রবিবার, ২৯ জুলাই, ২০১২

শোয়াইব জিবরান সম্পাদিত ‘শিক্ষাচিন্তা’, বাংলার শিক্ষাচিন্তা সংখ্যা, প্রবন্ধ-৩


বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর সাহিত্যে শিক্ষাভাবনা
লুৎফর রহমান জয়

ইহা কখনও সম্ভব নহে যে, বিদ্যালয়ে পুস্তক পড়াইয়া, ব্যাকরণ সাহিত্য জ্যামিতি শিখাইয়া, সপ্তকোটি লোকের শিক্ষা বিধান করা যাইতে পারে সে শিক্ষা শিক্ষাই নহে, এবং সে উপায়ে এ শিক্ষা সম্ভবও নহে চিত্তবৃত্তি সকলের প্রকৃত অবস্থা, স্ব স্ব কার্য্যে দক্ষতা, কর্ত্তব্য কার্য্যে উৎসাহ, এই শিক্ষাই শিক্ষা -বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮১৮-১৮৯৪) তাঁর রচিত বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিক্ষা বিষয়ক যে চিন্তা ভাবনার স্বাক্ষর রেখেছেন তা বোধ করি বাঙালী সমাজে এখনও অতি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার দাবি রাখে এ নিবন্ধে মূলত বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যসমগ্র (উপন্যাস ব্যতিত) এবং ব্যক্তি জীবন বিশ্লেষণ করে শিক্ষা বিষয়ক ভাবনার একটি যতসামান্য স্কেচ উপস্থাপন করা হয়েছে
পারিবারিক জীবন বঙ্কিমচন্দ্রের শিক্ষা ও সাহিত্য সাধনায় সহায়ক হয়েছে পিতা তাঁকে সে আমলে উৎকৃষ্ট শিক্ষা-ইংরেজি শিক্ষা দিয়েছিলেন ইংরেজ সরকারের অধীনে দায়িত্বপূর্ণ পদসূত্রে পিতার সাথে পদস্থ ইংরেজদের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক বলে অনেক সমালোচক মনে করেছেন ফলে তাঁর ইংরেজি শিক্ষার পথটি সুগম হয়ে ওঠে আবার একই বিষয়কে উল্লেখ করে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে: বঙ্কিমচন্দ্র পাশ্চাত্য শিক্ষায় ব্যুৎপন্ন উচ্চশিক্ষিতহইয়াও অন্য দশ জনের মত ইঙ্গবঙ্গীভূত না হইয়া কিরূপে তিনি বাঙালী তথা স্বদেশী ভাবাপন্ন হইয়া উঠিলেন, ইহা বাস্তবিকই অনুসন্ধেয় বিষয়২ শৈশবে গ্রামের পাঠশালায় বঙ্কিমচন্দ্রের হাতেখড়ি হয় অতি অল্প বয়সেই তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় মেলে কনিষ্ঠ সহোদয় পূর্ণচন্দ্র লিখেছেন : ‘‘শুনিয়াছি বঙ্কিমচন্দ্র একদিনে বাঙ্গালা বর্ণমালা আয়ত্ত করিয়াছিলেন
পাঠশালার গুরুমশায়ের কাছে শিক্ষায় তাঁরও বিশেষ কোন উপকার হয় নি পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন: সৌভাগ্যক্রমে আমরা আট-দশ মাসে এই মহাত্মার হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করিয়া মেদিনীপুরে গেলামপাঠশালার মুখস্থ বিদ্যার বিরুদ্ধে তিনি এমনটি বলেছেন
প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সামাজিক কল্যাণীয় কর্মময় কর্মযজ্ঞকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র ধর্ম্মতত্ত্বে লিখেছেন: ‘‘সমাজকে ভক্তি করিবে ইহা স্মরণ রাখিবে যে, মানুষের যত গুণ আছে- সবই সমাজে আছে সমাজ আমাদের শিক্ষাদাতা, দণ্ডপ্রণেতা, ভরণ-পোষণ এবং রক্ষাকর্তা সমাজই রাজা সমাজই শিক্ষক ভক্তিভাবে সমাজের উপকারে যতœবান হইবে’’
সমাজের অনিষ্টের জন্য আধুনিক শিক্ষা প্রণালীর তিনটি দোষ বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর রচিত ধর্ম্মতত্ত্বের নবম অধ্যায় জ্ঞানার্জ্জনী বৃত্তি’-তে উল্লেখ করেছেন গুরু-শিষ্যের আলাপচারিতার মাধ্যমে এই বক্তব্য তিনি গুরুর মাধ্যমে দিয়েছেন আধুনিক শিক্ষা প্রণালীর প্রথম দোষ হিসেবে গুরু বলছেন:
‘‘জ্ঞানর্জ্জনী বৃত্তিগুলির প্রতিই অধিক মনোযোগ; কার্যকারিণী বা চিত্ত রঞ্জিণীর প্রতি প্রায় অমনোযোগ এই প্রথার অনুবর্ত্তী হইয়া আধুনিক শিক্ষকেরা শিক্ষালয়ে শিক্ষা দেন বলিয়া, এদেশে ও ইউরোপে এত অনিষ্ট হইতেছে এদেশে বাঙ্গালীরা অমানুষ হইতেছে; তর্ককুশলী, বাগ্মী বা সুলেখক - ইহাই বাঙ্গালীর চরমোৎকর্ষের স্থান হইয়াছে ইহারই প্রভাবে ইউরোপের কোন প্রদেশের লোক কেবল শিল্পকশল, অর্থগৃধন স্বার্থপর হইতেছে; কোন দেশে রণপ্রিয়, পরস্বাপহারী পিশাচ জন্মিতেছে ইহারই প্রভাবে ইউরোপে এত যুদ্ধ, দুর্ব্বলের উপর এত পীড়ন শারীরিক বৃত্তি, কার্য্যকারিণী বৃত্তি, মনোরঞ্জিনী বৃত্তি, যতগুলি আছে, সকলগুলির সঙ্গে সামঞ্জস্যযোগ্য যে বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলন, তাহাই মঙ্গলকর; সেগুলির অবহেলা, আর বুদ্ধিবৃত্তির অসঙ্গত স্ফুর্ত্তি মঙ্গলদায়ক নহে আমাদিগের সাধারণ লোকের ধর্ম্মসংক্রান্ত বিশ্বাস এরূপ নহে হিন্দুর পূজনীয় দেবতাদিগের প্রাধান্য, রূপবান চন্দ্রে বা বলবান কাত্ত্র্েিকয়ে নিহিত হয় নাই; বুদ্ধিমান বৃহস্পতি বা জ্ঞানী ব্রহ্মার অর্পিত হয় নাই; রসজ্ঞ গন্ধর্ব্বরাজ বা বাºেবীতে নহ্ েকেবল সেই সর্ব্বাঙ্গসম্পন্ন-অর্থাৎ সর্ব্বাঙ্গীন পরিণতি বিশিষ্ট ষড়ৈশ্বর্য্যশালী বিষ্ণুতে নিহিত হইয়াছে অনুশীলন নীতির স্থুল গ্রন্থি এই যে, সর্ব্বপ্রকার বৃত্তি পরস্পরের সহিত সামঞ্জস্যবিশিষ্ট হইয়া অনুশীলিত হইবে, কেহ কাহাকে ক্ষুণœ করিয়া অসঙ্গত বৃদ্ধি পাইবে না আধুনিক শিক্ষাপ্রণালীর দ্বিতীয় দোষ বা ভ্রম এই যে, সকলকে এক এক, কি বিশেষ বিশেষ বিষয়ে পরিপক্ক হইতে হইবে - সকলের সকল বিষয় শিখিবার প্রয়োজন নাই যে পারে, সে ভাল করিয়া বিজ্ঞান শিখুক, তাহার সাহিত্যের প্রয়োজন নাই যে পারে, সে সাহিত্য উত্তম করিয়া শিখুক, তাহার বিজ্ঞানে প্রয়োজন নাই তাহা হইলে মানসিক বৃত্তির সকলগুলির স্ফুর্ত্তিও পরিণতি হইল কৈ?  সবাই আধখানা করিয়া  মানুষ হইল, আস্ত মানুষ পাইব কোথা? যে বিজ্ঞানকুশলী, কিন্তু কাব্যরসাদির আস্বাদনে বঞ্চিত, সে কেবল আধখানা মানুষ অথবা যে সৌন্দর্য্যদত্ত প্রাণ -সর্ব্বসৌন্দর্য্যরে রসগ্রাহী, কিন্তু জগতের অপূর্ব্ব বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে অজ্ঞ - সেও আধখানা মানুষ উভয়েই মনুষ্যত্ববিহীন আধুনিক শিক্ষাপ্রণালীর তৃতীয় দোষ হিসাবে গুরু বলছেন: জ্ঞানার্জ্জনী বৃত্তিগুলির সম্বন্ধে বিশেষ একটি সাধারণ ভ্রম এই যে, সংকর্ষণ অর্থাৎ শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জ্জন বৃত্তির স্ফুরণ নহে যদি কোন বৈদ্য, রোগীকে উদর ভরিয়া পথ্য দিতে ব্যতিব্যস্ত হয়েন, অথচ তাহার ক্ষুধাবৃদ্ধি বা পরিপাকশক্তির প্রতি কিছুমাত্র দৃষ্টি না করেন, তবে সেই চিকিৎসক যেরূপ ভ্রান্ত এই প্রণালীর শিক্ষকেরাও সেইরূপ ভ্রান্ত যেমন সেই চিকিৎসকের চিকিৎসার ফল অজীর্ণ, রোগবৃদ্ধি - তেমনি এই জ্ঞানার্জ্জন বাতিকগ্রস্ত শিক্ষকদিগের শিক্ষার ফল মানসিক অজীর্ণ বৃত্তি সকলের অবনতি মুখস্থ কর, মনে রাখ, জিজ্ঞাসা করিলে যেন চটপট করিয়া বলিতে পার তারপর, বুদ্ধি তীক্ষè হইল, কি শুষ্ক কাষ্ঠ কোপাইতে কোপাইতে ভোঁতা হইয়া গেল, স্বশক্তি অবলম্বিনী হইল, কি প্রাচীন পুস্তকপ্রণেতা এবং সমাজের শাসনকর্ত্তারূপ বৃদ্ধপিতামহীবর্গের আঁচল ধরিয়া চলিলে, জ্ঞানার্জ্জনী বৃত্তিগুলি বুড়ো খোকার মত কেবল গিলাইয়া দিলে গিলিতে পারে, কি আপনি আহরার্জ্জনে সক্ষম হইল, সে বিষয়ে কেহ ভ্রমেও চিন্তা করেন না এই সকল শিক্ষিত গর্দ্দভ জ্ঞানের ছালা পিঠে করিয়া নিতান্ত ব্যাকুল হইয়া বেড়ায় - বিস্মৃতি নামে করুণাময়ী দেবী আসিয়া ভার নামাইয়া লইলে, তাহারা পালে মিশিয়া স্বচ্ছন্দে ঘাস খাইতে থাকে ’’
বাঙলায় শিক্ষার পদ্ধতি আর প্রকৃত রূপ তুলে ধরতে বঙ্কিম তাঁর কমলাকান্ত গ্রন্থে ঢেঁকিপ্রবন্ধে আরও সুন্দর ব্যঙ্গরসে বলেছেন: দেখিলাম, এ সংসার কেবল ঢেঁকিশাল বড় বড় ইমারত, বৈঠকখানা, রাজপুরী সব ঢেঁকিশালা- তাহাতে বড় বড় ঢেঁকি, গড়ে নাম পুরিয়া খাড়া হইয়া রহিয়াছে কোথাও জমিদাররূপে ঢেঁকি প্রজাদিগের হৃদপিণ্ড গড়ে পিষিয়া নূতন নিরিখ রূপ চাউল বাহির করিয়া সুখে সিদ্ধ করিয়া অন্ন ভোজন করিতেছেন কোথাও আইনকারক ঢেঁকি, মিনিট রিপোর্টের রাশি গড়ে পিষিয়া, ভানিয়া বাহির করিতেছেন - আইন; বিচারক ঢেঁকি সেই আইনগুলি গড়ে পিষিয়া বাহির করিতেছেন - দারিদ্র, কারাবাস - ধনীর ধনান্ত - ভাল মানুষের দেহান্ত
বাবু ঢেঁকি, বোতল গড়ে পিতৃধন পিষিয়া বাহির করিতেছেন - পিলে যকৃৎ; তাঁর গৃহিনী ঢেঁকি একাদশীর গড়ে বাজার খরচ পিষিয়া বাহির করিতেছেন - অনাহার সর্ব্বাপেক্ষা ভয়ানক দেখিলাম লেখক ঢেঁকি - সাক্ষাৎ মা সরস্বতীর মুণ্ড ছাপার গড়ে পিষিয়া বাহির করিতেছেন-স্কুলবুক৬ অন্যদিকে বঙ্কিমচন্দ্র সমাজ শিক্ষার মাধ্যমগুলোকে যেভাবে চোখে আঙ্গুল দিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন তা বর্তমান সমাজেও প্রচলিত রয়েছে বর্তমানে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবী শিক্ষাবিদ অনেকটা দায়সারা গোছের যে জনপ্রিয় কলাম লেখার প্রতিযোগিতা অব্যাহত রেখেছেন তাকেই বলা চলে তিনি কমলাকান্তের পত্রপ্রথম সংখ্যায় কি লিখিব’? প্রবন্ধে ব্যঙ্গ করেছেন সম্পাদকের সঙ্গে লেখক (কমলাকান্ত) পত্রে চুক্তি করছেন সেখানে লেখক সম্পাদকের কাছে লিখছেন:
আপনার সঙ্গে একটা বন্দোবস্ত পাকাপাকি করিবার আগে, গোটা কত কথা জিজ্ঞাসা আছে এ কমলাকান্তি কলে, ফরমায়েস মত সকল রকমের রচনা প্রস্তুত হয় - আপনার চাই কি? নাটক নবেল চাই, না পলিটিক্সের দরকার? কিছু ঐতিহাসিক গবেষণা পাঠাইব, না সংক্ষিপ্ত সমালোচনার বাহার দিব? বিজ্ঞানশাস্ত্রে আপনার প্রসক্তি, না ভৌগোলিকতত্ত্ব রসে আপনি সুরসিক? স্কুল কথাটা, গুরু বিষয় পাঠাইব, না লঘু বিষয় পাঠাইব? আমার রচনার মূল্য, আপনি গজ দরে দিবেন, না মণ দরে দিবেন? আর যদি গুরু বিষয়েই আপনার অভিরুচি হয়, তবে বলিবেন, তাহার কি প্রকার অলঙ্কার সমাবেশ করিব আপনি কোটেশ্যন ভালবাসেন, না ফুটনোটে আপনার অনুরাগ? যদি কোটেশ্যন বা ফুটনোটের প্রয়োজন হয়, তবে কোন্ ভাষা হইতে দিব, তাহাও লিখিবেন ইউরোপ ও আশিয়ার সকল ভাষার কোটেশ্যন, আমি অচিরাৎ প্রস্তুতি করিব, আপনি চিন্তিত হইবেন না’’
কমলাকান্তের পঞ্চম সংখ্যায় আমার মনপ্রবন্ধে শিক্ষার বিপরীতে মানুষ এখন বাহ্য সম্পদ বা মেটিরিয়েল প্রস্পেরিটির অনুরাগে অনুরক্ত সে বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন: ... কি ইংরেজি কি বাঙ্গালা, যে সম্বাদপত্র, সাময়িক পত্র, স্পীচ, ডিবেট, লেক্চর, যাহা কিছু পড়ি বা শুনি, তাহাতে এই বাহ্য সম্পদ ভিন্ন আর কোন বিষয়ের কোন কথা দেখিতে পাই না হর হর বম্ বম্ বাহ্য সম্পদের পূজা কর হর হর বম্ বম্ টাকার রাশির উপর টাকা ঢাল! টাকা ভক্তি, টাকা মুক্তি, টাকা নতি, টাকা গতি! টাকা ধর্ম্ম, টাকা অর্থ, টাকা কাম, টাকা মোক্ষ! ওপথে যাইও না, দেশের টাকা কমিবে, ও পথে যাও, দেশের টাকা বাড়িবে! বম্ বম্ হর হর! টাকা বাড়াও, টাকা বাড়াও, রেলওয়ে টেলিগ্রাফ অর্থ - প্রসূতি, ও মন্দিরে প্রণাম কর! যাতে টাকা বাড়ে, এমন কর; শূন্য হইতে টাকা বৃষ্টি হইতে থাকুক! টাকার ঝনঝনিতে ভারতবর্ষ পুরিয়া যাউক! মন; মন আবার কি? টাকা ছাড়া মন কি? টাকা ছাড়া আমাদের মন নাই; টাকশালে আমাদের মন ভাঙ্গে গড়ে টাকায় বাহ্য সম্পদ ... শিক্ষা এবং উৎসাহ ইহাতে নৈবেদ্য এবং হৃদয় ইহাতে ছাগবলি’’
বাঙালি জাতি শিক্ষা ক্ষেত্রে ধার করা বা অনুকরণ করা পদ্ধতির মাধ্যমে এ পর্যায়ে এসেছে এই ধার করা অথবা অনুকরণ করা বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিবিধ প্রবন্ধের অনুকরণপ্রবন্ধে শিক্ষা ও সভ্যতা সম্বন্ধে কতগুলি তত্ত্বসকল উপলব্ধ আকারে উল্লেখ করেছেন:
‘‘১. সামাজিক সভ্যতার আদি দুই প্রকার; কোন কোন সমাজ স্বত: সভ্য হয়, কোন কোন সমাজ অন্যত্র হইতে শিক্ষা লাভ করে প্রথমোক্ত সভ্যতা লাভ বহুকার সাপেক্ষ; দ্বিতীয়োক্ত আশু সম্পন্ন হয়
২. যখন কোন অপেক্ষাকৃত অসভ্য জাতি, সভ্যতর জাতির সংস্পর্শ লাভ করে তখন দ্বিতীয় পথে সভ্যতা অতি দ্রুতগতিতে আসিতে থাকে সে স্থলে সামাজিক গতি এইরূপ হয় যে, অপেক্ষাকৃত অসভ্য সমাজ সভ্যতর সমাজের সর্ব্বাঙ্গীন অনুকরণে প্রবৃত্ত হয় ইহাই স্বাভাবিক নিয়ম
৩. অতএব বঙ্গীয় সমাজের দৃশ্যমান অনুকরণপ্রবৃত্তি অস্বাভাবিক বা বাঙ্গালির চরিত্র দোষজনিত নহে
৪. অনুকরণ মাত্রই অনিষ্টকারী নহে, কখন কখন তাহাতে গুরুতর সুফলও জন্মে; প্রথমাবস্থায় অনুকরণ, পরে স্বাতন্ত্র আপনিই আসে বঙ্গীয় সমাজের অবস্থা বিবেচনা করিলে, এই অনুকরণ প্রবৃত্তি যে ভাল নহে, এমত নিশ্চয় বলা যাইতে পারে না ইহাতে ভরসার স্থলও আছে
৫. তবে অনুকরণে গুরুতর সুফলও আছে উপযুক্ত কাল উত্তীর্ণ হইলেও অনুকরণ প্রবৃত্তি বলবতী থাকিলে অথবা অনুকরণের যথার্থ সময়েই অনুকরণপ্রবৃত্তি অব্যবহিতরূপে স্ফুর্ত্তি পাইলে, সর্ব্বনাশ উপস্থিত হইবে’’
অনুকরণ, মূল শিক্ষা এবং সভ্যতা নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র বিবিধ প্রবন্ধের প্রাকৃতিক নিয়মনিবন্ধে একটু ভিন্নভাবে বলেছেন:
‘‘জ্ঞান বৃদ্ধিই যে সভ্যতার মূল এবং পরিমাণ, ইহা বকল কর্ত্তৃক সপ্রমাণ হইয়াছে বকল বলেন যে, জ্ঞানিক উন্নতি ভিন্ন নৈতিক উন্নতি নাই সে কথায় আমরা অনুমোদন করি না কিন্তু জ্ঞানিক উন্নতি যে সভ্যতার কারণ, একথা অবশ্য স্বীকার করিতে হইবে জ্ঞানের উন্নতি না হইলে সভ্যতার উন্নতি হইবে না জ্ঞান আপনি জন্মে না; অতিশয় শ্রমলভ্য কেহ যদি বিদ্যালোচনায় রত না হয়, তবে সমাজ মধ্যে জ্ঞানের প্রকাশ হইবে না কিন্তু বিদ্যালোচনার পক্ষে অবকাশ আবশ্যক বিদ্যালোচনার পূর্ব্বে উদরপোষণ চাই; অনাহারে কেহই জ্ঞানালোচনা করিবে না যদি সকলকেই আহারান্বেষণে ব্যতিব্যস্ত থাকিতে হয়, তবে কাহারও জ্ঞানালোচনার অবকাশ হয় না অতএব সভ্যতার সৃষ্টির পক্ষে প্রথমে আবশ্যক যে, সমাজ মধ্যে একটি স¤প্রদায় শারীরিক শ্রম ব্যতীত আত্মভরণ পোষণে সক্ষম হইবেন অন্যে পরিশ্রম করিবে, তাঁহারা বসিয়া বিদ্যালোচনা করিবেন যদি শ্রমজীবীরা সকলেই কেবল আত্মভরণ- পোষণের যোগ্য খাদ্যোৎপন্ন করে, তাহা হইলে এরূপ ঘটিবে না কেন না, যাহা জন্মিবে, তাহা শ্রমোপজীবীদের সেবায় যাইবে; আর কাহারও জন্য থাকিবে না কিন্তু যদি তাহারা আত্মভরণপোষণের প্রয়োজনীয় পরিমাণের অপেক্ষা অধিক উৎপাদন করে, তবে তাহাদিগের ভরণপোষণ বাদে কিছু সঞ্চিত হইবে তদ্বারা শ্রমবিরত ব্যক্তিরা প্রতিপালিত হইয়া বিদ্যানুশীলন করিতে পারেন তখন জ্ঞানের উদয় সম্ভব উৎপাদকের খাইয়া পরিয়া যাহা রহিল, তাহাকে সঞ্চয় বলা যাইতে পারে অতএব সভ্যতার উদয়ের পূর্ব্বে প্রথমে আবশ্যক - সামাজিক ধনসঞ্চয়’’১০
সামাজিক শিক্ষাক্ষেত্রে ধর্ম পালন কিংবা চর্চা ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র বিশ্লেষণ করেছেন ধর্মপালন কিংবা ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে বর্তমানে (বঙ্কিমের সময় এমন কি এখনও) যে নবীণ ধার্মিক গোষ্ঠী গড়ে উঠছে তারা প্রাচীন সময়ের ধর্মপালনকারীদের থেকে শিক্ষিত, কিন্তু মোটের উপর অল্পশিক্ষিত সে কারণে ধর্মের মাধ্যমে যে মানবিক বন্ধনের শিক্ষা ছিল তা নবীন এই ধার্মিকদের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে বিষয়টিকে তিনি বিবিধ প্রবন্ধ গ্রন্থের প্রাচীনা এবং নবীনাপ্রবন্ধে বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে :
ধর্ম্মে যে নবীনাগণ প্রাচীনাদিগের অপেক্ষা নিকৃষ্ট, তাহার একটি বিশেষ কারণ অসম্পূর্ণ শিক্ষা লেখাপড়া বা অন্য প্রকারের শিক্ষা তাহারা যাহা কিঞ্চিৎ প্রাপ্ত হয়েন, তাহাতেই বুঝিতে পারেন যে, প্রাচীন ধর্ম্মের শাসন অমূলক অতএব তাহাতে বিশ্বাস হারাইয়া, ধর্ম্মের যে বন্ধন ছিল, তাহা হইতে বিমুক্ত হয়েন তাহার স্থানে আর নূতন বন্ধন কিছুই গ্রন্থিবদ্ধ হইতেছে না আমরা লেখাপড়ার নিন্দা করিতেছি না ধর্ম্ম ভিন্ন ইহা সর্ব্বত্র ঘটিয়া থাকে যে, তাহাতে চক্ষু ফুটে, মিথ্যাকে মিথ্যা বলিয়া বোধ হয়, সত্যকে সত্য বলিয়া জানা যায় বিদ্যার ফলে লোকে, প্রাচীন ধর্ম্মশাস্ত্রঘটিত ধর্ম্মের মূলের অলীকত্ব দেখিতে পায়; প্রাকৃতিক যে সত্য ধর্ম্ম, তাহা সত্য বলিয়া চিনিতে পারে অতএব বিদ্যায় ধর্ম্মের ক্ষতি নাই, বরং বৃদ্ধি আছে সচরাচর পণ্ডিতে যাদৃশ ধর্ম্মিষ্ঠ, মুর্খে তাদৃশ পাপিষ্ঠ হয় কিন্তু অল্প বিদ্যার দোষ এই যে, ধর্ম্মের মিথ্যা মূল তদ্বারা উচ্ছিন্ন হয়; অথচ সত্য ধর্ম্মের প্রাকৃতিক মূল সংস্থাপিত হয় না সেটুকু কিছু অধিক জ্ঞানের ফল পরোপকার করিতে হইবে, এটি যথার্থ ধম্মনীতি বটে মুর্খেও ইহা জানে এবং মূর্খদিগের মধ্যে ধর্ম্মে যাহাদের মতি আছে, তাহারাও ইহার বশবর্ত্তী হয় তাহার কারণ এই যে, এই নৈতিক আজ্ঞা প্রচলিত ধর্ম্মশাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে; মূর্খের তাহাতে দৈবাজ্ঞা বলিয়া বিশ্বাস আছে দৈববিধি লঙ্ঘন করিলে ইহলোকে ও পরলোকে ক্ষতিপ্রাপ্ত হইতে হইবে বলিয়া মূর্খ সে নীতির বশবর্ত্তীপণ্ডিত ও সে নীতির বশবর্ত্তী; কিন্তু তিনি ধর্ম্মশাস্ত্রোক্ত বলিয়া তদুক্তির অনুসরণ করেন না তিনি জানেন যে, ধর্ম্মের কতকগুলি প্রাকৃতিক নিয়ম আছে, তাহা অবশ্য পালনীয়; এবং পরোপকারবিধি সেই সকল নিয়মের ফল অতএব এস্থলে ধর্ম্মের ক্ষতি হইল না কিন্তু যদি কেহ ঈদৃশ পরিমাণে মাত্র বিদ্যার আলোচনা করে যে, তদ্বারা প্রাচীন ধর্ম্মশাস্ত্র বিশ্বাস বিনষ্ট হয়, অথচ যতদূর বিদ্যার আলোচনায় প্রাকৃতিক ধর্ম্মে বিশ্বাস জন্মে, ততদূর না যায়, তবে তাহার পক্ষে ধর্ম্মের কোন মূল থাকে না লোকনিন্দাভয়ই তাহাদিগের একমাত্র ধর্ম্মবন্ধন হইয়া উঠে সে বন্ধন অতি দুর্ব্বল আধুনিক অল্পশিক্ষিত যুবক যুবতীগণ কিয়দংশে এই অবস্থাপন্ন; এজন্য ধর্ম্মাংশে তাঁহারা প্রাচীনদিগের সমকক্ষ নহেন১১
শিক্ষা বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রচ্ছন্ন ও গভীর বিশ্লেষণ পাই, তিনি যখন অবতার কৃষ্ণের শিক্ষা নিয়ে কৃষ্ণচরিত্র বিশ্লেষণ করতে প্রচুর অধ্যয়ন করেন তখন কৃষ্ণচরিত্র তৃতীয় খণ্ডে মথুরা-দ্বারকাপর্বে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শিক্ষানিবন্ধে বলছেন:
‘‘যাঁহারা কৃষ্ণকে ঈশ্বর বলিয়া জানেন, তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ বলিতে পারেন, সর্ব্বজ্ঞ ঈশ্বরের আবার শিক্ষা কি? ফলত: কৃষ্ণ ঈশ্বরের অবতার হইলেও মানব ধর্ম্মাবলম্বী এবং মানুষী শক্তি দ্বারাই সকল কার্য সম্পন্ন করেন, একথা আমরা পূর্ব্বে বলিয়াছি এবং এক্ষণেই তাহার ভূরি ভূরি প্রমাণ দেখাইব মানুষী শক্তি দ্বারা কর্ম্ম করিতে গেলে, শিক্ষার দ্বারা সেই মানুষী শক্তিকে অনুশীলিত এবং স্ফূরিত করিতে হয় কৃষ্ণের যে মানুষী শিক্ষা হইয়াছিল, তাহা সান্দীপনিবৃত্তান্ত ভিন্ন আরও প্রমাণ আছে তিনি সমগ্র বেদ অধ্যয়ন করিয়াছিলেন মহাভারতের সভাপর্ব্বে অর্ঘাভিহরণ-পর্ব্বাধ্যায়ে কৃষ্ণের পূজ্যতা বিষয়ে ভীষ্ম একটি হেতু এই নির্দ্দেশ করিতেছেন যে, কৃষ্ণ নিখিল বেদবেদাঙ্গ পারদর্শী তাদৃশ বেদবেদাঙ্গজ্ঞানসম্পন্ন দ্বিতীয় ব্যক্তি দুর্লভ
                              বেদবেদাঙ্গবিজ্ঞানাং বলং চাপ্যধিকং তথা
                              নৃণাং লোকে হি কোহ ন্যোহস্থি বিশিষ্ট: কেশবাদৃতে।।
                              (মহাভারতম, সভাপর্ব্ব ৩৮ অধ্যায়)
মহাভারতে কৃষ্ণের বেদজ্ঞতা সম্বন্ধে এইরূপ আরও ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া যায় এই বেদজ্ঞতা তাঁহার স্বত:লব্ধও নহে ছান্দোগ্য উপনিষদে প্রমাণ পাইয়াছি যে, তিনি আঙ্গিরস-বংশীয় ঘোর ঋষির নিকট অধ্যয়ন করিয়াছিলেন১২
শিক্ষার সঙ্গে চিত্তরঞ্জিনীবৃত্তি জরুরী বলে বঙ্কিমচন্দ্র ধর্মীয় আচার আচরণে চিত্তরঞ্জিনীর বিষয়গুলোকে তুলনা করেছেন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এই বৃত্তিগুলোকে যেমন আবশ্যক করা হয়েছে তেমনি শিক্ষার ক্ষেত্রেও চিত্তরঞ্জনের মহাকর্মকাণ্ডকে সমাজের সর্বস্তরে প্রয়োজনে স্থাপত্য, ভাস্কর্য্য, চিত্রবিদ্যা, সঙ্গীত প্রভৃতির মাধ্যমে করা যেতে পারে বলে তিনি স্বীকৃতি দিয়েছেন তাঁর ভাষায়:
হিন্দুর পূজার পুষ্প, চন্দন, মাল্য, ধূপ, দীপ, ধুনা, গুগগুল, নৃত্য, গীত, বাদ্য প্রভৃতি সকলেরই উদ্দেশ্য ভক্তির অনুশীলনের সঙ্গে চিত্তরঞ্জিনী বৃত্তির অনুশীলনের সম্মিলন অথবা এই সকলের দ্বারা ভক্তির উদ্দীপনা প্রাচীন গ্রীকদিগের ধর্ম্মে এবং মধ্যকালের ইউরোপে রোমীয় খ্রীষ্টধর্ম্মে উপাসনার সঙ্গে চিত্তরঞ্জিনী বৃত্তি সকলের স্ফূর্তির ও পরিতৃপ্তির বিলক্ষণ চেষ্টা ছিল আপিলীস বা রাফেলের চিত্র, মাইকেল এঞ্জিলো বা ফিদিয়সের ভাস্কর্য্য, জর্ম্মানির বিখ্যাত সঙ্গীত প্রণেতাগণের সঙ্গীত উপাসনার সহায় হইয়াছিল চিত্রকরের, ভাস্করের, স্থপতির, সঙ্গীতকারকের সকল বিদ্যা ধর্ম্মের পদে উৎসর্গ করা হইত১৩
বাঙালির নিজস্ব ভাষাকে যথার্থরূপে না ব্যবহারে এবং ইংরেজি প্রীতির কারণে কিংবা আভিজাত্যের নিদর্শনরূপে ইংরেজি ভাষাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে আমাদের মূল শিক্ষায় গলদ রয়ে যাচ্ছে এই বিষয়টিকে বঙ্গিমচন্দ্র তাঁর বঙ্গদর্শনের পত্র-সূচনাপ্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন এভাবে:
আমরা ইংরাজি বা ইংরাজের দ্বেষক নহি ইহা বলিতে পারি যে, ইংরাজ হইতে এদেশের লোকের যত উপকার হইয়াছে, ইংরাজি শিক্ষাই তাহার মধ্যে প্রধান অনন্তরতœপ্রসূতি ইংরাজি ভাষার যতই অনুশীলন হয়, ততই ভাল আরও বলি, সমাজের মঙ্গল জন্য কতকগুলি সামাজিক কার্য্য রাজপুরুষদিগের ভাষাতেই সম্পন্ন হওয়া আবশ্যক আমাদিগের এমন অনেকগুলিন কথা আছে, যাহা রাজপুরুষদিগকে বুঝাইতে হইবে সে সকল কথা ইংরাজিতেই বক্তব্য এমন অনেক কথা আছে যে, তাহা কেবল বাঙ্গালীর জন্য নহে; সমস্ত ভারতবর্ষ তাহার শ্রোতা হওয়া উচিত সে সকল কথা ইংরাজিতে না বলিলে, সমগ্র ভারতবর্ষ বুঝিবে কেন? ভারত বর্ষীয় নানা জাতি একমত, একপরামর্শী, একোদ্যোগী না হইলে, ভারতবর্ষের উন্নতি নাই এই মতৈক্য, একপরামর্শিত্ব, একোদ্যম, কেবল ইংরাজির দ্বারা সাধনীয়; কেন না, এখন সংস্কৃত লুপ্ত হইয়াছে বাঙ্গালী, মহারাষ্ট্রী, তৈলঙ্গী, পাঞ্জাবী, ইহাদিগের সাধারণ মিলনভূমি ইংরাজি ভাষা এই রজ্জুতে ভারতীয় ঐক্যের গ্রন্থি বাঁধিতে হইবে অতএব যতদূর ইংরাজি আবশ্যক ততদূর চলুক কিন্তু একেবারে ইংরাজ হইয়া বসিলে চলিবে না বাঙ্গালী কখন ইংরাজ হইতে পারিবে না বাঙ্গালী অপেক্ষা ইংরাজ অনেক গুণে গুণবান, এবং অনেক সুখেসুখী; যদি এই তিন কোটি বাঙ্গালী হঠাৎ তিন কোটি ইংরাজ হইতে পারিত, তবে সে মন্দ ছিল না কিন্তু তাহার কোন সম্ভাবনা নাই; আমরা যত ইংরাজি পড়ি, যত ইংরাজি কহি বা যত ইংরাজি লিখি না কেন, ইংরাজি কেবল আমাদিগের মৃত সিংহের চর্ম্মস্বরূপ হইবে মাত্র ডাক ডাকিবার সময়ে ধরা পড়িব পাঁচ সাত হাজার নকল ইংরাজ ভিন্ন তিন কোটি সাহেব কখনই হইয়া উঠিবে না গিলটি পিতল হইতে খাঁটি রূপা ভাল প্রস্তুরময়ী সুন্দরী মূর্ত্তি অপেক্ষা, কুৎসিতা বন্যনারী জীবনযাত্রার সুসহায় নকল ইংরাজ অপেক্ষা খাঁটি বাঙ্গালী স্পৃহনীয় ইংরাজি লেখক, ইংরাজি বাচক স¤প্রদায় হইতে নকল ইংরাজ ভিন্ন কখন খাঁটি বাঙ্গালীর সমুদ্ভবের সম্ভাবনা নাই যতদিন না সুশিক্ষিত জ্ঞানবন্ত বাঙ্গালীরা বাঙ্গালা ভাষায় আপন উক্তি সকল বিন্যস্ত করিবেন, ততদিন বাঙ্গালীর উন্নতির কোন সম্ভাবনা নাই ... যেমন শোষক পদার্থের উপরিভাগে জলসেক করিলেই নিম্নস্তর পর্য্যন্ত সিক্ত হয়, তেমনি বিদ্যারূপ জল বাঙ্গালী জাতিরূপ শোষক মৃত্তিকার উপরিস্তরে ঢালিলে, নিম্নস্তরে অর্থাৎ ইতর লোক পর্য্যন্ত ভিজিয়া উঠিবে ... সে যাহাই হউক আমাদিগের দেশের লোকের এই জলময় বিদ্যা যে এতদূর গড়াইবে, এমত ভরসা আমরা করি না বিদ্যা, জল বা দুগ্ধ নহে যে, উপরে ঢালিলে নীচে শোষিবে তবে কোন জাতির একাংশ কৃতবিদ্যা হইলে তাহাদিগের সংসর্গগুণে অন্যাংশের শ্রীবৃদ্ধি হয় বটে কিন্তু যদি ঐ দুই অংশের ভাষার এরূপ ভেদ থাকে যে, বিদ্বানের ভাষা মূর্খে বুঝিতে পারে না, তবে সংসর্গের ফল ফলিবে কি প্রকারে?১৪ উপরোক্ত কথাগুলোর আরও সমর্থন ও বিশ্লেষণ করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর লোক শিক্ষাপ্রবন্ধে তিনি সেখানে বলছেন: ... ইংরেজি শিক্ষা সত্ত্বেও দেশে লোকশিক্ষার উপায় হ্রাস ব্যতিত বৃদ্ধি পাইতেছে না, তাহার স্থুল কারণ বলি - শিক্ষিতে অশিক্ষিতে সমবেদনা নাই শিক্ষিত, অশিক্ষিতের হৃদয় বুঝে না শিক্ষিত, অশিক্ষিতের প্রতি দৃষ্টিপাত করে না মরুক রামা লাঙ্গল চষে, আমার ফাউলকারি সুসিদ্ধ হইলেই হইল রামা কিসে দিনযাপন করে, কিভাবে তার অসুখ, তার কি সুখ, তাহা নদের ফটিকচাঁদ তিলাদ্ধ মনে স্থান দেন না বিলাতে কাণা ফসেট সাহেব এদেশে সার অসলি ইডেন, ইহারা তাহার বক্তৃতা পড়িয়া কি বলিবেন, নদের ফটিকচাঁদের সেই ভাবনা রামা চুলোয় যাক, তাহাতে কিছু আসিয়া যায় না ... বাঙ্গালায় লোক যে শিখিল না! বাঙ্গালায় লোক যে শিক্ষিত নাই, ইহা সুশিক্ষিত বুঝেন না সুশিক্ষিত যাহা বুঝেন, অশিক্ষিতকে ডাকিয়া কিছু কিছু বুঝাইলেই লোক শিক্ষিত হয় এই কথা বাঙ্গালার সর্ব্বত্রে প্রচারিত হওয়া আবশ্যক কিন্তু সুশিক্ষিত, অশিক্ষিতের সঙ্গে না মিশিলে তাহা ঘটিবে না সুশিক্ষিতে অশিক্ষিতে সমবেদনা চাই১৫ বঙ্কিমচন্দ্র গীতার একখানি বাঙ্গালা টীকা লিখেছিলেন সেখানে তিনি বলছেন: ... যেমন টোলের পণ্ডিতেরা, পাশ্চাত্যদিগের উক্তির দেখিয়াও সহজে বুঝিতে পারেন না, যাঁহারা পাশ্চাত্ত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, তাঁহারা প্রাচীন প্রাচ্য পণ্ডিতদিগের বাক্য কেবল অনুবাদ করিয়া দিলে সহজে বুঝিতে পারেন না ইহা তাঁহাদিগের দোষ নহে, তাঁহাদিগের শিক্ষার নৈসর্গিক ফল পাশ্চাত্ত্য চিন্তা-প্রণালী প্রাচীন ভারত-বর্ষীয়দিগের চিন্তাপ্রণালী হইতে এত বিভিন্ন যে, ভাষার অনুবাদ হইলেই ভাবের অনুবাদ হৃদয়ঙ্গম হয় না এখন আমাদিগের শিক্ষিত¤প্রদায় শৈশব হইতে পাশ্চাত্য চিন্তা প্রণালীর অনুবর্ত্তী, প্রাচীন ভারতবর্ষীয় চিন্তা-প্রণালী তাঁহাদিগের নিকট অপরিচিত; কেবল ভাষান্তরিত হইলে প্রাচীন ভাবসকল তাঁহাদিগের হৃদয়ঙ্গম হয় না’’১৬
বেঙ্গল সোস্যালো সায়েন্স এসোসিয়েশন সভায় বঙ্কিমচন্দ্রের দুইটি বক্তৃতার মধ্যে একটি বক্তব্য ছিল বাংলা সাহিত্যের উপর যা কলিকাতা রিভিয়ুতে প্রকাশিত হয় বাংলা সাহিত্যের উপরে এই প্রবন্ধটি শিক্ষা বিষয়ে বর্তমানেও বাঙালি জাতির জন্য সত্য বলে মনে হয় তিনি বাংলা সাহিত্যের উন্নতির জন্য এ প্রবন্ধে অন্তত তিনটি অন্তরায় নির্দেশ করেন সেগুলো হলো :
১.     ইংরাজী শিক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বাংলা সাহিত্য চর্চায় অনুরাগ ও অমনোযোগ
২.     সাহিত্য-পুস্তকের যথোপযুক্ত সমালোচনার অভাব এবং
৩.    জ্ঞানগর্ভ ও বুদ্ধিগ্রাহ্য কঠিন বিষয়কসমূহ পুস্তকে প্রদত্ত হইলে তাহা বাঙালী পাঠক বুঝিবে না - এই ধারণা বশে সহজ করিয়া বাংলা পুস্তক গ্রন্থন১৭
প্রকৃত অর্থে এই অন্তরায়গুলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উপরেই কু-প্রভাব বিস্তার করে আছে সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এবং স্তরে লেখকদের লেখা থেকেই শিক্ষার সিংহভাগ কাজটি সম্পন্ন হয় সে কারণে বঙ্কিমচন্দ্র এই  লেখকবৃন্দকেও সচেতন করেছেন, তাঁদের প্রতি অনুরোধ করেছেন:
যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন যাঁহারা অন্য উদ্দেশ্যে লেখেন, তাহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে
টাকার জন্য লিখিবেন না ইউরোপে এখন অনেক লোক টাকার জন্যই লেখে, এবং টাকাও পায়; লেখাও ভাল হয় কিন্তু আমাদের এখনও সেদিন হয় নাই এখন অর্থের উদ্দেশ্যে লিখিতে গেলে, লোকরঞ্জন- প্রবৃত্তি প্রবল হইয়া পড়ে এখন আমাদিগেড়র দেশের সাধারণ পাঠকের রুচি ও শিক্ষা বিবেচনা করিয়া লোক-রঞ্জন করিতে গেলে রচনা বিকৃত ও অনিষ্টকর হইয়া উঠে’’১৮
মানবজীবন সুখ ও দুঃখের নিগুঢ়ে বন্দী -এটা যেমন সত্যি তেমনি শিক্ষা ও শিক্ষিত পণ্ডিত ব্যক্তিই সমাজের দুঃসময়ের নিরাময়কারী এই বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বোধ হয় বঙ্কিমচন্দ্র নারদ বাক্যের মাধ্যমে বলেছেন:
কোন প্রকার বিপদ উপস্থিত হইলে পণ্ডিত ব্যক্তি অনায়াসে তাহার প্রতিবিধান করিতে সমর্থ হয়েনএকথা সত্য বটে, অতএব বিপদকালে পণ্ডিতের আশ্রয় লইবে সুখের দিনে মূর্খ; - দুঃখের দিনে পণ্ডিত ১৯

তথ্য নির্দেশ:
১.     বঙ্কিম রচনাসমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড (সাহিত্যসমগ্র), সালমা বুক ডিপো, ৩৮/২ বাংলা বাজার, ঢাকা-১১০০, জানুয়ারী ২০০৭, পৃ. ৯
২.     মোবাশ্বের আলী, বঙ্কিমচন্দ্রের জীবন ও সাহিত্যকৃতি, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ৬৭ প্যারিদাস রোড, ঢাকা-১১০০, ২০০৮, পৃ. ১২
৩.    প্রাগুক্ত, পৃ. ১২
৪.     বঙ্কিম রচনাসমগ্র, দ্বিতীয় খণ্ড (সাহিত্যসমগ্র), সালমা বুক ডিপো, ৩৮/২ বাংলা বাজার, ঢাকা-১১০০, জানুয়ারী ২০০৭, পৃ. ১০
৫.    প্রাগুক্ত, পৃ. ৫২২-৫২৩
৬.    প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৯
৭.     প্রাগুক্ত, পৃ. ১০০-১০১
৮.    প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৬
৯.    প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯১
১০.    প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৮
১১.    প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩১
১২.    প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১৩-৪১৪
১৩.   প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬৫
১৪.    প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৩-২৫৪
১৫.    প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩০
১৬.   প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৭৬
১৭.    প্রাগুক্ত, পৃ. ৯
১৮.   প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪৬
১৯.   প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৬

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন