রোকেয়া
সভানেত্রীর
অভিভাষণ
মাননীয়
উপস্থিত ভগিনীবৃন্দ!
আপনারা
আমার ন্যায় তুচ্ছ নগণ্য ব্যক্তিকে এ সময়ের জন্য সভানেত্রীপদে বরণ করিয়া আমার প্রতি
সম্মান প্রদর্শন করিয়াছেন, তজ্জন্য
আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছে।
কিন্তু
আমি অবশ্যই বলিব যে, আপনাদের
নির্বাচন ঠিক হয় নাই। কারণ আমি আজীবন কঠোর সামাজিক
‘পর্দার’ অত্যাচারে লোহার সিন্দুকে বন্ধ
আছি - ভালরূপে সমাজে মিশিতে পাই পাই - এমন কি সভানেত্রীকে হাসিতে হয়, না কাঁদিতে হয়, তাহাও আমি জানি না। সুতরাং আমার ভাষায় কথায় অনেক
ভুল-ভ্রান্তি থাকিবে তজ্জন্য আপনারা প্রস্তুত থাকুন।
শ্রদ্ধাস্পদা
ভগিনী মিসিস লিন্ডসে আমাকে মুসলমান বালিকাদের শিক্ষা সম্বন্ধীয় অভাব অভিযোগের কথা বলিতে
অনুরোধ করিয়াছেন। সমবেত সুশিক্ষিত গ্রাজুয়েট মহিলাদের
সম্মুখে এ সম্বন্ধে কিছু বলিতে পারি, এমন
যোগ্যতা আমার নাই। তবে ২০/২১ বৎসর হইতে সাহিত্য
ও সমাজ সেবা করিয়া, বিশেষতঃ
১৬ বৎসর যাবৎ সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল পরিচালনা করিয়া যতটুকু অভিজ্ঞতা অর্জন
করিয়াছি, তাহাই আপনাদের সম্মুখে উপস্থিত
করিতে সাহস করিতেছি।
স্ত্রী-শিক্ষার
কথা বলিতে গেলেই আমাদের সামাজিক অবস্থার আলোচনা অনিবার্য হইয়া পড়ে। আর সাামজিক অবস্থার কথা বলিতে
গেলে, নারীর প্রতি মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দের
অবহেলা, ঔদাস্য এবং অনুদার ব্যবহারের
প্রতি কাটাক্ষপাত অনিবার্য হয়। প্রবাদ আছে, ‘‘বলিতে আপন দুঃখে পরনিন্দা হয়’’।
এখন
প্রশ্ন এই যে,
মুসলমান
বালিকাদের সুশিক্ষার উপায় কি? উপায়
ত আল্লাহর কৃপায় অনেকই আছে, কিন্তু
অভাগিনীগণ তাহার ফলভোগ করিতে পায় কই? আপনারা
হয়ত শুনিয়া আশ্চর্য হইবেন যে, আমি
আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি। ভারতবর্ষে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট
জীবন কাহারা,
জানেন? সে জীব ভারত নারী! এই জীবগুলির
জন্য কখনও কাহারও প্রাণ কাঁদে নাই। মহাত্মা গান্ধী অস্পৃশ্য জাতির
দুঃখে বিচলিত হইয়াছে; স্বয়ং
থার্ড ক্লাশ গাড়ীতে ভ্রমণ করিয়া দরিদ্র রেল-পথিকদের কষ্ট হৃদয়ঙ্গম করিয়াছেন। পশুর জন্য চিন্তা করিবারও লোক
আছে, তাই যত্রতত্র ‘পশুক্লেশ-নিবারণী সমিতি’ দেখিতে পাই। পথে কুকুরটা মোটর চাপা পড়িলে, তাহার জন্য এংলো-ইন্ডিয়ান পত্রিকাগুলিতে
ক্রন্দনের রোল দেখিতে পাই। কিন্তু আমাদের ন্যায় অবরোধ-বন্দিনী
নারীজাতির জন্য কাঁদিবার একটি লোকও এ ভূ-ভারতে নাই।
নারী
ও পুরুষ বিরাট সমাজ-দেহের দুইটি বিভিন্ন অংশ। বহুকাল
হইতে পুরুষ নারীকে প্রতারণা করিয়া আসিতেছে, আর
নারী কেবল নীরবে সহ্য করিয়া আসিতেছে। পুরুষের পক্ষে নারায়ণী সেনা আছে
বলিয়া তাঁহারা এ যাবৎ নারীর উপর জয়লাভ করিয়া আসিতেছেন। সুখের
বিষয়, এত কাল পরে ‘‘শ্রীকৃষ্ণ’’ স্বয়ং আমার হিন্দু ভগিনীদের প্রতি
কৃপাকটাক্ষপাত করিয়াছে! তাই চারিদিকে হিন্দু সমাজের বিভিন্ন স¤প্রদায়ের অবরোধবন্দিনী মহিলাদের
মধ্যে জাগরণের সাড়া পড়িয়া গিয়াছে। তাঁহারা, বিশেষতঃ মাদ্রাজের মহিলাবৃন্দ
সর্ববিষয়ে উন্নতির পথে অগ্রসর হইয়াছেন।
এবার মাদ্রাজের
লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের ডেপুটি প্রেসিডেন্টের পদে একজন মহিলা নির্বাচিত হইয়াছেন। স¤প্রতি রেঙ্গুনে একজন ব্যারিস্টার
হইয়াছেন। লেডী ব্যারিস্টার মিস ঘোরাবজীর নামও সুপরিচিত; কিন্তু
মুসলিম নারীর কথা আর কি বলিব? - তাহারা
যে তিমিরে সে তিমিরে আছে।
‘‘মাতা যদি বিষ দেন আপন সন্তানে
বিক্রয়েন
পিতা যদি অর্থ প্রতিদানে’’
তাহাকে
আর কে রক্ষা করিবে? আলীগড়ের
প্রসিদ্ধ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সেক্রেটারী শেখ মহম্মদ আবদুল্লাহ সাহেব এক সময় তাঁহার
কোন বক্তৃতায় বলিয়াছেন, ‘‘এদেশে
বালক ও বালিকার শিক্ষায় পার্থক্য রাখার ফলে আমাদের অবস্থা এরূপ শোচনীয় হইয়া পড়িয়াছে
যে, আমাদের দুঃখে শেয়াল কুকুর কাঁদে!
বালিকাদের শিক্ষা না দেওয়া আমাদের পক্ষে গৌরবের বিষয় নহে, বরং ইহা আমাদের দূরপনেয় কলঙ্ক” ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ ২০ বৎসর পূর্বে আমি হেন
নগণ্য যাহা ১ম খণ্ড ‘‘মতিচুরে’’ বলিয়াছি, সেই কথা এখন শেখ সাহেবের ন্যায়
জ্ঞানবৃদ্ধ লোকের মুখেও শুনিতেছি। যাঁহারা ইতিহাস পাঠ করিয়াছেন, তাঁহারা জানেন যে, মূর্খতার অন্ধকার যুগে আরবগণ
কন্যা বধ করিত। যদিও ইসলাম ধর্ম কন্যাদের শারীরিক
হত্যা নিবারণ করিয়াছেন, তথাপি
মুসলিমগণ অম্লান বদনে কন্যাদের মন, মস্তিষ্ক
এবং বুদ্ধিবৃত্তি অদ্যাপি অবাধে বধ করিতেছেন। কন্যাকে
মূর্খ রাখা এবং চতু®প্রাচীরের
অভ্যন্তরে আবদ্ধ রাখিয়া জ্ঞান ও বিবেক হইতে বঞ্চিত রাখা অনেকে কৌলিন্যের লক্ষণ মনে
করেন। কিছুকাল পর্যন্ত মিসর এবং তুরস্ক
স্ত্রী শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। কিন্তু তাঁহারা ঠকিয়া ঠকিয়া নিজেদের
ভ্রম বুঝিতে পারিয়া এখন সুপথে আসিয়াছেন।
স¤প্রতি তুরস্ক এবং মিসর, ইউরোপ ও আমেরিকার ন্যায় পুত্র
ও কন্যাকে সমভাবে শিক্ষা দিবার জন্য বাধ্যতামূলক আইন করিয়াছেন। কিন্তু তুরষ্ক আমেরিকার পদাঙ্ক
অনুসরণে সোজা পথ অবলম্বন করেন নাই; বরং
আমাদের ধর্ম-শাস্ত্রের একটি অলঙ্ঘনীয় আদেশ পালন করিয়াছেন। যেহেতু
পৃথিবীতে যিনি সর্বপ্রথম পুরুষ স্ত্রীলোককে সমভাবে সুশিক্ষা দান করা কর্তব্য বলিয়া
নির্দেশ করিয়াছেন, তিনি
আমাদের রসুল মকবুল (অর্থাৎ পয়গাম্বর সাহেব)।
তিনি আদেশ
করিয়াছেন যে,
শিক্ষালাভ
করা সমস্ত নরনারীর অবশ্য কর্তব্য। তের শত বৎসর পূর্বেই আমাদের জন্য
এই শিক্ষাদানের বাধ্যতামূলক আইন পাশ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু
আমাদের সমাজ তাহা পালন করে নাই, পরন্তু
ঐ আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করিয়াছে এবং তদ্রƒপ
বিরুদ্ধাচরণকেই বংশ-গৌরব মনে করিতেছে।
এখনও আমার
সম্মুখে আমাদের স্কুলের কয়েকটি ছাত্রীর অভিভাবকের পত্র মজুত আছে - যাহাতে তাঁহারা লিখিয়াছেন
যে, তাঁহাদের মেয়েদের যেন সামান্য
উর্দু ও কোরান শরীফ পাঠ ছাড়া আর কিছু বিশেষত ইংরাজী শিক্ষা দেওয়া না হয়। এই ত আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা।
ভারতবর্ষে
যখন স্ত্রীশিক্ষার বাধ্যতামূলক আইন পাশ হইবে, তখন
দেখা যাইবে। কিন্তু প্রশ্ন এই যে, মুসলমান- যাঁহারা স্বীয় পয়গাম্বরের
নামে (কিম্বা ভগ্ন মসজিদের এক খণ্ড ইস্টকের অবমাননায়) প্রাণ দানে প্রস্তুত হন, তাঁহারা পয়গাম্বরের সত্য আদেশ
পালনে বিমুখ কেন?
গত অন্ধকার
যুগে যাহা হইবার হইয়া গিয়াছে, তাঁহারা
যে ভ্রম করিয়াছেন, তাহাও
ক্ষমা করা যাইতে পারে; কিন্তু
এই বিংশ শতাব্দীতে যখন বারংবার স্ত্রী-শিক্ষার দিকে তাঁহাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা যাইতেছে
যে, কন্যাকে শিক্ষা দেওয়া আমাদের
প্রিয় নবী ‘‘ফরয’’ (অবশ্য পালনীয় কর্তব্য) বলিয়াছেন, তবু কেন তাঁহারা কন্যার শিক্ষায়
উদাসীন?
এখন
শিক্ষার অবস্থা এই যে, আমাদের
দেশের পড়পড়তা প্রতি ২০০ (দুই শত) বালিকার একজনও অক্ষর চিনে না; প্রকৃত শিক্ষিতা মহিলা বোধ হয়
দশ হাজারের মধ্যেও একজন পাওয়া যাইবে না।
কেবল এই
বঙ্গদেশে প্রায় তিন কোটি মুসলমানের বাস।
গত জানুয়ারী
মাসে শিক্ষা-বিভাগ হইতে আমাকে একখানি পত্রে অনুরোধ করা হইয়াছিল যে, বঙ্গদেশে যতগুলি মুসলিম মহিলা
গ্রাজুয়েট আছেন,
তাঁহাদের
নাম ও ঠিকানা লিখিয়া যেন আমি অবিলম্বে পাঠাই। কিন্তু
আমি বঙ্গের মাত্র একটি গ্রাজুয়েট এবং আগা মইদুল ইসলাম সাহেবের কন্যাত্রয় ব্যতীত আর
কাহারও নাম দিতে পারি নাই। আগা সাহেব বঙ্গদেশের অধিবাসী
নহেন, সুতরাং তিন কোটি মুসলমানের মধ্যে
মাত্র একটি মহিলা গ্রাজুয়েট পাওয়া গেল, বলিতে
হয়!! সম্ভাবত অনুবীক্ষণ যন্ত্রের দ্বারা অনুসন্ধানের পর প্রেসিডেন্সী ও বর্ধমান বিভাগের
স্কুরে ইনসপেকট্রেস মহোদয়া আমাকে মুসলিম মেয়ে গ্রাজুয়েট খুঁজিয়া বাহির করিতে বলিয়াছেন!!
আবার আমি শেখ আবদুল্লাহ সাহেবের একটি বচন উদ্ধৃতি করিতেছি।
‘‘স্ত্রী-শিক্ষার বিরোধীগণ বলে
যে, শিক্ষা পাইলে স্ত্রীলোকেরা অশিষ্ট
ও অনম্যা হয়। ধিক! ইহারা নিজেকে মুসলমান বলেন, অথচ ইসলামের মূল সূত্রের এমন
বিরুদ্ধাচরণ করেন! যদি শিক্ষা পাইয়া পুরুষগণ বিপথগামী না হয়, তবে স্ত্রীলোকেরা কেন বিপথগামিনী
হইবে? এমন জাতি, যাহারা নিজেদের অর্দ্ধেক লোককে
মূর্খতা ও ‘‘পর্দা’’ রূপ কারাগারে আবদ্ধ রাখে, তাহারা অন্যান্য জাতির - যাহারা
সমানে সমানে স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন করিয়াছে, তাহাদের
সহিত জীবন-সংগ্রামে কিরূপে প্রতিযোগিতা করিবে?’’
ভারতবর্ষে
এক কোটি লোক ভিক্ষাজীবী, তন্মধ্যে
মুসলমানের সংখ্যাই অধিক। সুতরাং তাহারা কোন মুখে অন্যজাতির
সহিত সমকক্ষতা করিবে? আমরা
আবার কৌলিন্যের বড়াই করি! ভিক্ষাবৃত্তি সর্বাপেক্ষা নীচ কার্য, আর মুসলমানের সংখ্যাই ইহাতে অগ্রণী। ইহার কারণ এই যে, তাহারা স্ত্রীলোকদিগকে শারীরিক
ও মানসিক বিকাশ সাধনে বঞ্চিত রাখিয়া সর্ববিষয়ে পঙ্গু করিয়া রাখিয়াছে। ফলে তাহাদের গর্ভজাত সন্তান অলস
ও শ্রমকাতর হয় ঃ সুতরাং ‘‘বাপ
দাদার নাম’’ লইয়া ভিক্ষা ছাড়া তাহারা আর কি
কাজ করিবে?
এখন
স্ত্রীকেরা ভোট দানের অধিকার প্রাপ্ত হইয়াছে, কিন্তু
মুসলিম মহিলাগণ এ অধিকারের সদ্ব্যবহার স্বেচ্ছায় বঞ্চিতা রহিয়াছেন। গত ইলেকশনের সময় দেখা গেল কলিকাতায়
মাত্র ৪ জন স্ত্রীলোক ভোগ দিয়াছে। ইহা কি মুসলমানের জন্য গৌরবের
বিষয়? তাঁহারা কোন সুযোগের আশায় বা
অপেক্ষায় বসিয়া আছেন?
যে
পর্যন্ত পুরুষগণ শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে স্ত্রীলোকদিগকে তাহাদের প্রাপ্য অধিকার দিতে
স্বীকৃত না হয়,
সে পর্যন্ত
তাহারা স্ত্রীলোকদিগকে শিক্ষা দিবে না।
যাহারা
নিজের সমাজকে উদ্ধার করিতে পারিতেছে না, তাহারা
আর দেশোদ্ধার কিরূপে করিবে ? অর্ধ্বাঙ্গীকে
বন্দিনী রাখিয়া নিজে স্বাধীনতা চাহে, এরূপ
আকাক্সক্ষা পাগলেরই শোভা পায়! সদাশয় বৃটিশ গভর্নমেন্ট যেমন ভারতবাসীর উচ্ছাকাঙক্ষা
সহ্য করিতে চাহেন না - আমার মনে পড়ে প্রায় ২১ বৎসর পূর্বে মিস্টার মর্লি বলিয়াছিলেন, ‘‘যদি তাঁহারা চাঁদের জন্য আব্দার
করে (ওভ ঃযবু পৎু ভড়ৎ ঃযব গড়ড়হ), তাহা
আমরা দিতে পারি না” ইত্যাদি
এবং আমাদের অমুসলমান প্রতিবেশীগণ এখন সাধারণত যেরূপ মুসলমানদের দাবী-দাওয়া সহ্য করিতে
পারেন না, সেইরূপ মুসলমান পুরুষগণও নারীজাতির
কোন প্রকার উন্নতির অভিলাষ স্বীকার করিতে চাহেন না। কিন্তু
আল্লাহর কুদরত বা প্রকৃতির নিয়ম অতি চমৎকার! তিনি এ বিশ্ব জগ\কে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধিয়া
রাখিয়াছেন - আমরা পরস্পরের সহিত এরূপ ভাবে জড়িত আছি যে, একে অপরকে অতিক্রম করিয়া চলিতে
পারি না। মুসলিম ভ্রাতৃগণ যতদিন আমাদের
দুঃখ-সুখের প্রতি মনোযোগ না করিবেন, ততদিন
তাঁহাদের কথাও ভারতের অপর ২২ কোটি লোকে শুনিবে না, আর
যত দিন ঐ ২২ কোটি লোকে ৮ কোটি মুসলমানকে উপেক্ষা করিবে ততদিন পর্যন্ত তাঁহারে রোদনও
বৃটিশ গভর্নমেন্টের কর্ণকূহরে প্রবেশ করিবে না। বহুদিন
হইল একটি বটতলার পুঁথিতে পড়িয়াছিলোমঃ-
‘‘আপনি যেমন মার খাইতে পারিবে,
বুঝিয়া তেয়ছাই মার আমাকে মারিবে’’।
হযরত
ঈসা (আঃ) বলিয়াছেন, ‘‘তুমি
নিজে অপরের নিকট যেরূপ ব্যবহার পাইতে ইচ্ছা কর, অপরের
সহিত সেইরূপ ব্যবহার করিও”। এস্থলে আমি শেখ সাহেবের আর একটি
উক্তি উদ্ধৃতি করিবার লোভ সম্বরণ করিতে পারিতেছি না, তাহা
এই:-
ভারতবর্ষের
অবরোধ-প্রথা স্ত্রীলোকদের পক্ষে অত্যন্ত মারাত্মক। অবরোধ-প্রথা
আমাদের সমাজের সর্বাপেক্ষা যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত। ভ্রাতৃগণ!
পর্দার নাম শুনিবা মাত্র আপনারা হয়ত এক যোগে বলিয়া উঠিবেন, ‘তবে কি আমরা ইংরাজদের অনুকরণে
বিবিদের রাজপথে বেড়াইতে দিব?’ তদুত্তরে
বলি, আমি মুসলমান শাস্ত্রের সীমার
মধ্যে থাকিয়া আপনাদের সহিত কথা বলিতে চাই।
ভারতীয়
পর্দার সহিত শাস্ত্রীয় পর্দার কোন সম্বন্ধ নাই বলিলে অত্যুক্তি হইবে না।
পর্দা
সম্বন্ধে আমি নিজের কোন মত প্রকাশ করিতে ইচছুক নহি - কেবল এই টুকু বলি যে, শেখ সাহেব পর্দাকে ‘‘সর্বাপেক্ষা যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত’’ বলিয়াছেন, আমি তাহা মনে করি না। ‘‘যন্ত্রণাদায়ক’’ হইলে অবলাগণ ‘বাবারে! মারে! মলুম রে! গেলুম
রে!’ বলিয়া আর্তনাদে গগন বিদীর্ণ করিতেন। অবরোধ প্রথাকে প্রাণঘাতক কার্বনিক
এসিড গ্যাসের সহিত তুলনা করা যায়। যেহেতু তাহাকে বিনা যন্ত্রণায়
মৃত্যু হয় বলিয়া লোকে কার্বনিক গ্যাসের বিরুদ্ধে সতর্কতা অবলম্বন করিবার অবসর পায় না!
অন্তঃপুরবাসিনী নারী এই অবরোধ গ্যাসে বিনা ক্লেশে তিল তিল করিয়া নীরবে মরিতেছে।
মুসলমান
বালিকাদের প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে কোরান শিক্ষাদান করা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রয়োজন। কোরান শিক্ষা অর্থে শুধু টীয়া
পাখীর মত আরবী শব্দ আবৃত্তি করা আমার উদ্দেশ্য নহে। বিভিন্ন
প্রাদেশিক ভাষায় কোরানের অনুবাদ শিক্ষা দিতে হইবে। সম্ভবতঃ
এজন্য গভর্নমেন্ট বাধ্যতামূলক আইন পাশ না করিলে আমাদের সমাজ মেয়েদের কোরান শিক্ষাও
দিবে না। যদি কেহ ডাক্তার ডাকিয়া ব্যবস্থাপত্র
লয়, কিন্তু তাহাতে লিখিত ঔষধ-পথ্য
ব্যবহার না করিয়া সে ব্যবস্থাপত্রখানাকে মাদুলীরূপে গলায় পরিয়া থাকে, আর দৈনিক তিনবার করিয়া পাঠ করে, তাহাতে কি সে উপকার পাইবে? আমরা পবিত্র কোরান শরীফের লিখিত
ব্যবস্থা অনুযায়ী কোন কার্য করি না, শুধু
তাহা পাখীর মত পাঠ করি আর কাপড়ের থলিতে (জুযদানে) পুরিয়া অতি যতেœ উচ্চ স্থানে রাখি। কিছুদিন হইল, মিসর হইতে অগতা বিদুষী মহিলা
মিস যাকিয়া সুলেহান এলাহাবাদে এক বিরাট মুসলিম সভায় বক্তৃতা দানকালে বলিয়াছিলেন, ‘‘উপস্থিত যে যে ভদ্রলোক কোরানের
অর্থ বুঝেন, তাঁহারা হাত তুলুন’’। তাহাতে
মাত্র তিন জন ভদ্রলোক হাত তুলিয়াছিলেন।
কোরান-জ্ঞানে
যখন পুরুষদের এইরূপ দৈন্য, তখন
আমাদের দৈন্য যে কত ভীষণ, তাহা
না বলাই ভাল। সুতরাং কোরানের বিধিব্যবস্থা
কিছুই আমরা অবগত নহি। স’ানীয় ভাষা বলিতে অন্য স্থানের
ভাষা যাহাই হউক,
কলিকাতার
ভাষা কি হইবে?
ষোল বৎসর
যাবৎ এই সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল পরিচালনার ফলে আমি এই জ্ঞান লাভ করিয়াছি যে, এখানকার মুসলমানেরা মাতৃহীন
- অর্থাৎ আমাদের মাতৃভাষা নাই। তাহারা উর্দুকে মাতৃভাষা বলিয়া
দাবী করে বটে;
কিন্তু
এমন বিকৃত উর্দু বলে যে, তাহা
শুনিলে শ্রবণবিবর ক্ষত-বিক্ষত হয়। যাহা হউক, তথাপি উর্দু এবং বাঙ্গালা উভয়
অনুবাদই শিক্ষা দিতে হইবে। আমার অমুসলমান ভগিনীগণ! আপনারা
কেহ মনে করিবেন না যে, প্রাথমিক
শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কোরান শিক্ষা দিতে বলিয়া আমি গোঁড়ামীর পরিচয় দিলাম। তাহা নহে, আমি গোঁড়ামী বহুদূরে। প্রকৃত কথা এই যে, প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু
শিক্ষা দেওয়া হয়,
সে সমস্ত
ব্যবস্থাই কোরানে পাওয়া যায়। আমাদের ধর্ম ও সমাজ অক্ষুণœ রাখিবার জন্য কোরান শিক্ষা একান্ত
প্রয়োজন।
মুসলমানদের
যাবতীয় দৈন্য-দুর্দশার একমাত্র কারণ স্ত্রীশিক্ষায় ঔদাস্য। ভ্রাতৃগণ
মনে করেন, তাঁহারা গোটাকতক আলীগড় ও ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলিকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর করিয়া পুলসিরাত (পারলৌকিক সেতু বিশেষ)
পার হইবেন - আর পার হইবার সময় স্ত্রী ও কন্যাকে হ্যাণ্ড ব্যাগে পুরিয়া লইয়া যাইবেন। কিন্তু বিশ্বনিয়ন্তা বিধাতার
বিধান যে অন্য রূপ - যে বিধি-অনুসারে প্রত্যেককেই স্ব - স্ব কর্মফল ভোগ করিতে হইবে। সুতরাং স্ত্রীলোকদের উচিত যে, তাঁহারা বাক্স-বন্দী হইয়া মালগাড়ীতে
বসিয়া সশরীরে স্বর্গলাভের আশায় না থাকিয়া স্বীয় কন্যাদের সুশিক্ষায় মনোযোগী হন। কন্যার বিবাহের সময় যে টাকা অলঙ্কার
ও যৌতুক ক্রয়ে ব্যয় করেন, তাহারই
কিয়দংশ তাহারে সুশিক্ষায় ও স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যয় করুন। স্বাস্থ্যরক্ষার
জন্য শারীরিক ব্যায়াম চর্চা করা প্রয়োজন; আর
প্রয়োজন বিশুদ্ধ বাতাসের। আল্লাহর দান বিশুদ্ধ বাতাস বিনা
পয়সায় গ্রহণ করিতে মহিলাগণ কেন অনিচ্ছুক, আমি
তাহা বুঝিতে পারি না। শীতকালে তাঁহারা এরূপভাবে জানালা-দ্বার, বিশেষতঃ সার্সী বন্ধ করিয়া রাখেন
যে, আমার মনে হয়, গভর্নমেন্ট কেন আইন করিয়া দ্বার-জানালার
সার্সী ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করেন না। পাঁচ ছয় বৎসর হইল, ডাক্তার মিস কোহেন বালিকা-বিদ্যালয়সমূহের
ছাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ভারপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। আমাদের
স্কুলের কতিপয় বালিকার স্বাস্থ্যের রিপোর্ট যখন তাহাদের মাতার নিকট এই অনুরোধ সহ গেল
যে, ‘‘আপনারা অনুগ্রহপূর্বক শীঘ্র ডাক্তার
দ্বারা চিকিৎসা করুন’’, তাহাতে
তাঁহারা চটিয়া এই উক্তর দিলেন, ‘‘ স্কুলমে
লাড়কী পড়নে কো দিয়া হায়, না
বিচার করনে কো,
কে, আখ কমজোর, দাঁত কম-জোর, হলক মে ঘাও হায়, ফেঁফড়া খারাব হ্যায়! ইয়ে সব বোলনে
সে হামারী লাড়কী কা শাদী ক্যায়সে হোগা? ইয়ে
সব বাৎ রহনে দে,
হামারী
লাড়কী কো ডাক্তারনীসে না দেখায়ে!’’ ইয়া
আল্লাহ! মেয়ের প্রাণ লইয়া টানাটানি, অথচ
শাদীর চিন্তায় মায়ের চোখে ঘুম ধরে নাই।
ফল কথা, অশিক্ষিতা মাতার নিকট ইহাপেক্ষা
আর কি আশা করা যাইতে পারে?
আমাদের
স্কুলের ছাত্রীগণ পরীক্ষার সময় প্রায়শঃ ভূগোল, ইতিহাস
এবং স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় বিষয়ে অকৃতকার্য (ফেল) হয়; ইহার
কারণে এই যে,
তাহারা
নিজেদের বাসভবন এবং স্কুল-গৃহ ব্যতীত দুনিয়ার আর কিছুই দেখিতে পায় না, এই দুনিয়ায় তাহাদের পিতা ও ভ্রাতা
ছাড়া আরও কেহ আছে কিনা, তাহা
তাহারা জানে না;
রুদ্ধ বায়ুপূর্ণ
কক্ষে আবদ্ধ থাকিয়া মা-মাসীকে অনবরত রোগ-ভোগ ও স্বাস্থ্য নষ্ট করিতে দেখে। তাহারা কেবল জানে, অসুখ হইলে ডাক্তার ডাকিতে হয়। এই সকল কু-রোগের একমাত্র ঔষধ
সুশিক্ষা।
উপসংহারে
সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল এবং আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলামের উল্লেখ করা বোধ হয়
অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। কলিকাতার মুসলিম সমাজের উন্নতির
নিমিত্ত এই উভয় প্রতিষ্ঠানই প্রাণপণে যতœ করিতেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ইহারা এখনও পূর্ণ মাত্রায় সফলতা
লাভ করে নাই। স্কুলটিকে হাই স্কুলে উন্নীত
করা এবং ইহার জন্য একটা নিজের বাড়ী হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন এবং আঞ্জুমানটি মহিলা-সমাজে
সর্বজনপ্রিয় হওয়া বাঞ্ছনীয়।
আজ
আপনাদের অনেকখানি সময় নষ্ট করিলাম, তজ্জন্য
ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া এখন আমি ইতি করি।
সওগাত
চৈত্র, ১৩৩৩

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন