঈর্ষা নিশ্চিতই সহজে দূর করা যাবে। কেবলমাত্র বিদ্যা অর্জন ও জ্ঞানের
অগ্রগতিতে সহায়তা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ হতে পারে না। জাতি, ধর্ম, মতবাদ, ধনী, দরিদ্র এবং সামাজিক ও বংশমর্যাদা
নির্বিমেষে প্রত্যেক মানুষ যে মূলত এক, এই
শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রচার করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত
মানুষই যে পরম সত্য আমাদের সেই জ্ঞান হোক।
সত্যেন্দ্রনাথের
বক্তব্যসমূহ বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট যে, ধর্মীয়
আদর্শভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে তিনি চেয়েছিলেন বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মমূখী শিক্ষা। তাঁর শিক্ষাচিন্তা থেকে শিক্ষার
যে লক্ষ্যসমূহ পাওয়া যায় তা হলো জীবিকা নির্বাহের যোগ্যতা অর্জন, শারীরিক বিকাশ, জাতীয় উন্নতি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন
এবং মানুষকে সুনাগরিক ও মানবতাবাদী রূপে গড়ে তোলা।১৩
মানব-শিশু
কতগুলো সহজাত সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায় এবং সেগুলোর অভীষ্ট বিকাশই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। শিশুই শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
উপাদান। তাই যাকে শিক্ষা দেওয়া হবে তাকে
অর্থাৎ শিশুকে জেনেই তার প্রয়োজন অনুসারে, তার
রূচি, প্রবণতা ও সামর্থ্য জেনে শিক্ষা
দেওয়া উচিত। অথচ শিক্ষায় শিশুর ভূমিকা এক
সময় ছিল গৌণ। শিক্ষাদান কালে শিশু থাকত একেবারেই
নিষ্ক্রিয়, তার রুচি, আগ্রহ, প্রয়োজন, প্রবণতা - কোনকিছুই বিবেচনা না
করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জ্ঞান তার উপর চাপিয়ে দেয়া হত। মধ্যযুগের
অবসানে ইউরোপে এরূপ গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনের চিন্তা শুরু হয়। দার্শনিক রুশো প্রথম এব্যাপারে
বৈপ্লবিক মত প্রদান করলেন। তাঁর মতে, শিক্ষা হবে শিশুর প্রকৃতি অর্থাৎ
শিশুর মনের ইচ্ছা, আগ্রহ, প্রকৃতিদত্ত শক্তি সামর্থ্য, পছন্দ, প্রক্ষোভ, প্রবৃত্তি ও অনুভূতি অনুযায়ী। শিক্ষা দেবার আগে প্রত্যেক শিশুকে
ভালো করে জানা দরকার।১৪ রুশোর এ মতবাদকে বাস্তবে প্রয়োগ করে শিশুকেন্দ্রিক মনোবিজ্ঞানভিত্তিক
শিক্ষার আন্দোলন শুরু করেন পেস্টালৎসি যা আরও এগিয়ে নেন হার্বার্ট ও ফ্রয়েবল।১৫ বিংশ শতাব্দীতে ফ্রান্সিস
পার্কার, জন ডিউই প্রমুখ শিক্ষাবিদ শিশুকেন্দ্রিক
শিক্ষার আন্দোলনের ঢেউ অনেক পরে এসে পৌঁছালেও রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধি শিশুকেন্দ্রিক
শিক্ষা পরিকল্পনার অনুসরণে যথাক্রমে ‘পাঠভবন’ ও ‘বুনিয়াদী বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন।১৬ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথের
চিন্তাতে শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতির প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। ‘শিশু ও বিজ্ঞান’ শীর্ষক প্রবন্ধে সত্যেন্দ্রনাথ
শিশুর বিজ্ঞান শিক্ষা সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি
শিক্ষার্থীর মনে প্রথমে কৌতূহল জাগ্রত করে বা প্রেষণা সৃষ্টি করে বিজ্ঞান শিক্ষাদানের
কথা বলেছেন:
জ্ঞান
উন্মেষের পর শিশু যখন তার চারপাশের জগতের দিকে তাকিয়ে দেখে তখন মন তার চরম বিষ্ময়ে
ভরে ওঠে। চারপাশে যা কিছু দেখে সবাই তার
কাছে রহস্যময় মনে হয়, তার
কৌতূহলী মনে কত প্রশ্নই না জাগে। এজন্যে শিশুদের শিক্ষার ভার যাদের
হাতে আছে, তাদের উচিত সাধারণত হাতের কাছে
যেসব জিনিস পাওয়া যায়, যা
ছোট ছেলেমেয়েদের মনকে আকর্ষণ করে - যে কোন ফুল, লতাপাতা, পাখি এমন সব টুকরো জিনিসের উপর
নজর দিতে শেখানো। কাজ অবশ্য শক্ত। শিক্ষকদের নিজেদের মনকে ছোটদের
কৌতূহলী মনের রসে রসিয়ে নিতে হবে। তার জন্য চাই শিক্ষকদের একটা
স্বাভাবিক ক্ষমতা অর্জন করা, যাতে
তাঁরা ছাত্রদের সঙ্গে সহজে মিশতে পারেন।১৭
তাঁর
মতে, ভারি ভারি বই পড়িয়ে, বড় বড় কথা বলে শিশুর মনে আতঙ্ক
জাগ্রত করা যায় অথবা কেবল পরীক্ষার খাতায় মুখস্থ কিছু কথার উদগীরণ পাওয়া যায় কিন্তু
তাতে বিজ্ঞান শেখা হয় না। তিনি চাইতেন সাধারণ তথ্যগুলির
সাথে ছাত্রদের সরাসরি পরিচয় হোক।১৮ অর্থাৎ বিজ্ঞান শিক্ষাদানে
তিনি ‘সহজ থেকে কঠিন’ এই নীতির সমর্থক ছিলেন।১৯
শিক্ষা
নিছক তথ্য আহরণ নয়-সত্যেন্দ্রনাথ বসু বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে তা বলেছেন। শিক্ষাবিদ জন ডিউই শিশুর শিক্ষাদানে
শিশুকে যে স্বাধীনতা দান ও সক্রিয়তা ভিত্তিক শিক্ষা বা কাজের মধ্য দিয়ে শেখার কথা বলেছেন
তার প্রতিফলন পাওয়া যায় সত্যেন্দ্রনাথের লেখায়:
প্রকৃতির
সঙ্গে পরিচয় রাখতে গেলে শিশুর মনে সবার আগে জাগিয়ে তুলতে হবে কৌতূহল। তাদের নতুন নতুন নতুন জিনিস সংগ্রহ
করার ভার নিতে হবে। হয়তো একটু আধটু রেষারেষির মধ্যেই
সে সব জিনিসের চলবে সংগ্রহ, আর
এমনি করেই প্রকৃতির সঙ্গে যোগটা তাদের ঘনিয়ে উঠবে। পল্লীগ্রামের
স্কুলে আরও একটু সুবিধে হতে পারে। এসব ছোট ছোট কাজ সারা হওয়ার পর
পেঁয়াজ ছোলা মটরা যে যেমন ভালবাসে তাকে তার বাগান তৈরি করবার ভার দেওয়া।২০
এপ্রসঙ্গে
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন যে, কারো
শেখানো কথার উপর নির্ভর না করে তাদের উচিত নিজে নিজে জানার চেষ্টা করা। আধুনিক শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার
অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঘনিষ্ট শিক্ষক শিক্ষার্থী সম্পর্ক।২১ আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক শিক্ষার্থীর সহায়করূপে কাজ
করবেন এবং বাস্তব পরিবেশ থেকে শিক্ষার্থীকে অভিজ্ঞতা আহরণে সাহায্য করবেন। সত্যেন্দ্রনাথের চিন্তায় এর প্রতিপলন
পাওয়া যায়:
বেশি
বয়সের ছেলে মেয়েরা কেন শিক্ষার প্রতি বিতৃষ্ণা পোষণ করে? তারা নোট মুখস্থ করে, প্রশ্নপত্র চুরি করে কোন রকমে
দায়িত্ব মিটিয়ে দিতে চায়। কেন তাদের এ মনোভাব? এরজন্য দায়ী কে? দায়ী আমরা শিক্ষকরা, আমরা তাদের সামনে বস্তুর পাহাড়
তুলে ধরেছি আর চেয়েছি সেই পাহাড়ই তারা উদগিরণ করুক। বস্তুর
মর্মে যে সত্য নিহিত আছে, সেই
সত্যের দ্বারে তো আমরা ছাত্রদের পৌঁছে দিতে পারিনি, ফলে
ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্ক দাঁড়িয়েছে শ্রমিক ও কারখানার কর্তাদের সম্পর্কের মত। পদে পদেই তাই ছাত্ররা আজ বিদ্রোহ
করে।২২
দার্শনিক
রুশোর প্রকৃতিবাদের প্রতিফলনও সত্যেন্দ্রনাথের কথায় লক্ষণীয়। তিনি
বলেন:
গাছপালা, জন্তুজানোয়ার সবের মধ্যেই শিক্ষণীয়
জিনিস রয়েছে। প্রত্যেকেই আমাদের সত্যস্বরূপে
পৌঁছে দিতে চায়। আমাদের মধ্যে যদি শ্রদ্ধার উদ্রেক
হয়, অজানাকে জানবার আকাক্সক্ষা যদি
জাগ্রত হয়, তবে আর সবকিছুই সহজ হয়ে আসবে। তখন শিক্ষা দেবার পদ্ধতি নিয়ে
আর গোলে পড়তে হবে না।২৩
শিক্ষাসহায়ক
উপকরণ ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি ছিল বাস্তবমুখী। তিনি
বলেন যে, শিশুর মনে শিক্ষাকে দৃঢ় করার
জন্য অন্যান্য দেশের মতো ভারতেও শিক্ষা উপকরণ যেমন ছায়াচিত্র, ভ্রমণ ইত্যাদির ব্যবস্থা করা
উচিত।
উল্লিখিত
বিশ্লেষণ থেকে একথা বলা যায় যে, শিক্ষাদান
পদ্ধতি প্রসঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন শিশুকেন্দ্রিক প্রগতিশীল ও মনোবিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাদান
পদ্ধতির পক্ষে। তিনি চেয়েছেন শিক্ষাদানে বিশেষত
বিজ্ঞানশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথমে কৌতূহল জাগ্রত করে শিক্ষা দেওয়া হোক। বিজ্ঞান শিক্ষাদানে তিনি ছিলেন
‘সহজ থেকে কঠিন’ নীতির সমর্থক। এছাড়াও তিনি কাজের মধ্য দিয়ে, শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে, বাস্তব পরিবেশ থেকে ও অজানাকে
জানবার আকাক্সক্ষা সৃষ্টি করে শিক্ষাদানের কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে
শিক্ষককে তিনি শিক্ষার্থীর সহায়তাকারী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, কর্তা বা শাসনকারী হিসেবে নয়।
শিক্ষার্থীর
কাছে মাতৃভাষাই নতুন জ্ঞান অর্জনের সহজতম মাধ্যম। শিক্ষার্থীর
মনে বিভিন্ন ধারণা, মনোভাব, মানসিক সংগঠন, চিন্তার উপাদান - এসবই মাতৃভাষাকে
কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। সে যখন নতুন কিছু দেখে, শোনে, বোঝে বা জানে তখন তা সে তার মনের
এই উপকরণগুলোর সাহায্যেই করে। তাই শিক্ষার্থীর কাছে মাতৃভাষার
মাধ্যমেই নতুন কিছু শেখা সবচেয়ে সহজ। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার কথা
বিভিন্ন শিক্ষাবিদ মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক বারবার বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর বলেছেন,
‘‘শিক্ষায়
মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ, জগতে
এই সর্বজনস্বীকৃত নিরতিশয় সহজ কথাটা বহুকাল পূর্বে একদিন বলেছিলাম, আজও তার পুনরাবৃত্তি করব।”২৪
ড
গ জুনঁৎহ এর ভাষায়, ঞযব
সড়ঃযবৎ ঃড়হমঁব রং ধঃ ড়হপব ধ ঃড়ড়ষ,
ংড়ৎঁপব ড়ভ লড়ু ধহফ যধঢ়ঢ়রহবংং ধহফ শহড়ষিবফমব, ধ
ফরৎবপঃড়ৎ ড়ভ ঃধংঃব ধহফ ভববষরহম ধহফ ধ সবধহং ড়ভ ঁংরহম ঃযব যরমযবংঃ ঢ়ড়বিৎং ঃযধঃ এড়ফ যধং
মরাবহ ঁং যিবৎব বি পষড়ংবঃ ঃড় ঐরস;
ঃযধঃ রং, ড়ঁৎ পৎবধঃরাব ঢ়ড়বিৎং ২৫ অর্থাৎ
শিশুর জ্ঞানার্জনের সহজতম হাতিয়ার হচ্ছে মাতৃভাষা। পাশাপাশি
বিদেশী ভাষায় শিশুর পক্ষে নতুন জ্ঞান অর্জন খুবই কষ্টকর কারণ নতুন জ্ঞান অর্জনের পূর্বে
তাকে অপরিচিত নতুন একটি ভাষাও শিখতে হয় যা তার জন্য কষ্টসাধ্য।
ব্রিটিশ
শাসনামলে ১৮৩৫ সালে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের সময় মেকলের মিনিটি অনুযায়ী ভারতবর্ষের
বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালু করা হয়।২৬ ১৮৫৭ সালে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সময় সেখানেও ইংরেজি
ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয়।
ঊনবিংশ
শতাব্দীর শেষের দিকেও বিংশ শতাব্দীর প্রথমে মাধ্যমিক শিক্ষার মাধ্যমরূপে মাতৃভাষাকে
গ্রহণ করার জন্য আন্দোলন শুরু হয়।২৭ ১৯১৭ সালে স্যাডলার কমিশনে
মাধ্যমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুপারিশ করা হয়। ১৯২১
সালে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে নিম্ন-মাধ্যমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যম
রূপে ভারতীয় ভাষার প্রচলন শুরু হয় এবং ১৯৩৫ সালে স্বায়ত্ত্বশাসন প্রবর্তনের পর থেকে
বিদ্যালয় পর্যায়ে মাতৃভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হলেও কলেজ স্তরে ইংরেজিই শিক্ষার
মাধ্যম হিসেবে চালু থাকে। তবে ভারতীয় শিক্ষাবিদগণ সর্বস্তরে
মাতৃভাষায় শিক্ষাদানে অগ্রহী ছিরেন এবং এর সমর্থনে এক ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলেন। ফলস্বরূপ জাকির হোসেনের জামিয়া
মিলিয়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তি নিকেতন, মহাত্মা গান্ধির বুনিয়াদি বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কলকাতার জাতীয় বিদ্যালয়ে মাতৃভাষাকেই ভিত্তি করে শিক্ষা পরিকল্পনা
গড়ে তোলা হয়। ১৯৪৭-এর পর স্বাধীন ভারতে মাতৃভাষাকে
শিক্ষার মাধ্যম করার আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে।
এই আন্দোলনের
পুরোভাগে ছিলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ।
বিজ্ঞানী
সত্যেন্দ্রনাথ মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তিনি
সারাজীবন এজন্য আন্দোলন করেছেন, বক্তৃতা
করেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন, কর্তাব্যক্তিদের কাছে আবেদন নিবেদন
করেছেন। নিজের মাতৃভাষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের
ক্লাসে পড়িয়ে প্রমাণ করেছেন যে, মাতৃভাষায়
পদার্থবিজ্ঞানের জটিল বিষয়ও শিক্ষাদান সম্ভব।২৮
সত্যেন্দ্রনাথ
মনে করতেন, শিক্ষা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়
এবং শিক্ষা প্রসারের জন্য দরকার বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা। বাধ্যতামূলক
প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি সম্ভব কেবল মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের মাধ্যমে। কেননা মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের
জন্য শিক্ষক পেতে কোন অসুবিধা হয় না। তিনি জাপান ও জার্মানির উদাহরণ
টেনে বলেছেন যে,
দেশ দুটির
উন্নতির মূলে আছে শিক্ষার প্রসার। জাপানে তাড়াতাড়ি শিক্ষার বিস্তার
সম্ভব হয়েছে মাতৃভাষায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাদানের কারণে। অথচ জাপানি ভাষা আয়ত্ত করা বাংলা
ভাষার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।
কারণ বাংলা
ভাষায় যেখানে অল্পসংখ্যক বর্ণ দ্বারাই সব বাক্য লেখা যায় সেখানে জাপানি ও চৈনিক সব
মিলিয়ে রয়েছে কয়েক হাজার অক্ষর। এজন্য আমাদের দেশে যেখানে মাতৃভাষা
বছরখানেক বা বছর দুয়েকের মধ্যেই আয়ত্তের মধ্যে এসে যায়, সেখানে জাপানি ছেলেমেয়েদের জাপানি
ভাষা শিখতে গড়ে প্রায় ছয় বছর লেগে যায়।
তাই সত্যেন্দ্রনাথ
মনে করতেন, বাংলা ভাষায় বাঙালি শিক্ষার্থীদের
শিক্ষাগ্রহণ অনেক সহজ হওয়ার কথা।
সত্যেন্দ্রনাথের
আকাক্সক্ষা ছিল দেশের সাধারণ মানুষ শিক্ষিত হোক, অর্জন
করুক বাস্তবমুখী জ্ঞান যা তাদের দৈনন্দিন
জীবনে কাজে লাগে,
তাদের মুখের
খাবার জোগায়,
আয়ত্ত করুক
সেই ধরনের জ্ঞান যা দেশের সর্বত্র স্বল্প আয়াসেই পাওয়া যায়। স্বল্প
আয়াসে সকলের নিকট শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়া কেবল মাতৃভাষায়ই সম্ভব, ইংরেজির উপর বেশি জোর দিলে তা
শিক্ষা বিস্তারের অন্তরায় হবে।৩০
তিনি
মনে করতেন ছাত্রদের মৌলিক চিন্তার বিকাশের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষাদান অপরিহার্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে
(১৯৬২) তিনি বলেন: ‘‘বিদেশী
ভাষাই হল আমাদের দেশের সাক্ষরের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্তরায়। বিদেশী
ভাষা শিক্ষার বাহন হলে মুখস্থ করবার প্ররোচনা দেয় ছাত্রদের এবং এর ফলে তাঁদের মৌলিক
চিন্তার প্রসার ঘটতে বাধার সৃষ্টি হয়”।৩১ বিদেশী ভাষায় শিক্ষা দেওয়া
হলে সৃষ্টিশীলতা হ্রাস পায়। ‘‘বিদেশী ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার একটাই
ফল, বুঝে না বুঝে মুখস্থ করা। আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন নিজের
দেশে”।৩২ তিনি আইনস্টাইনের বক্তব্য
উদ্ধৃত করে জানিয়েছেন যে, আইনস্টাইন
যা মুখস্থ করে পাশ করেছিলেন তা থেকে নিজের উদ্ভাবনী ভাবনা ফিরিয়ে আনতে পরীক্ষায় পাস
করার পর তাঁর এক বছর সময় লেগে গিয়েছিল।
বিজ্ঞানী
সত্যেন্দ্রনাথ স্কুল, কলেজ
ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন।৩৩ রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন
বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন যে, শত
শত ছাত্রের সংস্পর্শে এসে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তাঁর মনে হয়েছে যে, ছাত্র-শিক্ষক খোলাখুলি আলোচনা
ও একাযোগে কাজ করার মাধ্যমে যথেষ্ট সময় বাঁচিয়ে ছাত্রদের মনে বৈজ্ঞানিক চিন্তার দৃঢ়তর
ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। কিন্তু এ আলোচনা ও শিক্ষার মাধ্যম
ইংরেজি হলে অনুসন্ধিৎসু ছাত্র অনেক সময়ই ঠিকমত মনের কথা বলতে পারে না এবং শিক্ষকও নিশ্চিন্ত
হতে পারেন না যে,
শিক্ষকের
বক্তব্য ছাত্র পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে কি-না।
ফলে, বিদেশি ভাষায় শিক্ষাদান ছাত্রকে
মুখস্থ করতে প্ররোচনা যোগায় এবং শিক্ষণীয় বিষয়ের সারতত্ত্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থীর সম্যক
ধারণা জন্মায় না।
মাতৃভাষা
শিক্ষাদানের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি দেখানো হয় এই বলে যে, বিজ্ঞানের বিষয়সমূহ উপমহাদেশের
ভাষাগুলোর মাধ্যমে শিক্ষাদান সম্ভব নয়।
সত্যেন্দ্রনাথ
এ যুক্তি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এবং বিদেশি উদাহরণ সহযোগে খণ্ডন করেছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে
পদার্থবিজ্ঞান বাংলায় পড়িয়ে প্রমাণ করেছেন যে, বাংলা
ভাষায় বিজ্ঞানের জটিল বিষয় শিক্ষাদান সম্ভব।
বাংলায়
শিক্ষাদানের জন্য তিনি সহকর্মীদেরকেও উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ৩৪
তিনি তাঁর তরুণ সহকর্মী কাজী মোতাহার হোসেনকে একবার বলেছিলেন: ‘‘বাংলায় একখানা পদার্থবিদ্যার
ব্যবহারিক বই লেখ, তা
দেখে ছাত্রেরা পরীক্ষণের উদ্দেশ্য প্রক্রিয়া প্রভৃতি ভাল করে বুঝতে পারবে। এখন ওরা ইংরেজি বই দেখে পরীক্ষণ
বুঝতে চায়, কিন্তু সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারে
না বলে ভুল করে”।৩৫ মাতৃভাষা বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা
কি সম্ভব? এরকম প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘যাঁরা বলেন বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা
সম্ভব নয়, তাঁরা হয় বাংলা জানেন না; নয়তো বিজ্ঞান জানেন না”।৩৬
বিজ্ঞানী
সত্যেন্দ্রনাথ সমাবর্তন ভাষণে তাঁর জাপান ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন
যে, জাপানে বিজ্ঞানের আধুনিকতম দিকগুলো
পড়ানো হয় জাপানি ভাষায়, বিজ্ঞান
বিষয়ের সেমিনারে আলোচনাও জাপানি ভাষায়।
এজন্য জাপানিরা
ধার করা শব্দ হয়তো ব্যবহার করেছেন কিন্তু বিজ্ঞানের বিষয় ইংরেজি না জানা লোকেরাও জানতে
পেরেছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি দুজন ভারতীয়
বিজ্ঞানীর লেখা একটি বইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। গ্রন্থটি
জাপানি ভাষায় অনূদিত হওয়ায় সাধারণ জাপানিরা পড়তে পেরেছে অথচ ভারতীয়রা পারেনি; কারণ সেটি লেখা হয়েছে ইংরেজিতে। বইটি ভারতীয় কোন ভাষায় রচিত হলে
ঐ ভাষাভাষী লোকেরা পড়তে পারত।৩৭
‘ভারতবর্ষে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষা
ও বিজ্ঞানচর্চা কঠিন কারণ ভারতীয় ভাষাগুলোতে পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত পরিভাষা নেই’ - এই যুক্তি খণ্ডন করে তিনি বলেন
যে, প্রয়োজনে ইংরেজি টেকনিক্যাল ও
বৈজ্ঞানিক শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে।
এর ফলে
এ দেশীয় ভাষাসমূহের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে।৩৮
উদাহরণ হিসেবে তিনি এ দেশীয় ভাষাসমূহের শব্দভাণ্ডারে সংযোজিত রেলওয়ে, কিলোগ্রাম, সেন্টিমিটার, মিটার ইত্যাদি শব্দের উল্লেখ
করেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন
ভাষণে তিনি বলেন যে, এক
সময় এ দেশের ছাত্ররা বাংলায় লেখা ডাক্তারি বই ব্যবহার করতেন।৩৯
বিশ্বপরিচয়-এর
উৎসর্গনামায় রবীন্দ্রনাথ সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করেছিলেন।৪০ সত্যেন্দ্রনাথ ঢাকায় থাকাকালে
প্রকাশ করেছিলেন বিজ্ঞান পরিচয় পত্রিকা।
তিনি বাংলায়
বিজ্ঞানের জটিল বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে ও বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে। তিনি মনে করতেন যে, এ দেশের বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞান
শুধু জানলেই চলবে না, বিজ্ঞান
বোঝে না এমন লোকদের বুঝিয়ে দেবার চেষ্টাও থাকা উচিত তাঁদের।৪১ তিনি ১৯৪৮ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ
যার মূল লক্ষ্য ছিল জনসমাজকে বিজ্ঞান সচেতন করা, জনকল্যাণে বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটানো এবং মাতৃভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষার
প্রচলন করা। এলক্ষ্য অর্জনে পরিষদের মুখপাত্ররূপে প্রকাশ করেন জ্ঞান
ও বিজ্ঞান পত্রিকা। এ পত্রিকায়ই ১৯৬৩ সালে কেবল মৌলিক
গবেষণা নিবন্ধ নিয়ে রাজশেখর বসু সংখ্যা প্রকাশ করে তিনি দেখান যে, বাংলাভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞানের
মৌলিক গবেষণা-নিবন্ধ রচনা সম্ভব।৪২ মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষার
পক্ষে সারাজীবন সংগ্রামী সত্যেন্দ্রনাথ বিজ্ঞান পরিষদের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের
জন্য বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের বই রচনা করেছেন।
এ থেকেই
বোঝা যায় যে,
বাংলা ভাষায়
বিজ্ঞানশিক্ষার জন্য তিনি কতখানি আন্তরিক ছিলেন। মুহাম্মদ
ইব্রাহীমের মূল্যায়নে এর সমর্থন মেলে: ‘‘শিক্ষার
ক্ষেত্রে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে শুধু ইচ্ছে বা ব্যক্তিগত উদ্যোগই যে যথেষ্ট নয়
তা তিনি ভালভাবেই জানতেন, এজন্য
তিনি যেমন সর্বমহলে সোচ্চার হয়েছিলেন তেমনি এ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সংশোধন, পাঠ্যপুস্তক রচনা ও অনুবাদ ইত্যাদি
বিন্নি সাংগঠনিক কাজেও যতœবান
ছিলেন।”৪৩ মাতৃভাষা তথা বাংলা ভাষায়
শিক্ষাকে সফল করার জন্য সরকারের করণীয় সম্পর্কে সত্যেন্দ্রনাথ ভেবেছেন। বাংলা ভাষাকে শিক্ষার সর্বস্তরের
মাধ্যম হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের করণীয় সম্পর্কেও তিনি
ভেবেছেন। তাঁর মতে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের
করণীয়ের মধ্যে আছে বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদের রীতি, বিভিন্ন ভাষা থেকে প্রয়োজনীয়
গ্রন্থ অনুবাদ করে প্রকাশের প্রচলন করা, অভিজ্ঞ
শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের
সহযোগিতায় নানা বিষয়ে নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচি অনুযায়ী পাঠ্যবই রচনা, প্রয়োগবিদ্যা; যেমন আইন বিষয়ে অনুষদ খুলে বাংলায়
শিক্ষাদানের প্রয়াস গ্রহণ করা এবং মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা বিজ্ঞান অধ্যয়নে বাংলা প্রচলনের
দায়িত্ব পালন করা। উল্লিখিত করণীয়গুলি যে বাংলা
ভাষায় শিক্ষা প্রসারের জন্য সম্পূর্ণরূপে যৌক্তিক, বিজ্ঞানসম্মত
ও বাস্তব একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে।
বাংলা
ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করার ঝুঁকির কথাও তিনি ভেবেছেন। ইংরেজি
শিক্ষায় শিক্ষিতের বাজারদর বাংলা মাধ্যমের শিক্ষায় শিক্ষিতের তুলনায় বেশি হলে, শিক্ষার্থীরা ইংরেজি মাধ্যমের
দিকেই ঝুঁকবে। তিনি এর সমাধানের কথাও ভেবেছেন:
‘‘পারিপার্শ্বিকের এই প্রতিকূল
ও বিভ্রান্তিকর প্রভাবকে দূর না করা অবধি মাতৃভাষায় সর্বাঙ্গীণ শিক্ষার উপযোগী ক্ষেত্র
প্রস্তুত হবে না।”৪৪ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য
সরকারের করণীয় সম্পর্কে তিনি সরকারি কাজকর্ম বাংলায় করা, পাবলিক সার্ভিস কমিশনে বাংলায়
পরীক্ষা গ্রহণ প্রবর্তন ইত্যাদির কথা বলেছেন।
সত্যেন্দ্রনাথ
ছিলেন মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের একনিষ্ঠ সমর্থক। তাঁর
মতে, সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে মাতৃভাষার
বিকল্প নেই। বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রেও মাতৃভাষা
(বাংলা) কোন অন্তরায় নয় বরং তা সহায়ক এবং জনসমাজকে বিজ্ঞানসচেতন করা ও বিজ্ঞানের প্রসারে
মাতৃভাষাই একমাত্র মাধ্যম। আমরা আরো দেখতে পাই যে, বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ মাতৃভাষায়
শিক্ষাদানের জন্য আবেগতাড়িত না হয়ে যুক্তিনির্ভর হয়েছেন, পাশাপাশি নিজে চর্চা করেও দেখিয়েছেন। তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ক্ষতিকর
দিকের কথা বিবেচনা করেছেন, অন্যদিকে
বাস্তবমুখী হয়ে সমস্যার কথা ভেবেছেন এবং সে সমস্যা সমাধানের পথ দেখিয়েছেন।
শিক্ষার লক্ষ্য, শিক্ষাদান পদ্ধতি ও মাতৃভাষায়
শিক্ষাদান প্রসঙ্গ সত্যেন্দ্রনাথ বসুর শিক্ষাচিন্তার মৌল উপাদান। তাঁর মতে ‘শিক্ষার লক্ষ্য’ হওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি
অর্জনের ামধ্যমে ধর্মীয় দর্শনের প্রভাব-বলয়ের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীকে সুনাগরিক হিসেবে
গড়ে তোলা। কর্মমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা
শিক্ষার্থীকে জীবিকা-নির্বাহের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলবে এবং পাশাপাশি শারীরিক বিকাশসাধন
ব্যক্তিকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। সর্বোপরি
মানবতাবাদ এবং স্বদেশের প্রতি দায়িত্ববোধ একজন শিক্ষার্থীর বিদ্যার্জনকে সার্থকতা দান
করবে। শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রসঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের
চিন্তাভাবনা মনোবিজ্ঞানভিত্তিক, প্রগতিশীল
ও শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাদান পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
তথ্যসূত্র:
১. সম্পাদকমণ্ডলী, সত্যেন্দ্রনাথ
বসু রচনা সংকলন (কলিকাতা, বঙ্গীয়
বিজ্ঞান পরিষদ,
বৈশাখ ১৪০৫), পৃ. ৪-৯
২. অরুণ ঘোষ, শিক্ষা
বিজ্ঞানের মূলতত্ত্ব (কলিকাতা, এডুকেশনাল
এন্টারপ্রাইজেস,
১৯৮৩), পৃ. ২৯
৩. প্রাগুক্ত, পৃ.
৪১-৪২
৪. অরুণ ঘোষ, শিক্ষার
ভাবধারা,পদ্ধতি ও সমস্যার ইতিহাস (কলিকাতা, এডুকেশনাল এন্টারপ্রাইজেস, ১৯৮৩), পৃ. ৮৩
৫. তপন চক্রবর্তী, সত্যেন্দ্রনাথ
বসু (ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৬), পৃ. ৯০
৬. সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সংকলন, পৃ. ১০৮-১০৯
৭. প্রাগুক্ত, পৃ.
৯০
৮. প্রাগুক্ত, পৃ.
২৫৭-২৫৮
৯. প্রাগুক্ত, পৃ.
৯৯
১০. প্রাগুক্ত, পৃ.
১০০
১১. প্রাগুক্ত, পৃ.
৮৬
১২. প্রাগুক্ত, পৃ.
৯০
১৩. প্রাগুক্ত, পৃ.
১১১
১৪. অরুণ ঘোষ, শিক্ষা
বিজ্ঞানের মূলতত্ত্ব, পৃ.
১২
১৫. প্রাগুক্ত, পৃ.
১৬১
১৬. প্রাগুক্ত, পৃ.
১৬৩
১৭. সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সংকলন, পৃ. ৮৫
১৮. প্রাগুক্ত, পৃ.
৮৫
১৯. প্রাগুক্ত, পৃ.
৮৫
২০. সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সংকলন, পৃ. ৮৫
২১. অরুণ ঘোষ, শিক্ষা
বিজ্ঞানের মূলতত্ত্ব, পৃ.
১৭৩
২২. সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সংকলন, পৃ. ৮৬
২৩. প্রাগুক্ত, পৃ.
৮৬
২৪. উদ্বৃত : মোঃ আবুল এহসান, শ্যামলী আকবর, মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ ‘‘প্রাথমিক স্তরের পঞ্চম শ্রেণীর
বাংরা পাঠ্যপুস্তকের শব্দ আয়ত্তীকরণ প্রক্রিয়া : একটি সমীক্ষা’’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, ৭৬ (২০০৩), পৃ. ৯৬
২৫. প্রাগুক্ত, পৃ.
৯৬
২৬. শিক্ষার ভাবধারা, পদ্ধতি
ও সমস্যার ইতিহাস, পৃ.
৪৬
২৭. রনজিৎ ঘোষ, শিক্ষাদর্শ
পদ্ধতি ও সমস্যার ইতিহাস, পৃ.
৫৬৫
২৮. তপন চক্রবর্তী, সত্যেন্দ্রনাথ
বসু (ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৬), পৃ. ৭৫
২৯. প্রাগুক্ত, পৃ.
৮৭
৩০. প্রাগুক্ত, পৃ.
৮৯
৩১. সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সংকলন, পৃ. ৯৮
৩২. তপন চক্রবর্তী, সত্যেন্দ্রনাথ
বসু, পৃ. ১১৩
৩৩. সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সংকলন, পৃ. ১০৭
৩৪. সত্যেন্দ্রনাথ বসু, পৃ. ৭৫
৩৫. প্রাগুক্ত, পৃ.
৪৩
৩৬. প্রাগুক্ত, পৃ.
৯-১০
৩৭. সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সংকলন, পৃ. ১১০
৩৮. প্রাগুক্ত, পৃ.
১১১
৩৯. প্রাগুক্ত, পৃ.
৯৩
৪০. প্রাগুক্ত, পৃ.
৮
৪১. প্রাগুক্ত, পৃ.
১৩৭
৪২. প্রাগুক্ত, পৃ.
৮
৪৩. তপন চক্রবর্তী, সত্যেন্দ্রনাথ
বসু, পৃ. ৭৬
৪৪. সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সংকলন, পৃ. ১৪০

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন