রবিবার, ২৯ জুলাই, ২০১২

শোয়াইব জিবরান সম্পাদিত ‘শিক্ষাচিন্তা’ বাংলা শিক্ষাচিন্তা সংখ্যা, প্রবন্ধ-৪


রবীন্দ্রনাথের ভাষা ও শিক্ষাচিন্তা
ড. সফিউদ্দিন আহমদ

রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব কবি, রবীন্দ্রনাথ মহাকবি-কিন্তু স্মরণীয় যে, তিনি শুধু একজন বিশ্ব কবি বা একজন মহাকবিই নন, তিনি একজন শিক্ষক, একজন মহোত্তম শিক্ষক এবং তিনি গুরুদেব আরো বিষ্ময়, সমগ্র পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাতই একটি বিরল দৃষ্টান্ত যে, তিনি শুধু কাব্য সাহিত্যের মাধ্যমেই সমগ্র জাতির মর্মমূলে আধুনিক চিন্তা-চেতনা ও মনন জাগরণের আলোক সম্পাত করেন নি, তিনি নিজে একটি বিদ্যালয় এবং একটি বিশ্ববিদ্রালয়১ স্থাপন করে জাতির শিক্ষাদানের কার্যভারও নিজের হাতেই গ্রহণ করেছিলেন
শৈশব ও বাল্যজীবনের শিক্ষার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তিনি বর্ণনা করেছেন বহু লেখায় স্কুলে যাওয়াকে তিনি বলেছেন দীপান্তর বাস ও কারাবাস ২ নিজেকে তিনি বলেছেন স্কুল পালানো ছেলে অথচ আশ্চর্যের বিষয় নিজেই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় কবি রবীন্দ্রনাথ যেমন মানুষকে আনন্দ রসধারা পান করিয়েছেন, তেমনি শিক্ষাবিজ্ঞানী রবীন্দ্রনাথও শিক্ষার্থীর জন্য নিজস্ব শিক্ষারীতি প্রবর্তন করে শিক্ষার্থীকে আনন্দবিধানের চেষ্টা  করেছেন তিনি নিজস্ব শিক্ষা রীতিতে দেখিয়েছেন যে, স্কুল থেকে শিক্ষার্থী পালাবে না বরং ঘর ছেড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে তারা স্কুলে আসবে মানসিক মুক্তির জন্য - আনন্দের জন্য তিনি বলেছেন-
শিক্ষা হবে প্রতিদিনের জীবনযাত্রার নিকট অঙ্গ, চলবে তার সঙ্গে একতালে এক সুরে, সেটা ক্লাস নামধারী খাঁচার জিনিস হবে না৩ শিক্ষার্থীদের তিনি সোনার খাঁচায় মরাপাখি বানাতে চান নি তাই তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রকৃতির স্নেহছায়ায়, উন্মুক্ত আকাশতলে, খোলা মাঠে ঝর্ণার ধারে, পারুল আর বকুল গাছের তলায়, যেখানে ডালে ডালে ফুল, পাখির গান আর মুক্ত বাতাসের প্রশান্তি বিদ্যাকে তিনি পুঁথির গণ্ডি থেকে নিয়ে এলেন আনন্দের রস-ধারার উচ্ছ্বাসে তাই ঋতু বৈচিত্রের সাথে সাথে পাঠেরও পরিবর্তন করেছেন গতবাঁধা মুখস্থবিদ্যার যন্ত্রণা থেকে শিশুকে গানে, নাটকে, আবৃত্তিতে, উৎসবে আনন্দে তিনি শিক্ষার্থীকে মাতিয়ে তুলেছেন তিনি বলেছেন বিদ্যাচর্চার অপর নাম হচ্ছে জীবনচর্চা পুঁথিপড়া পণ্ডিত তিনি চান নি - চেয়েছেন মনেপ্রাণে বিকাশ মুক্ত নির্ভেজাল মানুষ শিক্ষার আনন্দলোকে আর মঙ্গল আলোকে অভিস্নাত
বিশ্ব মৈত্রী আর বিশ্ব শান্তিকে তিনি শিক্ষার চরম উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করেছেন প্রথম মহাযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তির বাণী নিয়ে পাশ্চাত্য ভ্রমণকালে শান্তিনিকেতনের জনৈক অধ্যাপক লিখেন-
পশ্চিম ভূ-ভাগ কামান বন্দুকের আয়োজন করুক- যেই শক্তিতে সেই সমস্ত আয়োজনকে তুচ্ছ করতে পারি আত্মার সেই পরম শক্তিকে প্রকাশ করবার জন্যে আমাদের সাধনা ভারতে একটা জায়গা থেকে ভুগোল বিভাগের মায়াগণ্ডী সম্পূর্ণরূপে মুছে যাক- সেইখানে সমস্ত পৃথিবীর পূর্ণ অধিষ্ঠান হোক- সেই জায়গা হোক আমাদের শান্তিনিকেতন আমাদের জন্যে একটি মাত্র দেশ আছে সে হচ্ছে বসুন্ধরা, একটি মাত্র নেশন আছে সে হচ্ছে মানুষ! আমাদের শান্তিনিকেতনের উদয়গিরির কাছে, সেখানে আমি অস্তগিরির লোকদের নিমন্ত্রণ করেছি তাদের বরণ করে নেবার জন্যে তোরা তোদের ঘরকে প্রশস্ত কর- হৃদয়কে উন্মুক্ত কর - শান্তিনিকেতনের আকাশ আজকের দিনের বিশ্বব্যাপী আঁধির আক্রমণে যেন নিরালোক হয়ে না ওঠে
১৯১৬ সালে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে লিখেন-
শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়কে বিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগের সূত্র করে তুলতে হবে ঐখানে সার্বজাতিক মনুষত্ব চর্চার কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে স্বজাতিক সংকীর্ণতার যুগ শেষ হয়ে গেছে ভবিষ্যতের জন্যে বিশ্বজাতিক মহামিলন যজ্ঞের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে তার প্রথম আয়োজন ঐ বোলপুরের প্রান্তরেই হবে ঐ জায়গাটিকে সমস্ত জাতিগত ভূগোল বৃত্তান্তের অতীত করে তুলবো এই আমার মনে আছে; সর্বমানবের প্রথম জয়ধ্বজা ঐখানে রোপণ হবে পৃথিবী থেকে স্বাদেশিক অভিমানের নাগপাশ বন্ধন ছিন্ন করাই আমার শেষ বযসের কাজ
বিদ্যা আর শিক্ষা এ দুটোকে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখেছেন তাঁর শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীতে বিদ্যাদানের কথা কমই বলেছেন অথচ সারাজীবনই তিনি বলেছেন শিক্ষার কথা বিদ্যা অর্জন করা সহজ কিন্তু শিক্ষিত হওয়া সহজ নয় বিদ্যা আহরণের বস্তু, শিক্ষা আচরণের এজন্যই বলা যায় ধর্মগ্রন্থ পাঠ করলেই ধর্ম সম্বন্ধে জানা যায় কিন্তু ধার্মিক হওয়া যায় না তেমনি বিদ্যা লাভ করলেই শিক্ষিত হওয়া যায় না  অধিত বিদ্যার সঙ্গে মানসিক উৎকর্ষ না ঘটলে বিদ্বান ব্যক্তিকেও মূলত অশিক্ষিত বলা যায় একজন শিক্ষিত ব্যক্তির যথার্থ পরিচয় তার কর্মে, আচরণে, চিন্তা চেতনা ও রুচিতে এবং মুখের বাক্যে
সারা জীবন, রবীন্দ্রনাথ দেশের শিক্ষা ও শিক্ষানীতি নিয়ে ভেবেছেন এবং চিন্তা করেছেন পৃথিবীর অনেক শিক্ষাবিদই দেশের শিক্ষা, শিক্ষানীতি ও শিক্ষা পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তা করেছেন কিন্তু হাতে কলমে কাজ না করে তারা শুধুমাত্র দূর থেকে শিক্ষানীতি ও শিক্ষা পরিকল্পনার কথা বলেছেন, নির্দেশ দিয়েছেন কিন্তু এদের মধ্যে একমাত্র ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথই শিক্ষা নিয়ে হাতে কলমে কাজ করেছেন
দেশকে জাতিকে গড়ে তোলাই সকল শিক্ষার মূলগত উদ্দেশ্য মনকে গড়ে তোলবার জন্যে খানিকটা পুঁথিগত বিদ্যার প্রয়োজন হবেই মনীষী ব্যক্তিদের মনীষা এবং মহৎ চিন্তার সঙ্গে পরিচয় মানসিক উৎকর্ষের জন্য অত্যাবশ্যক কিন্তু কেবলমাত্র পুঁথির জগতে আবদ্ধ থাকলে মনের শৌখিন বৃত্তি ঘোচে না, শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায় চারপাশের জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হলে তবে মনে সজীবতা আসবে, বলিষ্ঠতা আসবে যেখানে চাষী চাষ করছে, তাঁতি তাঁত বুনছে, কুলু ঘানি ঘোরাচ্ছে, কুমোর হাঁড়ি-কলসি গড়ছে, কামার কোদাল-কুড়ল তৈরি করছে-সেই জীবনের সঙ্গে পরিচয় চাই, তবে শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে দেশের মাটির সঙ্গে, সমাজের অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে পরিচয় না হলে শিক্ষার যে মূল উদ্দেশ্য দেশকে গড়ে তোলা, তা কিছুতেই সফল হতে পারে না রবীন্দ্রনাথের শিক্ষারীতি আলোচনা করবার সময় একটি কথা মনে রাখা আবশ্যক পৃথিবীর খুব কম শিক্ষাবিদই হাতে-কলমে শিক্ষাদানের কাজ করেছেন বেশির ভাগ শিক্ষাবিদই দূর থেকে কতকগুলি মূলনীতি নির্দেশ করেছেন সেগুলি খুবই মূল্যবান জিনিস, একথা বলাই বাহুল্য কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে শিক্ষার ইমারত গড়তে বসেছিলেন তার ভিত থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপ তিনি নিজ জাতে গড়ে তুলেছেন, প্রয়োজনবোধে গড়া জিনিস ভেঙ্গেছেন, আবার গড়েছেন, অদলবদল করেছেন  শিক্ষাপ্রণালীর অপূর্ণতা যখন যেমন চোখে পড়েছে তেমনিভাবে তার পরিবর্তন সাধন করেছেন এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলেই পরবর্তীকালে শ্রীনিকেতনের প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো যে মানুষকে জানবার জন্যে ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য দর্শন অধ্যয়নের আয়োজন সেই মানুষকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জানতে হবে, তার অভাব-অভিযোগের কথা ভাবতে হবে তার বাসের অযোগ্য গৃহকে বাসযোগ্য, তার ভাগ্যহীন জীবনকে উপভোগ্য করবার ভার শিক্ষিতেরা যদি গ্রহণ না করেন, তবে দেশের শ্রীহীন মলিন মূর্তি কখনো ঘুচবে না এই জন্য শান্তিনিকেতনের বিদ্যার্থীদের চোখের সন্মুখে তিনি শ্রীনিকেতনের অনুশীলন কেন্দ্রটি স্থাপন করেছিলেন এই দিক থেকে শ্রীনিকেতনকে বলা চলে শান্তিনিকেতনের ল্যাবরেটরি-গৃহ
এজন্যই স্যার মাইকেল স্যাডলার তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিশনের রিপোর্টে শান্তিনিকেতনের শিক্ষা পদ্ধতির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন মানুষকে মানুষ করে গড়ে তোলার জন্যই রবীন্দ্রনাথের শিক্ষানীতি ও শিক্ষা পদ্ধতি এজন্যই তিনি বলেছেন-
আমরা মানুষ বলতে যা বুঝি শিক্ষাও তদানুরূপ আদর্শে সম্পন্ন হইবে কারণ মানুষকে মানুষ করে তোলাই শিক্ষা
তিনি আরো বলেছেন-
শিক্ষা জিনিসটা তো জীবনের সঙ্গে সংগতিবিহীন একটা কৃত্রিম জিনিস নহে আমরা কি হইব এবং কি শিখিব - এই দুটো কথা একেবারে গায়ে গায়ে সংলগ্ন পাত্র যতো বড়ো জল তাহার চেয়ে বেশী ধরে না
আমাদের শিক্ষানীতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষা পদ্ধতি এবং শিক্ষা পরিকল্পনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন ভেবেছেন, চিন্তা করেছেন ও এর বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে গিয়েছেন তাঁর সাহিত্য ও শিল্পকর্মের একটা বিপুল অংশ জুড়ে আছে আমাদের শিক্ষানীতি ও শিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা
এ বিষয়ে তিনি বহু প্রবন্ধ লিখেছেন এমন কি প্রথম জীবনে অনেক কবিতাও লিখেছেন৯ মাত্র বাইশ বছর বয়সে তিনি মাতৃভাষার সপক্ষে লিখেছেন ন্যাশনাল ফণ্ড১০ নামে এক প্রতিবাদী ও সুচিন্তিত প্রবন্ধ এছাড়া তাঁর অন্যান্য প্রবন্ধগুলো হচ্ছে যথাক্রমে-
১. ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ  ২৯. বাংলা সাহিত্যের প্রতি অবহেলা
২. শিক্ষা সংস্কার ৩০. শিক্ষার হেরফের
৩. শিক্ষা সমস্যা ৩১. শিক্ষার হেরফের প্রবন্ধের অনুবৃত্তি
৪. জাতীয় বিদ্যালয়     ৩২. সাহিত্যের গৌরব
৫. আবরণ     ৩৩. বাংলা জাতীয় সাহিত্য
৬. তপোবন    ৩৪. ভাষা বিচ্ছেদ
৭. ধর্মশিক্ষা     ৩৫. অপর পক্ষের কথা
৮. শিক্ষা বিধি  ৩৬. ব্রতধারণ
৯. লক্ষ্য ও শিক্ষা ৩৭. অবস্থা ও ব্যবস্থা
১০. স্ত্রী শিক্ষা   ৩৮. ভাষার কথা
১১. শিক্ষার বাহন ৩৯. হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়
১২. ছাত্র শাসনতন্ত্র      ৪০. বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিকাশ
১৩. অসন্তোষের কারণ   ৪১. বাংলা ভাষা পরিচয়
১৪. বিদ্যার যাচাই      ৪২. ভারতী
১৫. বিদ্যা সমবায়      ৪৩. রাশিয়ার চিঠি
১৬. শিক্ষা মিলন ৪৪. বিশ্ব পরিচয়
১৭. বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ   ৪৫. কাব্যের অবস্থা পরিবর্তন
১৮. শিক্ষার বিকিরণ    ৪৬. প্রসঙ্গ কথা
১৯. শিক্ষা ও সংস্কৃতি    ৪৭. বিজ্ঞান সভা
২০. শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ    ৪৮. অসন্তোষের কারণ
২১. আশ্রমের শিক্ষা      ৪৯. জাভাযাত্রীর পত্র
২২. ছাত্র সম্ভাষণ ৫০. প্রাঞ্জলতা
২৩. জীবন স্মৃতি ৫১. বঙ্গভাষা ও সাহিত্য
২৪. সাহিত্য সম্মিলন     ৫২. ভাষার কথা
২৫. সভাপতির অভিভাষণ ৫৩. ইংরেজি সোপান
২৬. ছেলেবেলা   ৫৪. ইংরেজি সহজ শিক্ষা
২৭. ন্যাশনাল ফণ্ড ৫৫. তোতা কাহিনী
২৮. লাইব্রেরী   ৫৬. আকাক্সক্ষা
আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষা ব্যবস্থায় মাতৃভাষা বাংলাকে শিক্ষা মাধ্যম হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
আমি সম্পূর্ণ বাংলা ভাষার পথ দিয়েই শিখেছিলেম ভূগোল, ইতিহাস, গণিত, কিছু পরিমাণ প্রাকৃত বিজ্ঞান, আর সেই ব্যাকরণ যার অনুশাসনে বাংলা ভাষা সংস্কৃত ভাষার আভিজাত্যের অনুকরণে আপন সাধু ভাষার কৌলিন্য ঘোষণা করতো এই শিক্ষার আদর্শ ও পরিমাণ বিদ্যা হিসেবে তখনকার ম্যাট্রিকের চেয়ে কম দরের ছিল না আমার বার বৎসর বয়স পর্যন্ত ইংরেজি বর্জিত এই শিক্ষাই চলেছিল তারপরে, ইংরেজি বিদ্যালয়ে প্রবেশের অনতিকাল পরেই আমি ইস্কুল মাস্টারের শাসন হতে ঊর্দ্ধশ্বাসে পলাতক -এর ফলে শিশুকালেই বাংলা ভাষার ভাণ্ডারে আমার প্রবেশ ছিল অবারিত সে ভাণ্ডারের উপকরণ যতই সামান্য থাক, শিশু মনের পোষণ ও তোষণের পক্ষে যথেষ্ট ছিল উপবাসী মনকে দীর্ঘকাল কম হারিয়ে চলতে হয়নি শেখার সঙ্গে বুঝার প্রত্যহ সাংঘাতিক ঠোকাঠুকি না হওয়াতে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে মানুষ হতে হয় নি ভালোই বলো আর মন্দই বলো, প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে এমন ভিন্ন ভিন্ন রকম করিয়া গড়িয়াছেন যে এক জাতকে ভিন্ন জাতের কাঠামোর মধ্যে পুরিতে গেলে সমস্ত খাপছাড়া হইয়া যায়১১

দুই
শৈশবকাল থেকেই রবীন্দ্রনাথের মনে একটি স্বাদেশিক চেতনা দানা বেঁধে উঠেছিলো আর এ স্বাদেশিক চেতনার মূলে ছিলো মাতৃভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বাংলা ভাষার মাধ্যমে সকল জ্ঞান বিজ্ঞান প্রচারের কথাও তিনিই প্রথম উল্লেখ করেন তাঁর এ অভিপ্রায়ের মূলে ছিলো তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এজন্যই তিনি বলেন যে,-
বাংলা ভাষার দোহাই দিয়ে যে শিক্ষার আলোচনা বার বার দেশের সামনে এনেছি তার মূলে আছে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ১২
ঠাকুর বাড়িতে তখন স্বাদেশিক হাওয়া ও মাতৃভাষা চর্চার ঝড়ো উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছিলো কবির ভাষায়-
আমাদের বাড়িতে দাদারা চিরকাল মাতৃভাষা চর্চা করিয়া আসিয়াছেন আমার পিতাকে তাঁহার কোনো নতুন আত্মীয় ইংরেজিতে পত্র লিখিয়াছিলেন, সে পত্র লেখকের নিকট তখনই ফিরিয়া আসিয়াছিল১৩
কবির আরো দুএকটি উক্তি এখানে তুলে ধরছি-
ক. বাঙালি হইয়া বাঙালিকে, পিতা ভ্রাতা-আত্মীয় স্বজনকে ইংরেজিতে পত্র লেখার যে কতো বড়ো লাঞ্ছনা তাহা আমরা অনুভব মাত্র করি না১৪
খ. বাস্তবিক মাতৃভাষার প্রতি যদি সম্মানবোধ জন্মে থাকে তবে স্বদেশী আত্মীয়কে ইংরেজি লেখার মতো কুর্কীর্তি কেউ করতে পারে না১৫
গ. ছেলে বেলায় বাংরা পড়িতেছিলাম বলিয়াই সমস্ত মনটার চালনা সম্ভব হইয়াছিল১৬
ঘ. যখন চারিদিকে খুব কষিয়া ইংরেজি পড়াইবার ধুম পড়িয়া গিয়াছে, তখন যিনি সাহস করিয়া আমাদিগকে দীর্ঘকাল শিখাইবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, সেই আমার স্বর্গত সেজ দাদার উদ্দেশ্যে সকৃতজ্ঞ প্রণাম নিবেদন করিতেছি১৭
মাতৃভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধ নিবেদন করে বালক রবীন্দ্রনাথ সেদিন আবেগ ভরে লিখলেন-
উঠ বঙ্গকবি, মায়ের ভাষায়
মুমূর্ষুরে দাও প্রাণ-
জগতের লোক সুধার আশায়,
সে ভাষা করিবে পান
..........................
বিশ্বের মাঝারে ঠাঁই নাই বলে
কাঁদিতেছে বঙ্গভূমি
গান গেয়ে কবি জগতের তলে
স্থান কিনে দাও তুমি
একবার কবি মায়ের ভাষায়
গাও জগতের গান-
সকল জগৎ ভাই হয়ে যায়
ঘুচে যায় অপমান১৮

মাতৃভাষার মাধ্যমে বিশ্বাত্মবোধ সৃষ্টি করার জন্য কবির আহবান-
আপনার ভাষায় একবার সকলে মিলিয়া গান কর বহু বৎসর নীরব থাকিয়া বঙ্গদেশের প্রাণ কাঁদিয়া উঠিয়াছে তাহাকে আপনার ভাষায় একবার কথা বলিতে দাও মাতৃভাষায় জগতের বিচিত্র সঙ্গীতে যোগ দাও বাঙালির সহিত মিলিয়া বিশ্বসঙ্গীত মধুরতর হইয়া উঠিবে১৯
সাহিত্য চর্চাই শুধু নয় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় মাতৃভাষার অসীম গুরুত্বের কথা চিন্তা করে রবীন্দ্রনাথ সেদিন লিখেছিলেন-
বাংলা ভাষা অবলম্বন করিয়া ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ে দেশে জ্ঞান বিস্তারের চেষ্টা তাহাদিগকে করিতে হইবে২০
কবি আরো বললেন-
আমরা বিদেশী ভাষায় পরের দরবারে এতকাল যে ভিক্ষা কুড়াইলাম, তাহাতে লাভের অপেক্ষা লাঞ্ছনার বোঝাই জমিল আর দেশী ভাষায় স্বদেশী হৃদয় দরবারে যেমনি হাত পাতিলাম অমনি মুহূর্তের মধ্যেই মাতা যে আমাদের মুঠা ভরিয়া দিলেন২১
আমাদের দেশে মাতৃভাষায় একদা যখন শিক্ষার আসন প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রস্তাব ওঠে তখন অধিকাংশ ইংরেজি জানা বিদ্বান আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন সমস্ত দেশের সামান্য যে কয়েকজন লোক ইংরেজি ভাষাটিকে কোনোমতে ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে তাদের ভাগে উক্ত ভাষার অধিকারে পাছে লেশমাত্র কমতি ঘটে এই ছিল তাদের ভয় হায়রে দারিদ্রের আকাক্সক্ষা ও দারিদ্র২২
আমাদের দেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রথমযুগে যাঁরা বিদ্বান বলে গণ্য ছিলেন তাঁরা যদিচ পড়াশুনায় চিঠিপত্রে কথাবার্তায় একান্তভাবেই ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়েছিলেন, যদিচ তখনকার ইংরেজি শিক্ষিত চিত্তে চিন্তার ঐশ্বর্য ভাবরসের আয়োজন মুখ্যত ইংরেজি প্রেরণা থেকেই উদ্ভাবিত, তবু সেদিনকার বাঙালি লেখকেরা এই কথাটি অচিরে অনুভব করেছিলেন যে দূর দেশি ভাষা থেকে আমরা বাতির আলো সংগ্রহ করতে পারি মাত্র কিন্তু আত্মপ্রকাশের জন্য প্রভাব আলো বিকীর্ণ হয় আপন ভাষায়২৩
মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষালাভ না হলে যে শিক্ষায় পরিপূর্ণতা আসে না রবীন্দ্রনাথ তাও বলেছেন :
শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ, জগতে এই সর্বজন স্বীকৃত নিরতিশয় সহজকথা বহুকাল পূর্বে একদিন বলেছিলেন; আজও তার পুনরাবৃত্তি করব সেদিন যা ইংরেজি শিক্ষার মন্ত্রমুগ্ধ কর্ণকুহরে অশ্রাব্য হয়েছিল আজও যদি তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় তবে আশাকরি পুনরাবৃত্তি করবার মানুষ বারে বারে পাওয়া যাবে২৪
ইংরেজি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষা, ইংরেজদের শিক্ষা ব্যবস্থাও উত্তম কিন্তু বাঙালির জন্য বাংলার মাধ্যমে শিক্ষাই অতীব উত্তম অন্যথায় দেশের সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থাই একটা কিম্ভুতকিমারে পরিণত হবে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য
দেশের এই মনকে মানুষ করা কোনোমতেই পরের বাষায় সম্ভবপর নহে আমরা লাভ করিব, কিন্তু সে লাভ আমাদের ভাষাকে পূর্ণ করিবে না; আমরা চিন্তা করিব, কিন্তু সে চিন্তার বাহিরে আমাদের ভাষা পড়িয়া থাকিবে; আমাদের মন বাড়িয়া চলিবে, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভাষা বাড়িতে থাকিবে না-সমস্ত শিক্ষাকে অকৃতার্থ করিবার এমন উপায় আর কী হইতে পারে২৫
ঔপনিবেশিক সরকারের স্বার্থ আদায়ের যন্ত্র তৈরির জন্যই সেদিন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি হয়েছিলো এ বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের উক্তি-
ঐ বিদ্যালয়টি পরক্ষিা পাশ করা ডিগ্রীধারীদের নামের উপর মার্কা মারিবার একটা বড়ো গোছের শিলমোহর মানুষকে তৈরি নয়, মানুষকে চিহ্নিত করা তার কাজ মানুষকে হাটের মাল করিবার তার বাজার দর দাগিয়া দিয়া ব্যবসাদারির সহায়তা সে করিতেছে২৬
মাতৃভাষার মাধ্যমে অধিত বিষয়কে আত্মস্থ করতে পারেনি বলে আমাদের ছাত্রদের শিক্ষা গ্রহণে করুণ ও অসহায় অবস্থা দেখে, রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার হেরফেরপ্রবন্ধে বলেন-
... আমরা বাল্য হইতে কৈশোর এবং কৈশোর হইতে যৌবনে প্রবেশ করি কেবল কতকগুলো কথার বোঝা টানিয়া সরস্বতীর সাম্রাজ্যে কেবল মজুরী করিয়া মরি; পৃষ্ঠের মেরুদণ্ড বাঁকিয়া যায় এবং মনুষ্যত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ হয় না ... আমাদের সমস্ত জীবনের শিকড় যেখানে, সেখান হইতে শত হস্ত দূরে আমাদের শিক্ষার বৃষ্টিধারা বর্ষিত হইতেছে; বাধা ভেদ করিয়া যেটুকু রস নিকটে আসিয়া পৌঁছিতেছে সেটুকু আমাদের জীবনের শুষ্কতা দূর করিবার পক্ষে যথেষ্ট নহে ... এজন্য আমাদের ছাত্রদিগকে দোষ দেওয়া অন্যায় তাহাদের গ্রন্থ জগৎ এক প্রান্তে, মাঝখানে কেবল ব্যাকরণ-অভিধানের সেতু ... এইরূপে জীবনের এক তৃতীয়াংশ কাল যে শিক্ষায় যাপন করিলাম তাহা যদি চিরদিন আমাদের জীবনের সহিত অসংলগ্ন হইয়া রহিল এবং অন্য শিক্ষালাভের অবসর হইতেও বঞ্চিত হইলাম, তবে আর আমরা কিসের জোরে একটা যতার্থ লাভ করিতে পারিব
আমাদের এই শিক্ষার সহিত জীবনের সামঞ্জস্য সাধনই এখনকার দিনের সর্বপ্রধান মনোযোগের বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে, কিন্তু এ মিলন কে সাধন করিতে পারে বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য২৭
আমাদের শিক্ষানীতি, শিক্ষা পরিকল্পনা, শিক্ষা সমস্যা ও শিক্ষার মাধ্যম নিয়ে সেদিন রবীন্দ্রনাথের ‘‘শিক্ষার হেরফের’’ প্রবন্ধ প্রকাশিত হবার পর চারদিকে খুবই আলোড়ন সৃষ্টি করে এ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের অভিমত সমর্থন করে আনন্দমোহন বসু, বঙ্কিমচন্দ্র ও স্যার গুরুদাস বন্দোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি লিখেন যে, এ সমস্ত কথা তাঁদেরই মনের কথা তাঁদের পত্র পেয়ে রবীন্দ্রনাথ আবার সাধনা পত্রিকায় (চৈত্র-১২৯৯) লিখেন-
স্বদেশী ভাষার সাহায্য ব্যতীত কখনোই স্বদেশের স্থায়ী কল্যাণ সাধিত হইতে পারে না, একথা কে না বুঝে? ... দেশের অধিকাংশ লোকের শিক্ষার উপর যদি দেশের উন্নতি নির্ভর করে এবং সেই শিক্ষার গভীরতা ও সায়িত্বের উপর যদি উন্নতির স্থায়িত্ব নির্ভর করে, তবে মাতৃভাষা ছাড়া যে আর কোন গতি নাই, একথা কেহ না বুঝলে হাল ছাড়িয়া দিতে হয়২৮
রবীন্দ্রনাথ আরো বলেছেন-
আমরা বিদেশী ভাষায় পরের দরবারে এতকাল যে ভিক্ষা কুড়াইলাম তাহাকে লাভের অপেক্ষা লাঞ্ছনার বোঝাই জমিল আর দেশী ভাষায় স্বদেশী হৃদয় দরবারে যেমনি হাত পাতিলাম এমনি মুহূর্তের মধ্যেই মাতা যে আমাদের মুঠা ভরিয়া দিলেন
রবীন্দ্রনাথের এ সমস্ত অভিমতকে সমর্থন করে আই সি এস লোকেন্দ্রনাথ পালিতও চিঠি লিখেন আলোচ্য প্রবন্ধের কিছুদিন পরই রবীন্দ্রনাথ আবার লিখলেন-
মনে আছে আমরা বাল্যকালে কেবলমাত্র বাংলা ভাষায় শিক্ষা আরম্ভ করিয়াছিলাম বিদেশী ভাষায় পীড়নমাত্র ছিল না আমরা পণ্ডিত মহাশয়ের নিকট পাঠ সমাপন করিয়া কৃত্তিবাসের রামায়ণ ও কাশীরাম দাসের মহাভারত পড়িতে বসিতাম রামচন্দ্র ও পাণ্ডবদিগের বিপদে অশ্রপাত ও সৌভাগ্যে কি নিরতিশয় আনন্দ লাভ করিয়াছি, তাহা আজিও ভুলি নাই কিন্তু আজকাল আমরা জ্ঞানে আমি একটি ছেলেকেও ঐ দুই গ্রন্থ পড়িতে দেখি নাই অতি বাল্যকালেই ইংরেজির সহিত মিশাইয়া বাংলা তাহাদের তেমন সুচারুভাবে অভ্যস্ত হয় না এবং ইংরেজিতেও শিশুবোধ্য বহি পড়া তাহাদের পক্ষে অসাধ্য অতএব দায়ে পড়িয়া তাহাদের পড়াশুনা কেবলমাত্র কঠিন শুষ্ক অত্যাবশ্যক পাঠ্যপুস্তকেই নিবদ্ধ থাকে এবং তাহাদের চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তি বহুকাল পর্যন্ত খাদ্যাভাব অপুষ্ঠ অপরিণত থাকিয়া যায়২৯
অধিত বিদ্যাকে মাতৃভাষার মাধ্যমে আয়ত্ত্ব করতে না পারলে যে চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তি এবং সৃজনশীলতা অপরিণত থেকে যায় - এসব কথা তিনি পরবর্তীকালে বলেছেন জীবনস্মৃতিগ্রন্থে এবং শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণপ্রবন্ধে মাতৃভাষা সম্বন্ধে এখানে তাঁর বক্তব্য-
কোন শিক্ষাকে স্থায়ী করিতে হইলে, গভীর করিতে হইলে, ব্যাপক করিতে হইলে তাহাকে চিরপরিচিত মাতৃভাষায় বিগলিত করিয়া দিতে হয় যে ভাষা দেশের সর্বত্র সমীরিত, যাহাতে সমস্ত জাতির মানসিক নিশ্বাস প্রশ্বাস নিষ্পন্ন হইতেছে, শিক্ষাকে সেই ভাষার মধ্যে মিশ্রিত করিলে তবে সমস্ত জাতির জীবন ক্রিয়ার সহিত তাহার যোগসাধন করিতে সেই অন্য পালি ভাষায় ধর্মপ্রচার করিয়াছেন চৈতন্য বঙ্গভাষায় তাঁর প্রেমাবেগ সর্বসাধারণের অন্তরে সঞ্চারিত করিয়া দিয়াছিলেন ... আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের জাতীয় জীবনের অন্তরে মূল প্রতিষ্ঠা করিতে পারে নাই৩০
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে রবীন্দ্রনাথ চেয়েছেন দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং মাটি ও মানুষের একাত্মতায় সম্পৃক্ত করে, শিকড় সম্ভূত করে মাতৃভাষার মাধ্যমে তাআত্মস্থ করে নিতে ন্যাশনাল ফণ্ডনামে তিনি মাতৃভাষার সপক্ষে প্রথম এক প্রতিবাদী ও সুচিন্তিত প্রবন্ধ লিখেন-
কেবল ইংরাজি লিখিলে কিংবা ইংরাজিতে বক্তৃতা দিলে হয় না! ইংরাজিতে যাহা শিখিয়াছ তাহা বাঙ্গলায় প্রকাশ কর বাঙ্গালি সাহিত্য উন্নতি লাভ করুক ও অবশেষে বঙ্গবিদ্যালয়ে দেশ ছাইয়া সেই সমুদয় শিক্ষা বাঙ্গালায় ব্যাপ্ত হইয়া পড় ইংরাজিতে শিক্ষা কখনই দেশের সর্বত্র ছড়াইতে পারিবে না৩১
আত্মশক্তিগ্রন্থের ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণপ্রবন্ধে তিনি আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি ও মাতৃভাষায় শিক্ষা সম্বন্ধে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন এ প্রবন্ধে তাঁর বক্তব্য-
আমাদের বাল্যকাল এবং দেশের সাহিত্য, সাহিত্য-সমাজ ও দেশের শিক্ষিত সমাজের মাঝখানকার ব্যবধান রেখা অনেকটা স্পষ্ট ছিল তখনো ইংরেজি রচনা ও ইংরেজি বক্তৃতায় খ্যাতিলাভ করিবার আকাক্সক্ষা ছাত্রদের মনে সকলের চেয়ে প্রবল ছিল এমনকি যাঁহারা বাংলা সাহিত্যের প্রতি কৃপা দৃষ্টি করিতেন তাহারা ইংরেজি মাচার উপর চড়িয়া তবে সেটুকু প্রশ্রয় বিতরণ করিতে পারিতেন সেইজন্য তখনকার দিনে মধুসূদনকে মধুসূদন, হেমচন্দ্রকে হেমচন্দ্র, বঙ্কিমকে বঙ্কিম জানিয়া আমাদের তৃপ্তি ছিল না - তখন কেহ বাংলার মিল্টন, কেহবা বাংলার বায়রণ, কেহবা বাংলার স্কট বলিয়া পরিচিত ছিলেন-এমনকি, বাংলার অভিনেতাকে সম্মানিত করিতে হইলে তাহাকে বাংলার গ্যারিক বলিলে আমাদের আশা মিটিত৩২
দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং ভাষা ও পারিপার্শ্বিক আবহে সম্পৃক্ত করে ছাত্রদের স্বাধীন শিক্ষায় রবীন্দ্রনাথ সব সময়ই অভিমত প্রদান করতেন কী করিলে বিদেশী চালিত কলেজের শিক্ষার সঙ্গে ছাত্রদিগকে একটা স্বাধীন শিক্ষায় নিযুক্ত করিয়া শিক্ষাকার্যকে যথাযথভাবে সম্পূর্ণ করা যাইতে পারে তাহানা করিলে শিক্ষাকে কোনোমতে পুথির গণ্ডির বাহিরে আনা দুঃসাধ্য হইবে
আমরা শিশুকাল হইতে ইংরেজি বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক, যাহা ইংরেজ ছেলেদের জন্য রচিত, তাহাই পড়িয়া আসিতেছি, ইহাতে নিজের দেশ আমাদের কাছে অস্পষ্ট এবং পরের দেশ, পরের জিনিস আমাদের কাছে অধিকতর পরিচিত হইয়া আসিতেছে৩৩
মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞা, অনাদর ও তাচ্ছিল্যের মানসিকতা রবীন্দ্রনাথের মনে যে বেদনা সৃষ্টি হয়েছে এরই উত্তাপ আমরা পাই বাংলা সাহিত্যের প্রত অবজ্ঞাপ্রবন্ধে-
যাঁহারা অনেক ইংরাজি কেতাব পড়িয়াছেন তাঁহারা অনেকেই আধুনিক বাংলা লেখা ও লেখকদের প্রতি কৃপাকটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া থাকেন এইরূপ অবজ্ঞা প্রকাশ করিয়া তাঁহারা অনেকটা আত্মপ্রসাদ লাভ করেন বোধ করি ইতর সাধারণ হইতে আপনাকে স্বতন্ত্র করিয়া লইয়া অভিমানে তাঁহারা আপাদমস্তক কণ্টকিত হইয়া উঠেন একটা কথা ভুলিয়া যান যে, পৃথিবীতে বড়ো হওয়া শক্ত, কিন্তু আপনাকে বড়ো মনে করা সকলের চেয়ে সহজ সমযোগ্য লোককে দূরে পরিহার করিয়া অনেকে স্বকপোলকল্পিত মহত্ত্ব লাভ করে, কিন্তু প্রার্থনা করি এরূপ অজ্ঞানকৃত প্রহসন-অভিনয় হইতে আমাদের অন্তর্যামি আমাদিগকে সতত বিরত করুন
বহুকাল হইতে বহুতর সামাজিক প্লাবনের সাহায্যে স্তর পড়িয়া ইংরাজি সাহিত্য উচ্চতা কঠিনতা এবং একটা নির্দিষ্ট আকারপ্রাপ্ত হইয়াছে আমাদের বাংলা সাহিত্যে স¤প্রতি পলি পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে ইহার কোথাও জলা, কোথাও বালি, কোথাও মাটি সুতরাং ইহার বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে যে যাহা ইচ্ছা বলিতে পারে, কাহারও প্রতিবাদ করিবার সাধ্য নাই ইহার ইতিহাস নাই, আবহমানকাল প্রচলিত প্রবাহ নাই, বহুকাল সঞ্চিত রতœভাণ্ডার নাই, ইহার বিক্ষিপ্ত অংশগুলিকে এখনো এক সমালোচনার নিয়মে বাঁধিবার সময় হয় নাই সুতরাং ইংরাজি সমালোচনা গ্রন্থ হইতে মুখগহ্বর পূর্ণ করিয়া লইয়া যখন কোন প্রবল প্রতিপক্ষ ইহার প্রতি মুহূর্মুহূ ফুৎকার প্রযোগ করিতে থাকেন তখন বঙ্গসাহিত্যের ক্ষীণ আশার আলোকটুকু একান্ত কম্পিত ও নির্বাপিত প্রায় হইয়া আসে কিন্তু তথাপি বলা যাইতে পারে ফুৎকার যতই প্রবল হউক শীর্ণ দীপশিখা তাহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ
যাঁহারা শুধুমাত্র পরের চিন্তালব্ধ ধন সঞ্চয় করিয়া জীবনযাপন করেন তাঁহারা জানেন না নিজে কোনো বিষয় আনুপূর্বিক চিন্তা করা এবং সেই চিন্তা ভাষায় ব্যক্ত করা কি কঠিন অনেক বড়ো বড়ো কথা পরের মুখ হইতে পরিপক্ক ফলের মতো অতি সহজে পাড়িয়া লাওয়া যায়, কিন্তু অতি ছোটো কথাটিও নিজে ভাবিয়া গড়িয়া তোলা বিষম ব্যাপার যে ব্যক্তি কেবলমাত্র পাঠ করিতে শিখিয়াছে, সঞ্চয় করা ছাড়া বিদ্যাকে আর কোনো প্রকার ব্যবহারে লাগায় নাই, সে নিজে ঠিক জানে না সে কতটা জানে এবং কতটা জানে না
যে শ্রেণীর সমালোচকের কথা বলিতেছি তাঁহারা যখন বাংলা পড়েন তখন মনে মনে বাংলাকে ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়া লন, সুতরাং সমালোচ্য গ্রন্থের প্রতি তাঁহাদের শ্রদ্ধা থাকিতে পারে না বাংলা ভাষার প্রাণের মধ্যে তাঁহারা প্রবেশ করেন নাই, প্রবেশ করিবার অবসর পান নাই মাতৃভূমি হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইলে সকল সাহিত্যই ম্লান নির্জীব ভাব ধারণ করে, তখন তাহার প্রতি সমালোচনার প্রয়োগ করা কেবল মড়ার উপর খাঁড়ার ঘাদেওয়া মাত্র
যাঁহারা বাংলা লেখেন তাঁহারাই বাংলা ভাষার বাস্তবিক চর্চা করেন; অগত্যাই তাঁহাদিগকে বাংলা চর্চা করিতে হয় বাংলা ভাষার প্রতি তাঁহাদের অনুরাগ শ্রদ্ধা অবশ্যই আছে রাজভাষা নহে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা নহে, সম্মানলাভের ভাষা নহে, অর্থোপার্জনের ভাষা নহে, কেবলমাত্র মাতৃভাষা যাঁহাদের হৃদয়ে ইহার প্রতি একান্ত অনুরাগ ও অটল ভরসা আছে তাঁহাদেরই ভাষা যাঁহারা উপেক্ষাভরে দূরে থাকেন তাঁহারা বাংলা ভাষার প্রকৃত পরিচয় লাভ করিতে কোনো সুযোগই পান নাই তাঁহারা তজৃমা করিয়া বাংলার বিচার করেন অতএব সভয়ে নিবেদন করিতেছি, এরূপ স্থলে তাঁহাদের মতের অধিক মূল্য নাই ৩৪
রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষার ভিতের উপর গড়ে উঠেছিলো বলেই তিনি বাংলা ভাষার প্রাণ স্পন্দনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে তা গভীরভাবে আয়ত্ব করতে পেরেছিলেন জীবন স্মৃতিতে তিনি স্বীকার করেছেন যে, এজন্যই এই ভাষা তাঁর কাছে প্রাণময় ও আনন্দময় হয়েছিলো
জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন: ‘‘বাহির হইতে দেখিলে আমাদের পরিবারে অনেক বিদেশী প্রথার চলন ছিল, কিন্তু আমাদের পরিবারের হৃদয়ের মধ্যে একটা স্বদেশাভিমান স্থির দীপ্তিতে জাগিতেছিল স্বদেশের প্রতি পিতৃদেবের যে একটি আন্তরিক শ্রদ্ধা তাঁহার জীবনের সকল প্রকার বিপ্লবের মধ্যে অক্ষুণœ ছিল, তাহাই আমাদের পরিবারস্থ সকলের মধ্যে একটি প্রবল স্বদেশপ্রেম সঞ্চার করিয়া রাখিয়াছিল বস্তুত, সে সময়টা স্বদেশপ্রেমের সময় নয় তখন শিক্ষিক লোকে দেশের ভাষা এবং দেশের ভাব উভয়কেই দূরে ঠেকাইয়া রাখিয়াছিলেন আমাদের বাড়িতে দাদারা চিরকাল মাতৃভাষার চর্চা করিয়া আসিয়াছেন আমার পিতাকে তাঁহার কোনো নূতন আত্মীয় ইংরাজিতে পত্র লিখিয়াছিলেন, সে পত্র লেখকের নিকটে তখনই ফিরিয়া আসিয়াছিল
... ছেলেবেলায় বাংলা পড়িতেছিলাম বলিয়াই সমস্ত মনটার চালনা সম্ভব হইয়াছিল শিক্ষা জিনিসটা যথাসম্ভব আহার-ব্যাপারের মতো হওয়া উচিত খাদ্যদ্রব্যে প্রথম কামড়টা দিবামাত্রেই তাহার স্বাদের সুখ আরম্ভ হয়, পেট ভরিবার পূর্ব হইতেই পেটটি খুশি হইয়া জাগিয়া উঠে-তাহাতে তাহার জারক রসগুলির আলস্য দূর হইয়া যায় বাঙালির পক্ষে ইংরেজি শিক্ষায় এটি হইবার যো নাই তাহার প্রথম কামড়েই দুইপাটি দাঁত আগাগোড়া নড়িয়া উঠে-মুখবিবরের মধ্যে একটা ছোটোখাটো ভূমিকম্পের অবতারণা হয় তারপরে, সেটা যে লোষ্ট্রজাতীয় পদার্থ নহে, সেটা যে রসে পাক করা মোদকবস্তু, তাহা বুঝিতে বুঝিতেই বয়স অর্ধেক পার হইয়া যায় বানানে ব্যাকরণে বিষম লাগিয়া নাক চোখ দিয়া যখন অজস্র জলধারা বহিয়া যাইতেছে, অন্তরটা তখন একেবারেই উপবাসী হইয়া আছে অবশেষে বহু কষ্টে অনেক দেরীতে খাবারের সঙ্গে যখন পরিচয় ঘটে তখন ক্ষুধাটাই যায় মরিয়া প্রথম হইতেই মনটাকে চালনা করিবার সুযোগ না পাইলে মনের চলৎশক্তিতেই মন্দা পড়িয়া যায় যখন চারিদিকে খুব কষিয়া ইংরেজি পড়াইবার ধুম পড়িয়া গিয়াছে, তখন যিনি সাহস করিয়া আমাদিগকে দীর্ঘকাল বাংলা শিখাইবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, সেই আমার স্বর্গত  সেজদাদার উদ্দেশ্যে সকৃতজ্ঞ প্রণাম নিবেদন করিতেছি৩৫
এ প্রত্যয়বোধ থেকেই শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণপ্রবন্ধে তিনি বলেছেন-
বাংলা ভাষার দোহাই দিয়ে যে শিক্ষার সমালোচনা বার বার দেশের সামনে এনেছিল তার মূলে আছে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা৩৬
ভাষার ভিত ভালো করে গড়ে তুলতে না পারলে যে, ভাষা আয়ত্ব করা যায় না, ভাষার উপর দখল আসে না একথা তিনি বার বার বলেছেন এ প্রসঙ্গে কবি তাঁর সেজদা হেমেন্দ্রদাস ঠাকুরের উপদেশও স্মরণ করেছেন-
সেজদাদা বলতেন, আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তার পরে ইংরেজি শেখার পত্তন তাই যখন আমাদের বয়সী ইস্কুলের সব পোড়োয়া গড়গড় করে আউড়ে চলছে ও ধস ঁঢ় আমি হই উপরে, ঐব রং ফড়হি তিনি হন নিচে, তখনও বিএডি ব্যাড, এম এ ডি ম্যাড পর্যন্ত আমার বিদ্যে পৌঁছায় নি৩৭
মাতৃভাষার গাঁথুনি তাঁর শক্ত ছিলো বলেই তিনি সহজে এই ভাষাকে আয়ত্ত্ব করেছিলেন এবং মাতৃভাষার মাধুর্য ও এর অন্তরের সুর আর ভাব ব্যঞ্জনাকে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন
‘‘যখন বালক ছিলেম, আশ্চর্য এই যে, তখন অবিমিশ্র বাংলা ভাষায় শিক্ষা দেবার একটা সরকারি ব্যবস্থা ছিল তখনো যে সব স্কুলের রাস্তা ছিল কলকাতা ইউনিভার্সিটির প্রবেশদ্বারের দিকে স্তম্ভিত, যারা ছাত্রদের আবৃত্তি করাচ্ছিল ঐব রং ঁঢ় তিনি হন উপরেযারা ইংরেজি সর্বনাম শব্দের ব্যাখ্যা মুখস্ত করাচ্ছিল , নু সুংবষভ ওতাদের আহবানে সাড়া দিচ্ছিল সেইসব পরিবারের ছাত্র যারা ভদ্রসমাজে উচ্চ পদবীর অভিমান করতে পারত এদেরই দূর পার্শ্বে সঙ্কুচিতভাবে ছিল প্রথমোক্ত শিক্ষাবিভাগ ছাত্রবৃত্তির পোড়াদের জন্য তারা কনিষ্ঠ অধিকারী, তাদের শেষ সদগতি ছিল নর্মাল স্কুলনামধারী মাথা-হেঁট-করা বিদ্যালয়ে তাদের জীবিকার শেষ লক্ষ্য ছিল বাংলা বিদ্যালয়ে স্বল্পসন্তুষ্ট বাংলা পণ্ডিতি ব্যবসায়ে আমার অভিভাবক সেই নর্মাল স্কুলের দেউড়ি বিভাগে আমাকে ভর্তি করেছিলেন আমি সম্পূর্ণ বাংলা ভাষার পথ দিয়েই শিখেছিলেম ভূগোল, ইতিহাস, গণিত কিছু পরিমাণ প্রাকৃত বিজ্ঞান, আর সেই ব্যাকরণ যার অনুশাসনে বাংলা ভাষা সংস্কৃত ভাষার আভিজাত্যের অনুকরণে আপন সাধুভাষার কৌলীন্য ঘোষণা করত  এই শিক্ষার আদর্শ ও পরিমাণ বিদ্যা হিসাবে তখনকার ম্যাট্রিকের চেয়ে কম দরের ছিল না আমার বারো বৎসর পর্যন্ত ইংরেজি-বর্জিত এই শিক্ষাই চলেছিল তারপরে ইংরেজি বিদ্যালয়ে প্রবেশের অনতিকাল পরেই আমি ইস্কুল মাস্টারের শাসন হতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলাতক
এর ফলে শিশুকালেই বাংলা ভাষার ভাণ্ডারে আমার প্রবেশ ছিল অবারিত সে ভাণ্ডারে উপকরণ যতই সামান্য থাক, বিদেশী ভাষার চড়াই পথে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দম হারিয়ে চলতে হয়নি, শেখার সঙ্গে বোঝার প্রত্যহ সাংঘাতিক মাথা ঠোকাঠুকি না হওয়াতে আমাকে বিদ্যালয়ের হাসপাতালে মানুষ হতে হয় নি
ভাগ্য বলে অখ্যাত নর্মাল স্কুলে ভর্তি হয়েছিলুম, তাই কচি বয়সে রচনা করা ও কুস্তি করাকে এক করে তুলতে হয়নি; চলা এবং রাস্তা খোঁড়া ছিল না একসঙ্গে নিজের ভাষায় চিন্তাকে ফুটিয়ে তোলা, সাজিয়ে তোলার আনন্দ গোড়া থেকেই পেয়েছিল তাই বুঝেছি মাতৃভাষার রচনায় অভ্যাস সহজ হয়ে গেলে তার পরে যথাসময়ে অন্য ভাষা আয়ত্ত করে সেটাকে সাহসপূর্বক ব্যবহার করতে কলমে বাধে না; ইংরেজির অতিপ্রচলিত জীর্ণ বাক্যাবলী সমাধানে সেলাই করে করে কাঁথা বুনতে হয় না ইস্কুল-পালানো অবকাশে যেটুকু ইংরেজি আমি পথে-পথে সংগ্রহ করেছি সেটুকু নিজের খুশিতে ব্যবহার করে থাকি, তার প্রধান কারণ, শিশুকাল থেকে বাংলা ভাষায় রচনা করতে আমি অভ্যস্ত অন্তত, আমার এগারো বছর বয়স পর্যন্ত আমার কাছে বাংলা ভাষার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না রাজসম্মানগর্বিত কোনো সুয়োরানী তাকে গোয়ালঘরের কোণে মুখ চাপা দিয়ে রাখেনি আমার ইংরেজি শিক্ষায় সেই আদিম দৈন্য সত্ত্বেও পরিমিত উপকরণ দিয়ে আমার চিত্তবৃত্তি কেবল গৃহিনীপনার জোরে ইংরেজি জানা ভদ্র সমাজে আমার মান বাঁচিয়ে আসছে; যা কিছু মাপে খাটো, তাকে কোনোরকমে ঢেকে বেড়াতে পেরেছে নিশ্চিত জানি তার কারণ, শিশুকাল থেকে আমার মনের পরিণতি ঘটেছে কোনো ভেজাল না দেওয়া মাতৃভাষায়; সেই খাদ্যে খাদ্যবস্তুর সঙ্গে যথেষ্ট খাদ্যপ্রাণ ছিল, যে খাদ্যপ্রাণে সৃষ্টিকর্তা তাঁর জাদুমন্ত্র দিয়েছেন৩৮
আসলে আমরা ভুলে যাই যে, নিজের ভাষা ভালো করে আয়ত্ত্ব না করলে অন্য ভাষায়ও দখল আসে না আমাদের দেশের শিক্ষিতদের মধ্যে যারা বাংলা ভাষাকে আয়ত্ব করেছেন তাদের কাছে ইংরেজি ভাষাটাও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি বরং উভয় ভাষাতেই তাঁদের দক্ষতা ও স্বাচ্ছন্দ্য রয়েছে রবীন্দ্রনাথ নিজের জীবন থেকেই এর দৃষ্টান্ত দিয়েছেন-
পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত ইংরেজি লিখিনি, ইংরেজি যে ভালো করে জানি তা ধারণা ছিল না মাতৃভাষাই তখন আমার সম্বল ছিল যখন ইংরেজি চিঠি লিখতাম তখন অজিত বা আর কাউকে দিয়ে লিখিয়েছি আমি তেরো বছর পর্যন্ত্ ইস্কুলে পড়েছি, তারপর থেকে পলাতক ছাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সের সময় যখন আমি আমার লেখার অনুবাদ করতে প্রবৃত্ত হলাম তখন গীতাঞ্জলির গানে আমার মনে ভাবের একটা উদবোধন হয়েছিল বলে সেই গানগুলিই অনুবাদ করলাম সেই তর্জমার বই আমার পশ্চিম মহাদেশ যাত্রার যথার্থ পাথেয়স্বরূপ হল দৈবক্রমে আমার দেশের বাইরেকার পৃথিবীতে আমার স্থান হল, ইচ্ছা করে নয় এই সম্মানের সঙ্গে সঙ্গে আমার দায়িত্ব বেড়ে গেল ৩৯
শিক্ষার হেরফেরপ্রবন্ধটি ১২৯৯ সালে সাধনাপত্রিকার পৌষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষানীতি এবং শিক্ষার মাধ্যমে হিসেবে মাতৃভাষার গুরুত্ব কতোটুকু রবীন্দ্রনাথ এ প্রবন্ধে তা বিশ্লেষণাত্মক ও তুলনামূলকভাবে আলোচনা করেছেন প্রবন্ধটি রাজশাহীঅ্যাসোসিয়েশনে পঠিত হয় পরে তা শিক্ষাগ্রন্থ ও রবীন্দ্র রচনাবলীর দ্বাদশ খণ্ডে সন্নিবেশিত হয়
আমাদের কোমলমতি শিশু ও ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে বিদ্যালয় যে একটা কঠিন কারাগার এ প্রসঙ্গে কবি বলেন-
যতটুকু আবশ্যক কেবল তাহারই মধ্যে কারারুদ্ধ হইয়া থাকা মানব জীবনের ধর্ম নহে - আমাদের দেহ সাড়ে তিন হাতের মধ্যে বদ্ধ, কিন্তু তাই বলিয়া ঠিক সেই সাড়ে তিন হাত পরিমাণ গৃহ নির্মাণ করিলে চলে না! স্বাধীন চলাফেরার জন্য অনেকখানি স্থান রাখা আবশ্যক নতুবা আমাদের স্বাস্থ্য এবং আনন্দের ব্যাঘাত হয় শিক্ষা সম্বন্ধেও এই কথা খাটে যতটুকু কেবলমাত্র শিক্ষা এবং অত্যাবশ্যক তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে একান্ত নিবদ্ধ রাখিলে কখনই তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে দেশে ভাল করিয়া মানুষ হইতে পারে না
বাঙালীর ছেলের মতো এমন হতভাগ্য আর কেহ নাই অন্য দেশের ছেলেরা যে বয়সে নবোদগত দন্তে আনন্দমনে ইক্ষু চর্বন করিতেছে, বাঙালীর ছেলে তখন ইস্কুলের বেঞ্চির উপর কোঁচাসমতে দুইখানি শীর্ণ খর্ব চরণ দোদুল্যমান করিয়া শুধুমাত্র বেত হজম করিতেছে, মাস্টারের কটু গালি ছাড়া তাহাতে আর কোনরূপ মশলা মিশানো নাই
বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই কেবল যাহা কিছু নিতান্ত আবশ্যক তাহাই কণ্ঠস্থ করিতেছি তেমন করিয়া কোনোমতে কাজ চলে মাত্র কিন্তু বিকাশ লাভ হয় না হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে, কিন্তু আহারটি রীতিমত হজম করিতে হাওয়া খাওয়া দরকার তেমনি একটা শিশু পুস্তককে রীতিমত হজম করিতে অনেকগুলি পাঠ্যপুস্তকের সাহায্য আবশ্যক আনন্দের সহিত পড়িতে পড়িতে পড়িবার শক্তি অলক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পাইতে থাকে গ্রহণশক্তি, ধারণাশক্তি, চিন্তাশক্তি বেশ সহজে এবং স্বাভাবিক নিয়মে বল লাভ করে৪০
যে শিক্ষায় আনন্দ নেই, প্রাণ নেই আর যে শিক্ষা মাতৃভাষার মাধ্যমে আত্মস্থ না করে শুধু মুখস্থ মাত্র- এশিক্ষাকে রবীন্দ্রনাথ কৃত্রিম শিক্ষা ও গোলামীর শিক্ষা বলেছেন-
যাহার মধ্যে জীবন নাই, আনন্দ নাই, অবকাশ নাই, নবীনতা নাই, নড়িয়া বসিবার এক তিল স্থান নাই, তাহারই অতি শুষ্ক কঠিন সংকীর্ণতার মধ্যে ইহাতে কি সে ছেলের কখনও মানসিক পুষ্টি, চিত্তের প্রসার, চরিত্রের বলিষ্ঠতা লাভ হইতে পারে সে কি এক প্রকার পাণ্ডুবর্ণ রক্তহীন শীর্ণ অসম্পূর্ণ হইয়া থাকে না সে কি বয়ঃপ্রাপ্তিকালে নিজের বুদ্ধি খাটাইয়া কিছু বাহির করিতে পারে, নিজের বল খাটাইয়া বাধা অতিক্রম করিতে পারে, নিজের স্বাভাবিক তেজে মস্তক উন্নত করিয়া রাখিতে পারে সে কি কেবল মুখস্থ করিতে, নকল করিতে এবং গোলামি করিতে শেখে না৪১
ভাষার কারাগারে আর বিদ্যালয়ের কারাগারে পিষ্ট হয়ে গানহীন, প্রাণহীন আনন্দহীন জীবনে আমাদের শিশু ও ছাত্ররা মনে ও প্রাণে জীর্ণ হয়ে উঠে এবং তাদের মানসিক ও আত্মিক বিকাশের কোনো পথই থাকে না শেষ পর্যন্ত পড়াশুনার প্রতি তাদের একটা অনীহা ভাব জেগে উঠে কবির উক্তি-
কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষায় যে পথ এক প্রকার রুদ্ধ আমাদিগকে বহুকাল পর্যন্ত শুধুমাত্র ভাষাশিক্ষায় ব্যাপৃত থাকিতে হয় পূর্বেই বলিয়াছি ইংরেজি এতই বিদেশী ভাষা এবং আমাদের শিক্ষকেরা সাধারণত এত অল্পশিক্ষিত যে, ভাষার সঙ্গে সঙ্গে ভাব আমাদের মনে সহজে প্রবেশ করিতে পারে না এইজন্য ইংরেজি ভাবের সহিত কিয়ৎপরিমাণে পরিচয় লাভ করিতে আমাদিগকে দীর্ঘকাল অপেক্ষা করিতে হয় এবং ততক্ষণ আমাদের চিন্তাশক্তি নিজের উপযুক্ত কোনো কাজ না পাইয়া নিতান্ত নিশ্চেষ্টভাবে থাকে এন্ট্রেস এবং ফার্স্ট-আর্টস পর্যন্ত কেবল চলনসই রকমের ইংরেজি শিখিতেই যায়; তার পরেই সহসা বি.এ. ক্লাসে বড়ো বড়ো পুঁথি এবং গুরুতর চিন্তাসাধ্য প্রসঙ্গ আমাদের সম্মুখে ধরিয়ো দেওয়া হয় - তখন সেগুলো ভালো করিয়া আয়ত্ত করিবার সময়ও নাই শক্তিও নাই - সবগুরো মিলাইয়া এক একটা বড়ো বড়ো তাল পাকাইয়া একেবারে এক এক গ্রাসে গিলিয়া ফেলিতে হয়
যেমন যেমন পড়িতেছি অমনি সঙ্গে সঙ্গে ভাবিতেছি না, ইহার অর্থ এই যে, ¯তূপ উঁচা করিতেছি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ করিতেছি না ইটা সুরকি, কড়িবরগা, বালিচুন, যখন পর্বন প্রমাণ উচ্চ হইয়া উঠিয়াছে এমন সময় বিশ্ববিদ্যালয় হইতে হুকুম আসিল একটা তেতালার ছাদ প্রস্তুত করো অমনি আমরা সেই উপকরণ¯তূপের শিখরে চড়িয়া দুই বৎসর ধরিয়া পিটাইয়া তাহার উপরিভাগ কোনোমতে সমতল করিয়া দিলাম, কতকটা ছাদের মতো দেখিতে হইল কিন্তু ইহাকে কি অট্টালিকা বলে ইহার মধ্যে বায়ু এবং আলোক প্রবেশ করিবার কি কোনো পথ আছে, ইহার মধ্যে মনুষ্যের চিরজীবনের বাসযোগ্য কি কোনো আশ্রয় আছে, ইহা কি আমাদিগকে বহিঃসংসারের প্রখর উত্তপ এবং অনাবরণ হইতে রীতিমত রক্ষা করিতে পারে, ইহার মধ্যে কি কোনো একটা শৃঙ্খলা সৌন্দর্য এবং সুষমা দেখিতে পাওয়া যায়৪২
তোতাপাখির মতো মুখস্থ কতোগুলো নিরস ও কৃত্রিম বুলি নিয়ে আমরা একটা সার্টিফিকেট লাভ করি অথচ দেশ, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং দেশের মানুষ সম্বন্ধে আমরাদের কোনো প্রেম ও ভালোবাসা গড়ে উঠে না - তাই দেশের চেয়ে আমাদের কাছে বিদেশই বড়ো হয়ে উঠে মাতৃভাষার চেয়ে বিজাতীয় বিভাষী কিছু বুলি আওড়িয়ে আমরা জ্ঞানের অহংকার আর গর্ববোধ করে থাকি রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন-
আমাদের নীরস শিক্ষায় জীবনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ অতীত হইয়া যায় আমরা বাল্য হইতে কৈশোর এবং কৈশোর হইতে যৌবনে প্রবেশ করি কেবল কতকগুলো কথার বোঝা টানিয়া সরস্বতীর সাম্রাজ্যে কেবলমাত্র মজুরি করিয়া মরি, পৃষ্ঠের মেরুদণ্ড বাকিয়া যায় এবং মনুষ্যত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ হয় না যখন ইংরেজি ভাবরাজ্যের মধ্যে প্রবেশ করি তখন আর সেখানে তেমন যথার্থ অন্তরঙ্গের মতো বিহার করিতে পরি না যদি বা ভাবগুলো একরূপ বুঝিতে পারি কিন্তু সেগুলো মর্মস্থলে আকর্ষণ করিয়া লইতে পারি না; বক্তৃতায় এবং লেখায় ব্যবহার করি, কিন্তু জীবনের কার্যে পরিণত করিতে পারি না
এইরূপে বিশ-বাইশ বৎসর ধরিয়া আমরা যে সকল ভাব শিক্ষা করি আমাদের জীবনের সহিত তাহার একটা রাসায়নিক মিশ্রণ হয় না বলিয়া আমাদের মনের ভারি একটা অদ্ভূত চেহারা বাহির হয় শিক্ষিত ভাবগুলি কতক আটা দিয়া জোড়া থাকে, কতক কালক্রমে ঝরিয়া পড়ে অসভ্যেরা যেমন গায়ে রঙ মাখিয়া উলকি পরিয়া পরম গর্ব অনুভব করে, স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের উজ্জ্বলতা এবং লাবণ্য আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে, আমাদের বিলাতি বিদ্যা আমরা সেইরূপ গায়ের উপর লেপিয়া দম্ভ ভরে পা ফেলিয়া বেড়াই, আমাদের যথার্থ আন্তরিক জীবনের সহিত তাহার অল্পই যোগ থাকে অসভ্য রাজারা যেমন কতকগুলো সস্তা বিলাতি কাঁচখণ্ড পুঁতি প্রভৃতি লইয়া শরীরের যেখানে সেখানে ঝুলাইয়া রাখে এবং বিলাতি সাজসজ্জা অযথাস্থানে বিন্যাস করে, বুঝিতেও পারে না কাজটা কিরূপ অদ্ভূত এবং হাস্যজনক হইতেছে, আমরাও সেইরূপ কতকগুলো সস্তা চকচকে বিলাতি কথা লইয়া ঝলমল করিয়া বেড়াই এবং বিলাতি বড়ো বড়ো ভাবগুলি লইয়া হয়তো সম্পূর্ণ অযথা স্থানে অসংগত প্রয়োগ করি, আমরা নিজেও বুঝিতে পারি না অজ্ঞাতসারে কী একটা অপূর্ব প্রহসন অভিনয় করিতেছি এবং কাহাকেও হাসিতে দেখিলে তৎক্ষণাৎ য়ুরোপীয় ইতিহাস বড়ো বড়ো নজির প্রয়োগ করিয়া থাকি ৪৩
জ্ঞান মানুষকে উদার করে স¤প্রসারিত করে, সংকীর্ণতা হতে, হীনমন্রতা হতে, ক্ষুদ্র গণ্ডি হতে, অন্ধকার হতে ও ক্ষুদ্র বুদ্ধি হতে মুক্ত জগতে ও আলোকে টেনে নেয় - বিশ্বসভায় সম্মিলিত করে দেয়-প্রথাবদ্ধতার আল ভেঙ্গে, প্রাচীর ভেঙ্গে মানুষকে মিলন ময়দানে বসিয়ে দেয় দেশের শিকড়ের সন্ধান করিয়ে দেয় আমরা আজ যে শিক্ষা পাই সে শিক্ষায় দিন দিন আমরা শিকড়চ্যুত হয়ে দেশ, মাটি ও মানুষ এবং দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিচ্যুত হয়ে পড়ি রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন-
যখন আমরা একবার ভালো করিয়া ভাবিয়া দেখি যে, আমরা যেভাবে জীবন-নির্বাহ করিব আমাদের শিক্ষা তাহার আনুপাতিক নহে; আমরা যে গৃহে আমৃত্যুকাল বাস করিব সে গৃহের উন্নতচিত্র আমাদের পাঠ্যপুস্তকে নাই; যে সমাজের মধ্যে আমাদিগকে জন্ম যাপন করিতে হইবে সেই সমাজের কোনো উচ্চ আদর্শ আমাদের নূতন শিক্ষিত সাহিত্যের মধ্যে লাভ করি না; আমাদের পিতামাতা, আমাদের সহৃৎ বন্ধু আমাদের ভ্রাতা ভগ্নীকে তাহার মধ্যে প্রত্যক্ষ দেখি না; আমাদের দৈনিক জীবনের কার্যকলাপ তাহার বর্ণনার মধ্যে কোনো স্থান পায় না; আমাদের আকাশ এবং পৃথিবী, আমাদের নির্মল প্রভাত এবং সুন্দর সন্ধ্যা, আমাদের পরিপূর্ণ শস্যক্ষেত্র এবং দেশলক্ষ্মী স্রোতস্বিনীর কোনো সংগীত তাহার মধ্যে ধ্বনিত হয় না; তখন বুঝিতে পারি আমাদের শিক্ষার সহিত আমাদের জীবনের তেমন নিবিড় মিলন হইবার কোনো স্বাভাবিক সম্ভাবনা নাই; উভয়ের মাঝখানে একটা ব্যবধান থাকিবেই থাকিবে; আমাদের শিক্ষা হইতে আমাদের জীবনের সমস্ত আবশ্যক অভাবের পূরণ হইতে পারিবেই না আমাদের সমস্ত জীবনের শিকড় যেখানে, সেখান হইতে শত হস্ত দূরে আমাদের শিক্ষার বৃষ্টিধারা বর্ষিত হইতেছে, বাধা ভেদ করিয়া যেটুকু রস নিকটে আসিয়া পৌঁছিতেছে সেটুকু আমাদের জীবনের শুষ্কতা দূর করিবার পক্ষে যথেষ্ট নহে আমরা যে শিক্ষায় আজন্মকাল যাপন করি, সে শিক্ষা কেবল যে আমাদিগকে কেরানীগিরি অথবা কোনো একটা ব্যবসায়ের উপযোগী করে মাত্র, যে সিন্দুকের মধ্যে আমাদের আপিসের মামলা এবং চাদর ভাঁজ করিয়া রাখি সেই সিন্দুকের মধ্যেই যে আমারেদ সমস্ত বিদ্যাকে তুলিয়া রাখিয়া দিই, আটপৌরে দৈনিক জীবনে তাহার যে কোনো ব্যবহার নাই, ইহা বর্তমান শিক্ষাপ্রণালীগুণে অবশ্যম্ভাবী হইয়া উঠিয়াছে এজন্য আমাদের ছাত্রদিগকে দোষ দেওয়া অন্যায় তাহাদের গ্রন্থজগৎ এক প্রান্তে আর তাহাদের বসতি জগৎ অন্যপ্রান্তে, মাঝখানে কেবল ব্যাকরণ-অভিধানের সেতু এইজন্য যখন দেখা যায় একই লোক একদিকে য়ুরোপীয় দর্শন বিজ্ঞান এবং ন্যায়শাস্ত্রে সুপণ্ডিত, অন্যদিকে চিরকুসংস্কারগুলিকে সযতেœ পোষণ করিতেছেন, একদিকে স্বাধীনতার উজ্জ্বল আদর্শ মুখে প্রচার করিতেচেন, অন্যদিকে অধীনতার শতসহস্র লতাতন্তুপাশে আপনাকে এবং অন্যকে প্রতি মুহূর্তে আচ্ছন্ন ও দুর্বল করিয়া ফেলিতেছেন, একদিকে বিচিত্রভাবপূর্ণ সাহিত্য স্বতন্ত্রভাবে সম্ভোগ করিতেছেন, অন্যদিকে জীবনকে ভাবের উচ্চ শিখরে অধিরূঢ় করিয়া রাখিতেছেন না, কেবল ধনোপার্জন এবং বৈষয়িক উন্নতি সাধনেই ব্যস্ত, তখন আর আশ্চর্য বোধ হয় না কারণ, তাঁহাদের বিদ্যা এবং ব্যবহারের মধ্যে একটা সত্যকার দুর্ভেদ্য ব্যবধান আছে, উভয়ে কখনও সুসংলগ্নভাবে মিলিত হইতে পায় না৪৪
এই কৃত্রিম অসার ও জীবন বিমুখ শিক্ষা নিয়েই আমরা গর্ব করে থাকি এবং শিক্ষার তেজস্ক্রিয়তায় মানুষকে অত্যাচার করে থাকি-
যাহা আমাদের শিক্ষিত বিদ্যা, আমাদের জীবন ক্রমাগতই তাহার প্রতিবাদ করিয়া চলাতে সেই বিদ্যাটার প্রতিই আগাগোড়া অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধা জন্মিতে থাকে মনে হয়, ও জিনিসটা কেবল ভূয়া এবং সমস্ত য়ূরোপীয় সভ্যতা ঐ ভূয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত আমাদের যাহা আছে তাহা সমস্তই সত্য এবং আমাদের শিক্ষা যেদিকে পথ নির্দেশ করিয়া দিতেছে সেদিকে সভ্যতা নামক একটি মায়াবিনী মহামিথ্যার সাম্রাজ্য আমাদের অদৃষ্টক্রমে বিশেষ কারণবশতই যে আমাদের শিক্ষা আমাদের নিকট নিষ্ফল হইয়া উঠিয়াছে তাহা না মনে করিয়া আমরা স্থির করি, উহার নিজের মধ্যে স্বভাবতই একটা বৃহৎ নিষ্ফলতার কারণ বর্তমান রহিয়াছে এইরূপে আমাদের শিক্ষাকে আমরা যতই অশ্রদ্ধ করিতে থাকি আমাদের শিক্ষাও আমাদের জীবনের প্রতি ততই বিমুখ হইতে থাকে, আমাদের চরিত্রের উপর তাহার সম্পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করিতে পারে না - এইরূপে আমাদের শিক্ষার সহিত জীবনের গৃহবিচ্ছেদ ক্রমশ বাড়িয়া উঠে, প্রতিমুহূর্তে পরস্পর পরস্পরকে সুতীব্য পরিহার করিতে থাকে এবং সম্পূর্ণ জীবন অসম্পূর্ণ শিক্ষা লইয়া বাঙালির সংসারযাত্রা দুই-ই সঙের প্রহসন হইয়া দাঁড়ায়৪৫
মাতৃভাষার প্রতি দেশের লোকের এই যে অবজ্ঞা এই অবজ্ঞার ফলেই দেশের তরুণ ও যুব সমাজকে দেশের প্রতি আকৃষ্ট না করে দিন দিন তাদের বিজাতীয় ও বিভাষী করে তুলছে কবির মনের এই বেদনাবোধ এখানে প্রকাশ পেয়েছে-
আজকালকার শিক্ষিতলোকে বাংলাভাষায় ভাব প্রকাশ করিবার জন্য উৎসাহী হইয়া উঠিয়াছে এটুকু বুঝিয়াছে যে, ইংরাজি আমাদের পক্ষে কাজের ভাষা, কিন্তু একমাত্র ইংরাজি ভাষা শিক্ষা করি, তথাপি আমাদের দেশীয় বর্তমান স্থায়ী সাহিত্য যাহা-কিছু তাহা বাংলা ভাষাতেই প্রকাশিত হইয়াছে তাহার প্রধান কারণ, বাঙালি কখনোই ইংরাজি ভাষার সহিত তেমন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ভাবে পরিচিত হইতে পারে না যাহাতে সাহিত্যের স্বাধীন ভাবোচ্ছ্বাস তাহার মধ্যে সহজে প্রকাশ করিতে পারে যদি বা ভাষার সহিত তাহার তেমন পরিচয় হয় তথাপি বাঙালির ভাব ইংরাজির ভাষায় তেমন জীবন্তরূপে প্রকাশিত হয় না যে সকল বিশেষ মাধুর্য, বিশেষ স্মৃতি আমাদিগকে প্রকাশ চেষ্টায় উত্তেজিত করে, যে সকল সংস্কার, পুরুষানুক্রমে আমাদের সমস্ত মনকে একটা বিশেষ গঠন দান করিয়াছে, তাহা কখনোই বিদেশী ভাষার মধ্যে যথার্থ মুক্তিলাভ করিতে পারে না
অতএব আমাদের শিক্ষিত লোকেরা যখনই ভাব প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করেন তখনই বাংলাভাষা অবলম্বন করিতে তাঁহাদের একটা কাতরতা জন্মে কিন্তু হায় অভিমানিনী ভাষা, সে কোথায়! সে কি এত দীর্ঘকাল অবহেলার পর মুহূর্তের আহবানে অমনি তৎক্ষণাৎ তাহার সমস্ত সৌন্দর্য, তাহার সমস্ত গৌরব লইয়া একজন শিক্ষাভিমানী গর্বোদ্ধত পুরুষের নিকট আত্মসমর্পণ করিবে? হে সুশিক্ষিত, হে আর্য, তুমি কি আমাদের এই সুকুমারী সুকোমলা তরুণী ভাষার যথার্থ মর্যাদা জান? ইহার কটাক্ষে যে উজ্জ্বল হাস্য, যে অশ্রম্লান করুণা, যে প্রখর তেজ স্ফূলিঙ্গ, যে স্নেহ-প্রীতি-ভত্তি স্ফুরিত হয়, তাহার গভীর মর্ম কি কখনো বুঝিয়াছ? হৃদয়ে গ্রহণ করিয়াছ? তুমি মনে কর, ‘আমি যখন মিল-স্পেন্সার পড়িয়াছি, সবকটা পাস করিয়াছি, আমি যখন এমন একজন স্বাধীন চিন্তাশীল মেধাবী যুবাপুরুষ, যখন হতভাগ্য কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাগণ আপন কুমারী কন্যা যথাসর্বস্ব লইয়া দ্বারে আসিয়া সাধ্য সাধনা করিতেছে, তখন ঐ অশিক্ষিত সামান্য গ্রাম্য লোকদিগের ঘরের তুচ্ছ ভাষাটার উচিত ছিল আমার ইঙ্গিতমাত্রে আমার শরণাপন্ন হইয়া কৃতকৃতার্থ হওয়া আমি যে ইংরাজি ভাষায় আমার অনায়াসপ্রাপ্য যশ পরিহার করিয়া আমার এত বড়ো ভাব এই দরিদ্র দেশে হেলায় বিসর্জন দিতেছি, তখন জীর্ণবস্ত্র দীনপান্থগণ রাজাকে দেখিলে যেমন সসম্ভ্রমে পথ ছাড়িয়া দেয় তেমনি আমার সম্মুখ হইতে সমস্ত তুচ্ছ বাধাবিপত্তি শশব্যস্ত হইয়া সরিয়া যাওয়া উচিত ছিল একবার ভাবিয়া দেখো, আমি তোমাদের কত উপকর করিতে আসিয়াছি আমি তোমাদিগকে পলিটিক্যাল ইকনমি সম্বন্ধে দুই-চারি কথা বলিতে পারিব, জীবরাজ্য হইতে আরম্ভ করিয়া সমাজ এবং আধ্যাত্মিক জগৎ পর্যন্ত এভোল্যুশনের নিয়ম কিরূপে কার্য করিতেছে তৎসম্বন্ধে আমি যাহা শিখিয়াছি তাহা তোমাদের নিকট হইতে সম্পূর্ণ গোপন করিব না, আমার ঐতিহাসিক এবং দার্শনিক প্রবন্ধের ফুটনোটে নানা ভাষার দুরূহ গ্রন্থ হইতে নানা বচন ও দৃষ্টান্ত সংগ্রহ করিয়া দেখাইতে পারিব, এবং বিলাতি সাহিত্যের কোন পুস্তক সম্বন্ধে কোন সমালোচক কী কথা বলেন তাহাও বাঙালির অগোচর থাকিবে না-কিন্তু যদি তোমাদের এই জীর্ণচীর অসম্পূর্ণ ভাষা আদেশমাত্র অগ্রসর হইয়া আমাদের সমাদর করিয়া না লয় তবে আমি বাংলায় লিখিব না; আমি ওকালতি করিব; ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হইব; ইংরাজি খবরের কাগজে লীডার লিখিব; তোমাদের যে কত ক্ষতি হইবে তাহার আর ইয়ত্তা নাই
বঙ্গদেশের পরমদুর্ভাগ্যক্রমে তাহার এ লজ্জাশীলা অথচ তৈজস্বিনী নন্দিনী বঙ্গভাষা অগ্রবর্তিনী হইয়া এমন সকল ভালো ছেলের সমাদর করে না এবং ভালো ছেলেরাও রাগ করিয়া বাংলাভাষার সহিত কোনো সম্পর্ক রাখে না এমনকি, বাংলায় চিঠিও লেখে না, বন্ধুদের সহিত সাক্ষাৎ হইলে যতটা পারে বাংলা হাতে রাখিয়া ব্যবহার করে এবং বাংলা গ্রন্থ অবজ্ঞাভরে অন্তপুরে নির্বাসিত করিয়া দেয় ইহাকে বলে, ‘লঘুপাপে গুরুদণ্ড
... আমাদের বাল্যকালের শিক্ষায় আমরা ভাষার সহিত ভাব পাই না আবার বয়স হইলে ঠিক তাহার বিপলীত ঘটে; যখন ভাব জুটিতে থাকে তখন ভাষা পাওয়া যায় না ভাষা শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ভাবশিক্ষা একত্র অবিচ্ছেদ্যভাবে বৃদ্ধি পায় না বলিয়াই য়ুরোপীয় ভাবের যথার্থ নিকটসংসর্গ আমরা লাভ করি না এবং সেইজন্যই আজকাল আমাদের অনেক শিক্ষিত লোকে য়ুরোপীয় ভাব সকলের প্রতি অনাদর প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিয়াছেন অন্যদিকেও তেমনি ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই আপনার মাতৃভাষাকে দৃঢ়তাবদ্ধরূপে পান নাই বলিয়া মাতৃভাষা হইতে তাঁহারা দূরে পড়িয়া গেছেন এবং মাতৃভাষার প্রতি তাঁহাদের একটি অবজ্ঞা জন্মিয়া গেছে বাংলা তাঁরা জানেন না সে কথা স্পষ্টরূপে স্বীকার না করিয়া তাঁহারা বলেন, ‘বাংলায় কি কোনো ভাব প্রকাশ করা যায়? এ ভাষা আমাদের মতো শিক্ষিত মনের উপযোগী নহে প্রকৃত কথা, আঙুর আয়ত্তের অতীত হইলে তাহাকে টক বলিয়া উপেক্ষা আমরা অনেক সময় অজ্ঞাতসারে করিয়া থাকি
যে দিক হইতে যেমন করিয়াই দেখা যায়, আমাদের ভাব ভাষা এবং জীবনের মধ্যকার সামঞ্জস্য দূর হইয়া গেছে মানুষ বিচ্ছিন্ন হইয়া নিস্ফল হইতেছে, আপনার মধ্যে একটি অখণ্ড ঐক্য লাভ করিয়া বলিষ্ঠ হইয়া দাঁড়াইতে পারিতেছে না, যখন যেটি আবশ্যক তখন সেটি হাতের কাছে পাইতেছে না একটি গল্প আছে, একজন দরিদ্র সমস্ত শীতকালে অল্প অল্প ভিক্ষা সঞ্চয় করিয়া যখন শীতবস্ত্র কিনিতে সক্ষম হইত তখন গ্রীষ্ম আসিয়া পড়িত, আবার সমস্ত গ্রীষ্মকাল চেষ্টা করিয়া যখন লঘু বস্ত্র লাভ করিত তখন অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি; দেবতা যখন তাহার দৈন্য দেখিয়া দয়ার্দ্র হইয়া বর দিতে চাহিলের তখন সে কহিল, ‘আমি আর কিছু চাহি না, আমার এই হেরফের ঘুচাইয়া দাও আমি যে সমস্ত জীবন ধরিয়া গ্রীষ্মের সময় শীতবস্ত্র এবং শীতের সময় গ্রীষ্মবস্ত্র লাভ করি, এইটে যদি একটু সংশোধন করিয়া দাও তাহা হইলেই আমার জীবন সার্থক হয়
আমাদেরও সেই প্রার্থনা আমাদের হেরফের ঘুচিলেই আমরা চরিতার্থ হই শীতের সহিত শীতবস্ত্র, গ্রীষ্মের সহিত গ্রীষ্মবস্ত্র, কেবল একত্র করিতে পারিতেছি না বলিয়াই আমাদের এত দৈন্য; নহিলে আছে সকলই এখন আমরা বিধাতার নিকট এই বর চাহি, আমাদের ক্ষুধার সহিত অন্ন, শীতের সহিত বস্ত্র, ভাবের সহিত ভাষা, শিক্ষার সহিত জীবন কেবল একত্র করিয়া দাও ৪৬
শিক্ষার ভিত রক্ষা হবে জাতির অন্তর থেকে, জাতির তলদেশ থেকে আর তা হতে হবে মাতৃভাষায় বাইরের আষ্ফালনে মত্ততা থাকতে পারে কিন্তু এতে জাতির উন্নতি বিশেষ হবে না আমরা ভাববো, চিন্তা করবো মাতৃবাষায় আর প্রকাশ করবো অন্যভাষায় তা কখনো হতে পারে না এখনো এ ধরনের পরগাছা বৃত্তি-এতে জাতির দুর্গতি মোচন হয় না- স্বাদেশিক চেতনা জাগতে পারে না রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-
স্বদেশী ভাষার সাহায্য ব্যতীত কখনোই স্থায়ী কল্যাণ সাধিত হইতে পারে না, এ কথা কে না বোঝে কিন্তু দুদৈবক্রমে সহজ কথা না বুঝিলে তাহার মতো কঠিন কথা আর নাই কারণ, কথা না বুঝিলে সহজ কথার সাহায্যে বুঝাইতে হয়, কিন্তু সহজ কথা না বুঝিলে আর উপায় দেখা যায় না
দেশের অধিকাংশ লোকের শিক্ষার উপর যদি দেশের উন্নতি নির্ভর করে, এবং সেই শিক্ষার গভীরতা ও স্থায়িত্বের উপর যদি উন্নতির স্থায়িত্ব নির্ভর করে, তবে মাতৃভাষা ছাড়া যে আর কোনো গতি নাই, একথা কেহ না বুঝিলে হাল ছাড়িয়া দিতে হয়
রাজা কত আসিতেছে কত যাইতেছে; পাঠান গেল, মোগল গেল, ইংরেজ আসিল আবার কালক্রমে ইংরেজও যাইবে, কিন্তু ভাষা সেই বাংলাই চলিয়া আসিতেছে এবং বাংলাই চলিবে; যাহা কিছু বাংলায় থাকিবে তাহাই যথার্থ থাকিবে এবং চিরকাল থাকিবে ইংরেজ যদি কাল চলিয়া যায় তবে পরশু ওই বড়ো বড়ো বিদ্যালয়গুলি বড়ো বড়ো সৌধবুদ্বুদের মতো প্রতীয়মান হইবে
ভালোরূপে নজর করিয়া দেখিলে আজও ওগুলাকে বুদ্বুদ বলিয়া বোঝা যায় উহারা আমাদের বৃহৎ লোক প্রবাহের মধ্যে অত্যন্ত লঘুভাবে অতিশয় অল্পস্থান অধিকার করিয়া আছে প্রবাহের গভীর তলদেশে উহাদের কোনো মূল নাই তীরে বসিয়া ফেনের আধিক্য দেখিলে ভ্রম হয় তবে বুজি আগাগোড়া এইরূপ ধবলাকার, একটা অন্তরে অবগাহন করিলেই দেখা যায় সেখানে সেই স্নিগ্ধ শীতল চিরকালের নীলাম্বুধারা
শিক্ষা যদি সেই তলদেশে প্রবেশ না করে, জীবন্ত মাতৃভাষার মধ্যে বিগলিত হইয়া চিরস্থায়িত্ব লাভ না করে, তবে সমাজের উপরিভাগে যতই অবিশ্রাম নৃত্য করুক এবং ফেনাইয়া উঠুক তাহা ক্ষণিক শোভার কারণ হইতে পারে, চিরন্তন জীবনের উৎস হইতে পারে না
এসব কথা ইতিহাসে অনেকবার আলোচিত হইয়া গেছে, এবং অনেক ইংরেজ লেখকও একথা লিখিয়াছেন জার্মানিতে যতদিন না মাতৃভাষার আদর হইয়াছিল ততদিন তাহার যথার্থ আত্মাদর এবং আত্মোন্নতি হয় নাই শিক্ষাসভার যে সভ্যগণ মাতৃভাষার প্রতি আপত্তি প্রকাশ করেন তাঁহারা এ সমস্ত উদাহরণ অবগত আছেন, সেইজন্যই কথাটা তাঁহাদের বুঝানো আরও কঠিন, কারণ, বুঝাইবার কিছু নাই
আর একটা যুক্তি আছে এতদিনকার ইংরেজি শিক্ষাতেও শিক্ষিতগণের মধ্যে প্রকৃত মানসিক বিকাশ দেখা যায় না তাঁহারা এমন একটা কিছু করেন নাই যাহাকে পৃথিবীর একটা নূতন উপার্জন বলা যাইতে পারে, যাহাতে মনুষ্যজাতির একটা নূতন গৌরব প্রকাশ পাইয়াছে কেহ কেহ ভালো ইংরেজি বলেন, কেহ কেহ বিশুদ্ধ উচ্চারণ রক্ষা করেন, কিন্তু ধাত্রীর অঞ্চল ছাড়িয়া কেহ এক পা হাঁটিতে পারেন না
তাহার প্রধান কারণ, বিদেশী ভাষার ভাব বড়ো গুরুতর একজনের খোলস আর একজনের স্কন্ধে চাপাইলে সে কখনোই তাহা লইয়া বেশ স্বাধীন সহজভাবে চলিতে পারে না আমাদের ভাবকে বিদেশী ভাষার বোঝা কাঁধে লইয়া চলিতে হয়, প্রতি পদে পদস্খলনের ভয়ে তাহাকে বড়ো সাবধানে অগ্রসর হইতে হয়, কোনো মতে মান বাঁচাইয়া বাঁধা রাস্তা ধরিয়া চলিতে পারিলেই তাহার পক্ষে যথেষ্ট
কিন্তু এতটুকু করাই এত কঠিন যে, সেইটুকু সুসম্পন্ন করিলেই পরম একটা গৌরব অনুভব করা যায়, সেটাকে খুব একটা মহৎ ফললাভ বলিয়া ভ্রম হয় অন্য দেশে একটা বড়ো কাজের যতটা মূল্য, আমাদের দেশে একটা অবিকল নকলের মূল্য তাহা অপেক্ষা অল্প নহে এতটা করিয়া যাহা হইল তাহা যে কিছুই নহে, একথা লোককে বোঝানো বড়ো শক্ত এইজন্য মুখুজ্যের ছেলেকে গড়গড় শব্দে ইংরেজি বক্তৃতা করিতে শুনিলে বাঁড়ূয্যের ছেলেকেও সেই চূড়ান্ত গৌরব হইতে বঞ্চিত করিতে তাহার বাপের প্রবৃত্তি হয় না তখন যদি তাহাকে বুঝাইতে বসা যায় যে, বার্ক ব্রাইট গ্লাডস্টোনের ভাষার সহিত প্রচুর পরিমাণে পানাপুকুরের জল মিশাইয়া একটি বঙ্গশাবক যে কহুকষ্টে অথবা অল্পায়াসে গোটাকতক অকিঞ্চিৎকর কথা বলিয়া গেল, উহাতে কোনো কাজই হইল না, উহা না আমাদের দেশের অন্তঃকরণে স্থায়ী হইল, না বিলাতি সাহিত্যে প্রবেশ লাভ করিল-কেবল নিষ্ফল শিলাবৃষ্টির ন্যায় অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী চটপট শব্দের করতালি আকর্ষণ করিয়া শস্যবীজহীন পথকর্দমের সহিত মিশাইয়া গেল; উহা অপেক্ষা বাংলা ভাষায় ভাব প্রকাশ করিবার চেষ্টাও সহস্রগুণ সফলতা আছে-তবে এসব কথা বাঁড়য্যের কর্ণে স্থান লাভ করে না, মুখুজ্যের ছেলের ইংরেজি ফাঁকা আওয়াজের কাছে স্বদেশের সমস্ত দাবি তাহার নিকট এতই ক্ষীণ বলিয়া প্রতীয়মান হয়
বুঝাইবার পক্ষে আর একটা বড়ো বাধা আছে অনেকে এমন কথা মনে করেন, আমরাও তো আধুনিক প্রণালীতে শিক্ষালাভ করিয়াছি; কই আমাদের মানসিক ঔৎকর্ষ সম্বন্ধে আমাদের মনে তো কখনও তিলমাত্র সংশয় উপস্থিত হয় না বুঝিতে পড়িতে কহিতে বলিতে আমরা তো বড়ো কম নহি
সে কথা অস্বীকার করিয়া কাজ নাই তাঁহাদিগকে বলা যাক, আপনারা কিছুতেই ন্যূন নহেন কিন্তু আরও ঢের বেশি হইতে পারিতেন এখনই যদি আপিসের কাজ সুশৃঙ্খল মতো নির্বাহ করিয়া জগৎকে চমৎকৃত করিয়া দিতে পারিতেছেন, বিদেশী ভাষার বাধা অতিক্রম করিতে না হইলে না জানি কী হইতেন এবং কী করিতেন তাঁহাদিগকে আরও বলা যাইতে পারে যে, আপনাদের কথা স্বতন্ত্র আপনারা যে এমন প্রতিকুল অবস্থার মধ্যেও এত বড়ো হইয়া উঠিয়াছেন তাহাতে আপনাদেরই বিশেষ মাহাত্ম্য প্রকাশ পাইতেছে, শিক্ষাপ্রণালীর নহে কিন্তু দেশের সকলেই তো আপনাদের মতো হইতে পারে না
শিক্ষায় স্বদেশী ভাষা অবলম্বন করিলে কেন যে মনের বিশেষ উন্নতি হয় সে কথা পূর্বে বলিয়াচি যে সৌভাগ্যবান সভ্যজাতিরা দেশীভাষায় শিক্ষালাভ করে তাহারা প্রথম হইতেই ধারণা করিবার, চিন্তা করিবার অবসর পায় আরম্ভ হইতেই তাহাদের ভাব প্রকাশ করিবার সুযোগ ঘটে কেবল যে কতকগুলো মুখস্থ জ্ঞান অর্জন হয় তাহা নহে, মানসিক শক্তির বিকাশ হইতে থাকে৪৭
সাহিত্যের গৌরবপ্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আমাদের মাতৃভাষা ও সাহিত্যের দৈন্যের চিত্র তুলে ধরেছেন আমরা আমাদের মাতৃভাষার সম্মান করবো না, মাতৃভাষাকে অবহেলা করে বাইরে ফেলে রাখবো আর অনাদর করবো -এই ধরনের মানসিকতা দেশপ্রেম হতে পারে না দেশের মঙ্গল চাইলে প্রথমেই প্রয়োজন আমাদের মাতৃভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলা কবি তাই বলেছেন-
বঙ্গ সাহিত্যের কোনো গৌরব নাই কিন্তু সে যে কেবল বঙ্গসাহিত্যের দৈন্যবশত তাহা নহে গৌরব করিবার লোক নাই ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কয়েকজনের নিকট তাহার সমাদর থাকিতে পারে, কিন্তু একত্র সংহত সর্বসাধারণের নিকট তাহার কোনো প্রতিপত্তি নাই কারণ, একত্র সংহত সর্বসাধারণ এদেশে নাই
যে দেশে আছে সেখানে সকলে সাধারণ মঙ্গল অমঙ্গল একত্রে অনুভব করে সেখানে দেশীয় ভাষা এবং সাহিত্যের অনাদর হইতে পারে না; কারণ, যেখানে অনুভবশক্তি আছে, সেইখানেই প্রকাশ করিবার ব্যাকুলতা আছে সেখানে সর্বসাধারণের ভাবের ঐক্যে অনুপ্রাণিত হয়, সেখানে সর্বসাধারণের মধ্যে ভাষার ঐক্য আবশ্যক হইয়া উঠে এবং এই সাধারণের ভাষা কখনোই বিদেশীয় ভাষা হইতে পারে না
য়ুরোপ জাতি বলিতে যাহা বুঝায় আমরা বাঙালিরা তাহা নহি অর্থাৎ, আমাদের এই অঙ্গে আঘাত লাগিলে সর্ব অঙ্গে বেদনা বোধ হয় না আমাদের সকলের মধ্যে বেদনাবহ বার্তাবহ কোনো সাধারণ স্নায়ুতন্ত্র নাই সুতরাং আমাদের মধ্যে সাধারণ সুখদুঃখ বলিয়া কোনো পদার্থ নাই, এবং সাধারণ সুখদুঃখ প্রকাশ করিবার কোনো আবশ্যক নাই
এইজন্য দেশীয় ভাষার প্রতি সাধারণের আদর নাই এবং দেশীয় সাহিত্যের প্রতি সাধারণের অনুরাগের স্বল্পতা দেখা যায় লোকে যে অভাব অন্তরের সহিত অনুভব করে না সে অভাব পূরণ করিয়া তাহাদের নিকট হইতে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রত্যাশা করা যায় না অনেকে কর্তব্য বোধে কৃতজ্ঞ হইবার প্রাণপণ প্রয়াস পাইয়া থাকেন, কিন্তু সে চেষ্টা কোনো বিশেষ কাজে আসে না
আমাদের দেশে সাধারণের কোনো আবশ্যকবোধ না থাকাতে এবং সাধারণের আবশ্যক-পূরণজনিত গৌরববোধ লেখকের না থাকাতে, আমাদের সাহিত্যের ক্ষেত্র স্বভাবতই সংকীর্ণ হইয়া আছে এবং লেখকে পাঠকে ঘনিষ্ট যোগ থাকে না সাহিত্য কেবলমাত্র অল্পসংখ্যক শৌখিন লোকের নিকট আদরণীয় হইয়া থাকে অথচ, সেই সাহিত্য-শৌখিন লোকগুলি প্রাচীনকালের রাজাদিগের ন্যায় সর্বত্র-পরিচিত প্রভাবশালী মহিমান্বিত নহেন, সুতরাং তাঁহাদের আদরে সাহিত্য সাধারণের আদর লাভ করে না কথাটা বিপরীত শুনাইতে পারে কিন্তু ইহা স্বীকার করিতে হইবে যে, কিয়ৎপরিমাণে আদর না পাইলে আদর পাওয়ার যোগ্য হওয়া যায় না৪৮
শিক্ষার হেরফেরপ্রবন্ধের অনুবৃত্তিতে একথা তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন-
এদেশে ধান জন্মে বিলাতে জন্মায় ওক এখানকার দেশী ভাষা বাংলা, ইংরেজি নহে যদি কর্ষণ করিয়া সম্যক ফল লাভ করিতে হয় তবে বাংলায় করিতে হইবে, নতুবা ঠিক কালচারহইবে না৪৯
বিজাতি বিভাষীরা বারবার আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র এবং আমাদের জাতিসত্তার উপর আক্রমণ করেছে, বর্বর হামলা চালিয়েছে কিন্তু আমাদের স্বকীয়তাকে একটুও ম্লান করতে পারেনি শিক্ষার সংস্কার প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আয়ারল্যান্ড ও স্যাকসনের একটি উদাহরণ টেনেছেন আমাদের মহান একুশের ভাষা আন্দোলন কবি গুরুর এই চিন্তাধারার একটি বাস্তব প্রতিফলন কবির বক্তব্য-
প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে এমন ভিন্ন করিয়া গড়িয়াছেন যে এক জাতিকে ভিন্ন জাতের কাঠামোর মধ্যে পুরিতে গেলে সমস্ত খাপছাড়া হইয়া যায়৫০
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন: ‘‘যে ভাষায় আমাদের শিক্ষা সমাধা হয়, সে ভাষায় প্রবেশ করিতে আমাদের অনেকদিন লাগে ততদিন পর্যন্ত কেবল দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া হাতুড়ি পেটা এবং কুলুপ খোলার তত্ত্ব অভ্যাস করিতেই প্রাণান্ত হইতে হয় আমাদের মন তেরো চৌদ্দ বছর বয়স হইতেই জ্ঞানের আলোক এবং ভাবের রস গ্রহণ করিবার জন্যে  ফুটিবার উপক্রম করিতে থাকে; সেই সময়েই অহরহ যদি তাহার উপর বিদেশী ভাষার ব্যাকরণ এবং মুখস্থ বিদ্যার শিলাবৃষ্টি বর্ষণ হইতে থাকে তবে তাহা পুষ্টিলাভ করিবে কী করিয়া? প্রায় বছর কুড়ি বয়স পর্যন্ত মারামারির পর ইংরেজি ভাষায় আমাদের স্বাধীন অধিকার জন্মে, কিন্তু ততদিন আমাদের মন কী খোরাকে বাঁচিয়াছে? আমরা কী ভাবিতে পাইয়াছি, আমাদের হৃদয় কী রস আকর্ষণ করিয়াছে, আমাদের কল্পনাবৃত্তি সৃষ্টি কার্যচর্চার জন্য কী উপকরণ লাভ করিয়াছে? যাহা গ্রহণ করি তাহা সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করিতে থাকিলে তবেই ধারণাটা পাকা হয় পরের ভাষায় গ্রহণ করাও শক্ত, প্রকাশ করাও কঠিন এইরূপে রচনা করিবার চর্চা না থাকতে যাহা শিখি তাহাতে আমাদের অধিকার দৃঢ় হইতেই পারে না মুখস্থ করিয়া শেখা এবং লেখা দুয়ের কাজ চালাইয়া দিতে হয় যে বয়সে মন অনেকটা পরিমাণে পাকিয়া যায় সে বয়সের লাভ পুরা লাভ নহে যে কাঁচা বয়সে মন অজ্ঞাতসারে আপনা খাদ্য শোষণ করিতে পারে তখনই সে জ্ঞান ও ভাবকে আপনার রক্তমাংসের সহিত পূর্ণভাবে মিশাইয়া নিজেকে সজীব সবল সক্ষম করিয়া তোলে সেই সময়টাই আমাদের মাঠে মারা যায় সে মাঠ শস্যশূন্য অনুর্বর নীরস মাঠ সেই মাঠে আমাদের বুদ্ধি ও স্বাস্থ্য কত যে মরিয়াছে তাহার হিসাব কে রাখে!
এইরূপে শিক্ষাপ্রণালীতে আমাদের মন যে অপরিণত থাকিয়া যায়, বুদ্ধি যে সম্পূর্ণ স্ফূর্তি পায় না, সেকথা আমাদিগকে স্বীকার করিতে হইবে আমাদের পাণ্ডিত্য অল্পকিছুদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়, আমাদের উদ্ভাবনীশক্তি শেষ পর্যন্ত পৌঁছে না, আমাদের ধারণাশক্তির বলিষ্ঠতা নাই আমাদের ভাবনাচিন্তা, আমাদের লেখাপড়ার মধ্যে সেই ছাত্র অবস্থার ক্ষীণতাই বরাবর থাকিয়া যায়, আমরা নকল করি, নজির খুঁড়ি এবং স্বাধীন মত বলিয়া যাহা প্রচার করি তাহা হয় কোনো না কোনো মুখস্থ বিদ্যার প্রতিধ্বনি, নয় একটা ছেলে মানুষি ব্যাপার হয় মানসিক ভীরুতাবশত আমরা পদচিহ্ন মিলাইয়া চলি, নয় অজ্ঞতার স্পর্ধাবশত বেড়া ডিঙ্গাইয়া চলিতে থাকি কিন্তু আমাদের বু্িদ্ধর যে স্বাভাবিক খর্বতা আছে, একথা কোনোমতেই স্বীকার্য নহে আমাদের শিক্ষাপ্রণালীর ত্রটি সত্ত্বেও আমরা অল্পসময়ের মধ্যে যতটা মাথা তুলিতে পারিয়াছি, সে আমাদের নিজের গুণে৫০
আমরা সবকিছুতেই পরের উপর নির্ভর করে থাকি- আমাদের শিক্ষার ভারও আমরা পরের উপরই দিয়েছি অথচ আমাদের শিক্ষার উপায় আমরা নিজেরা উদ্ভাবন না করলে পরের ছাঁচে গড়া শিক্ষায় আমাদের ছাত্ররা কখনো মানুষ হতে পারবে না রবীন্দ্রনাথের মতে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিতে থাকবে দেশের মাটির গন্ধ এবং দেশের প্রকৃতি ও আবহ তাই তিনি বলেছেন-
নিজে চিন্তা করিবে, নিজে সন্ধান করিবে, নিজে কাজ করিবে, এমন তরো মানুষ তৈরী করিবার প্রণালী এক, আর পরের হুকুম মানিয়া চলিবে, পরের মতের প্রতিবাদ করিবে না ও পরের কাজের যোগানদার হইয়া থাকিবে মাত্র, এমন মানুষ তৈরীর বিধান অন্যরূপ
দেশের লোককে শিশুকাল হইতে মানুষ করিবার সদুপায় যদি নিজে উদ্ভাবন এবং তাহার উদ্যোগ যদি নিজে না করি, তবে আমরা সর্বপ্রকারে বিনাশপ্রাপ্ত হইব অন্নে মরিব, স্বাস্থ্যে মরিব, চরিত্রে মরিব-ইহা নিশ্চয় বস্তুত আমরা প্রত্যহই মরিতেছি অথচ তাহার প্রতিকারের উপযুক্ত চেষ্টামাত্র করিতেছি না তাহার চিন্তামাত্র যথার্থরূপে আমাদের মনেও উদয় হইতেছে না, এই যে নিবিড় মোহাবৃত নিরুদ্যম ও চরিত্র বিকার - বাল্যকাল হইতে প্রকৃত শিক্ষা ব্যতীত কোনো অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠানের দ্বারা ইহা নিবারণের কোনো উপায় নাই৫১
রবীন্দ্রনাথ সব সময়ই বাইরের নয় ভেতরের জাগরণ চাইতেন আর তিনি এও ভালো করে জানতেন যে, দেশের বাষা ও সাহিত্য ব্যতীত এ জাগরণ সম্ভব নয় বাংলা জাতীয় সাহিত্যপ্রবন্ধে তিনি এ বক্তব্য স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন- বড়ো একটি উন্নত ভাবের উপর বঙ্গসাহিত্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে যখন এই নির্মাণকার্যের আরম্ভ হয় তখন বঙ্গভাষার না ছিল কোনো যোগ্যতা, না ছিল সমাদর; তখন বঙ্গভাষা তাহাকে খ্যাতিও দিত না অর্থও দিত না; তখন বঙ্গভাষায় ভাব প্রকাশ করাও দুরূহ ছিল এবং ভাব প্রকাশ করিয়া তাহা সাধারণের মধ্যে প্রচার করাও দুঃসাধ্য ছিল তাহার আশ্রয়দাতা রাজা ছিল না, তাহার উৎসাহদাতা শিক্ষিত সাধারণ ছিল না যাঁহারা ইংরাজি চর্চা করিতেন তাঁহারা বাংলাকে উপেক্ষা করিতেন এবং যাঁহারা বাংলা জানিতেন তাঁহারাও এই নূতন উদ্যমের কোনো মর্যাদা বুঝিতেন না তখন বঙ্গসাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতাদের সম্মুখে কেবল সুদূর ভবিষ্যৎ এবং সুবৃহৎ জনমণ্ডলী উপস্থিত ছিল - তাহাই যথার্থ সাহিত্যের স্থায়ী প্রতিষ্ঠাভূমি স্বার্থও নহে, খ্যাতিও নহে, প্রকৃত সাহিত্যের ধ্রব লক্ষ্যস্থল কেবল নিরবধি কাল এবং বিপুল পৃথিবী সেই লক্ষ্য থাকে বলিয়াই সাহিত্য মানবের সহিত মানবকে, যুগের সহিত যুগান্তরকে প্রাণবন্ধনে বাঁধিয়া দেয়
বৈজ্ঞানিকেরা বলেন, পৃথিবী বেষ্টনকারী বায়ুমণ্ডলের একটি প্রধান কাজ সূর্যালোককে ভাঙিয়া বণ্টন করিয়া চারিদিকে যথাসম্ভব সমানভাবে বিকীর্ণ করিয়া দেওয়া বাতাস না থাকিলে মধ্যাহ্নকালেও কোথাও বা প্রখর আলোক কোথাও বা নিবিড়তম অন্ধকার বিরাজ করিত
আমাদের জ্ঞানরাজ্যের মনোরাজ্যের চারিদিকেও সেইরূপ একটা বায়ুমণ্ডলের আবশ্যক আছে সমাজের সর্বত্র ব্যাপ্ত করিয়া এমন একটা অনুশীলনের হাওয়া বহা চাই যাহাতে জ্ঞান এবং ভাবের রশ্মি চতুর্দিকে প্রতিফলিত, বিকীর্ণ হইতে পারে
যখন বঙ্গদেশে প্রথম ইংরাজি শিক্ষা প্রচলিত হয়, যখন আমাদের সমাজে সেই মানসিক বায়ুমণ্ডল সৃজিত হয় নাই, তখন শতরঞ্জের সাদা এবং কালো ঘরের মতো শিক্ষা এবং অশিক্ষা সংক্ষিপ্ত না হইয়া ঠিক পাশাপাশি বাস করিত যাহারা ইংরাজি শিখিয়াছে এবং যাহারা শেখে নাই তাহারা সুস্পষ্টরূপে বিভক্ত ছিল; তাহাদের পরস্পরের মধ্যে কোনরূপ সংযোগ ছিল না, কেবল সংঘাত ছিল শিক্ষিত ভাই আপন অশিক্ষিত ভাইকে মনের সহিত অবজ্ঞতা করিতে পারিত, কিন্তু কোনো সহজ উপায়ে তাহাকে আপন শিক্ষার অংশ দান করিতে পারিত না
... এই ক্ষুদ্র সীমায় বদ্ধ ব্যাপ্তিহীন পাণ্ডিত্য কিছু অত্যুগ্র হইয়া উঠে; কেবল তাহাই নহে তাহার প্রধান দোষ এই যে নবশিক্ষার মুখ্য এবং গৌণ অংশ সে নির্বাচন করিয়া লইতে পারে না সেইজন্য প্রথম প্রথম যাঁহারা ইংরাজি শিখিয়াছিলেন তাঁহারা চতুষ্পার্শবর্তীদের প্রতি অনাবশ্যক উৎপীড়ন করিয়াছিলেন এবং স্থির করিয়াছিলেন মদ্য, মাংস ও মুখরতাই সভ্যতা মুখ্য উপকরণ
... এই কারণে ইংরাজি শিক্ষা যখন সংকীর্ণ সীমায় নিরুদ্ধ ছিল তখন সেই ক্ষুদ্র সীমার মধ্যে ইংরাজি সভ্যতার ত্যাজ্য অংশ সঞ্চিত হইয়া সমস্ত কলুষিত করিয়া তুলিতেছিল এখন সেই শিক্ষা চারিদিকে বিস্তৃত হওয়াতেই তাহার প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হইয়াছে কিন্তু ইংরাজি শিক্ষা যে ইংরাজি ভাষা অবলম্বন করিয়া বিস্তৃত হইয়াছে তাহা নহে বাংলা সাহিত্যই তাহার প্রধান সহায় হইয়াছে এই বাংলা সাহিত্যযোগে ইংরাজিভাব যখন ঘরে-বাহিরে সর্বত্র সুগম হইল তখনই ইংরাজি সভ্যতার অন্ধ দাসত্ব হইতে মুক্তিলাভের জন্য আমরা সচেতন হইয়া উঠিলাম ইংরাজি শিক্ষা এখন আমাদের সামজে ওতপ্রোতভাবে মিশ্রিত হইয়া গিয়াছে, এইজন্য আমরা স্বাধীনভাবে তাহার ভালোমন্দ তাহার মুখ্য-গৌণ বিচারের অধিকারী হইয়াছি; এখন নানা চিত্ত নানা অবস্থায় তাহাকে পরীক্ষা করিয়া দেখিতেছি; এখন সেই শিক্ষার দ্বারা বাঙালির মন সজীব হইয়াছে এবং বাঙালির মনকে আশ্রয় করিয়া সেই শিক্ষাও সজীব হইয়া উঠিয়াছে আমাদের জ্ঞানরাজ্যের চতুর্দিকে মানসিক বায়ুমণ্ডল এমনি করিয়া সৃজিত হয় আমাদের মন যখন সজীব ছিল না তখনই এই বায়ুমণ্ডলের অভাব আমরা তেমন করিয়া অনুভব করিতাম না, এখন আমাদের মানসপ্রাণ যতই সজীব হইয়া উঠিতেছে ততই এই বায়ুমণ্ডলের জন্য আমরা ব্যাকুল হইতেছি
একদিন আমাদিগকে জলমগ্ন ডুবুরির মতো ইংরাজি-সাহিত্যাকাশ হইতে নলে করিয়া হাওয়া আনাইতে হইত এখনো সে নল সম্পূর্ণ ত্যাগ করিতে পারি নাই কিন্তু অল্পে অল্পে আমাদের জীবনসঞ্চারের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চারিদিকে সেই বায়ুসঞ্চার আরম্ভ হইয়াছে আমাদের দেশীয় ভাষায় দেশীয় সাহিত্যের হাওয়া উঠিয়াছে
যতক্ষণ বাংলাদেশে সাহিত্যের সেই হাওয়া বহে নাই, সেই আন্দোলন উপস্থিত হয় নাই, যতক্ষণ বঙ্গসাহিত্য এক একটি স্বতন্ত্র সঙ্গিহীন প্রতিভাশিখর আশ্রয় করিয়া বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থিতি করিতেছিল, ততক্ষণ তাহার দাবি করিবার বিষয় বেশিকিছু ছিল না ততক্ষণ কেবল বলবান ব্যক্তিগণ তাহাকে নিজ বীর্যবলে নিজ বাহুযুগলের উপর ধারণপূর্বক পালন করিয়া আসিতেছিলেন এখন সে সাধারণের হৃদয়ের মধ্যে আসিয়া বাসস্থান স্থাপন করিয়াছে, এখন বাংলাদেশের সর্বত্রই সে অবাধ অধিকার প্রাপ্ত হইয়াছে এখন অন্তঃপুরেও সে পরিচিত আত্মীয়ের ন্যায় প্রবেশ করে এবং বিদ্বৎসভাতেও সে সমাদৃত অতিথির ন্যায় আসনপ্রাপ্ত হয় এখন যাহারা ইংরাজিতে শিক্ষালাভ করিয়াছেন তাঁহারা বাংলাভাষায় ভাবপ্রকাশ করাকে গৌরব জ্ঞান করেন; এখন অতিবড়ো বিলাতি বিদ্যাভিমানী ও বাংলা পাঠকদিগের নিকট খ্যাতি অর্জন করাকে আপন চেষ্টায় অযোগ্য বোধ করেন না
প্রথমে যখন ইংরাজি শিক্ষার প্রবাহ আমাদের সমাজে আসিয়া উপস্থিত হইল তখন কেবল বিলাতি বিদ্যার একটা বালির চর বাঁধিয়া দিয়াছিল; সে বালুকারাশি পরস্পর অসংসক্ত; তাহার উপরে না আমাদের স্থায়ী বাসস্থান নির্মাণ করা যায়, না তাহা সাধারণের প্রাণধারণযোগ্য শস্য উৎপাদন করিতে পারে অবশেষে তাহারই উপরে যখন বঙ্গসাহিত্যের পলিমৃত্তিকা পড়িল তখন যে কেবল দৃঢ় তট বাঁধিয়া গেল, তখন যে কেবল বাংলার বিচ্ছিন্ন মানবেরা এক হইবার উপক্রম করিল তাহা নহে, তখন বাংলা-হৃদযের চিরকালের খাদ্য এবং আশ্রয়ের উপায় হইল এখন এই জীবনশালিনী জীবনদায়িনী মাতৃভাষা সন্তান-সমাজে অধিকার প্রার্থনা করিতেছি
সেইজন্যই আজ উপযুক্ত কালে এক সময়োচিত আন্দোলন স্বতই উদ্ভূত হইয়াছে কথা উঠিয়াছে, আমাদের বিদ্যালয়ে অধিকতর পরিমাণে বাংলা শিক্ষা প্রচলিত হওয়া আবশ্যক
কেন আবশ্যক? কারণ, শিক্ষা দ্বারা আমাদের হৃদয়ে যে আকাক্সক্ষা, যে অভাবের সৃষ্টি হইয়াছে বাংলা ভাষা ব্যতীত তাহা পূরণ হইবার সম্ভাবনা নাই ইংরাজি শিখিয়া যদি কেবল সাহেবের চাকরি ও আপিসের কেরানিগিরি করিয়াই আমরা সন্তুষ্ট থাকিতাম তাহা হইলে কোনো কথাই ছিল না কিন্তু শিক্ষা আমাদের মনে যে কর্তব্যের আদর্শ স্থাপিত করিয়াছে তাহা লোকহিত জনসাধারণের নিকটে আপনাকে কর্মপাশে বন্ধ করিতে হইবে, সকলকে শিক্ষা বিতরণ করিতে হইবে, সকলকে ভাবরসে সরস করিতে হইবে, সকলকে জাতীয় বন্ধনে যুক্ত করিতে ইহবে
দেশীয় ভাষা ও দেশীয় সাহিত্যের অবলম্বন ব্যতীত এ কার্য কখনো সিদ্ধ হইবার নহে আমরা পরের হস্ত হইতে যাহা গ্রহণ করিয়াছি দান করিবার সময় নিজের হস্ত দিয়া তাহা বণ্টন করিতে হইবে
ইংরাজি শিক্ষার প্রভাবে, সর্বসাধারণের জন্য সঞ্চয় কর্তব্য পালন করিবার, যাহা লাভ করিয়াছি তাহা সাধারণের জন্য সঞ্চয় করিবার, যাহা সিদ্ধান্ত করিয়াছি তাহা সাধারণের সমক্ষে প্রমাণ করিবার, যাহা ভোগ করিতেছি তাহা সাধারণের মধ্যে বিতরণ করিবার আকাক্সক্ষা আমাদের মনে উত্তরোত্তর প্রবল হইয়া উঠিতেছে কিন্তু অদৃষ্টদোষে সেই আকাক্সক্ষা মিটাইবার উপায় এখনো আমাদের পক্ষে যথেষ্ট সুলভ হয় নাই আমরা ইংরাজি বিদ্যালয় হইতে উদ্দেশ্য শিক্ষা করিতেছি, কিন্তু উপায় লাভ করিতেছি না
 কেহ কেহ বলেন, বিদ্যালয়ে বাংলা প্রচলনের কোন আবশ্যক নাই কারণ এ পর্যন্ত ইংরাজী শিক্ষিত ব্যক্তিগণ নিজের অনুরাগেই বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টি করিয়াছেন, বাংলা শিখিবার জন্য তাঁহাদিগকে অতিমাত্র চেষ্টা করিতে হয় নাই
কিন্তু পূর্বেই বলিয়াছি, সময়ের পরিবর্তন হইয়াছে এখন কেবল ক্ষমতাশালী লেখকের উপর বাংলা সাহিত্য নির্ভর করিতেছে না, এখন তাহা সমস্ত শিক্ষিত সাধারণের সামগ্রী এখন প্রায় কোনো না কোন উপলক্ষে বাংলা ভাষায় ভাবপ্রকাশের জন্য শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেরই উপর সমাজের দাবি দেখা যায় কিন্তু সকলের শক্তি সমান সকলের পক্ষে সম্ভব নহে; অশিক্ষা ও অনভ্যাসের সমস্ত বাধা অতিক্রম করিয়া আপনার কর্তব্য পালন সকলের পক্ষে সম্ভব নহে এবং বাংলা অপেক্ষাকৃত অপরিণত ভাষা বলিয়াই তাহাকে কাজে লাগাইতে হইলে সবিশেষ শিক্ষা এবং নৈপুণ্যের আবশ্যক করে
এখন বাংলা খবরের কাগজ, মাসিক পত্র, সভা-সমিতি, আত্মীয় সমাজ, সর্বত্র হইতেই বঙ্গভূমি তাহার শিক্ষিত সন্তানদিগকে বঙ্গসাহিত্যের মধ্যে আহবান করিতেছে যাহারা প্রস্তুুত নহে, যাহারা অক্ষম, তাহারা কিছু না কিছু সংকোচ অনুভব করিতেছে অসাধারণ নির্লজ্জ না হইলে আজকাল বাংলাভাষার অজ্ঞতা লইয়া আষ্ফালন করিতে কেহ সাহস করে না এক্ষণে আমাদের বিদ্যালয় যদি ছাত্রদিগকে আমাদের বর্তমান আদর্শের উপযোগী না করিয়া তোলে, আমাদের সমাজের সর্বাঙ্গীণ হিতসাধনে সক্ষম না করে, যে বিদ্যা আমাদিগকে অর্পণ করে সঙ্গে সঙ্গে তাহার দানাধিকার যদি আমাদিগকে না দেয়, আমাদের পরমাত্মীয়দিগকে বুভুক্ষিত দেখিয়াও সে বিদ্যা পরিবেশন করিবার শক্তি যদি আমাদের না থাকে - তবে এমন বিদ্যালয় আমাদের বর্তমান কাল ও অবস্থার পক্ষে অত্যন্ত অসম্পূর্ণ তাহা স্বীকার করিতে হইবে
যেমন মাছ ধরিবার সময় দেখা যায়, অনেক মাছ যতক্ষণ বড়শিতে বিদ্ধ হইয়া জলে খেলাইতে থাকে ততক্ষণ তাহাকে ভারি মস্ত মনে হয়, কিন্তু ডাঙায় টান মারিয়া তুলিলেই প্রকাশ হইয়া পড়ে যত বড়োটা মনে করিয়াছিলাম তত বড়োটা নহে - যেমন রচনাকালে দেখা যায় একটা ভাব যতক্ষণ মনের মধ্যে অস্ফুট অপরিণত আকারে থাকে ততক্ষণ সেটাকে অত্যন্ত বিপুল এবং নূতন মনে হয়, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করিতে গেলেই তাহা দুটো কথায় শেষ হইয়া যায় এবং তাহার নূতনত্বের উজ্জ্বলতাও দেখিতে পাওয়া যায় না - যেমন স্বপ্নে অনেক ব্যাপারকে অপরিসীম বিস্ময়জনক এবং বৃহৎ মনে হয়, কিন্তু জাগরণ মাত্রেই তাহা তুচ্ছ এবং ক্ষুদ্র আকার ধারণ করে - তেমনি পরের শিক্ষাকে যতক্ষণ নিজের ডাঙায় না টানিয়া তোলা যায় ততক্ষণ আমরা বুঝিতেই পারি না বাস্তবিক কতখানি আমরা পাইয়াছি আমাদের অধিকাংশ বিদ্যাই বঢ়শিগাঁথা মাছের মতো ইংরাজি ভাষার সুগভীর সরোবরে মধ্যে খেলাইয়া বেড়াইতেছে, আন্দাজে তাহার গুরুত্ব নির্ণয় করিয়া খুব পুলকিত গর্বিত হইয়া উঠিয়াছি যদি বঙ্গভাষার কুলে একবার টানিয়া তুলিতে পারিতাম তাহা হইলে সম্ভবত নিজের বিদ্যাটাকে তত বেশি বড়ো না দেখাইতেও পারিত; নাই দেখাক, তবু সেটা ভোগে লাগিত এবং আয়তনে ছোট হইলে আমাদের কল্যাণরূপিণী গৃহলক্ষ্মীর স্বহস্তকৃত রন্ধনে, অমিশ্র অনুরাগ এবং বিশুদ্ধ সর্ষপতৈল সহযোগে পরম উপাদেয় হইতে পারিত
হিমালয়ের মাথার উপরে যদি উত্তরোত্তর কেবলই বরফ জমিতে থাকিত তবে ক্রমে তাহা অতি বিপর্যয় অদ্ভূত এবং পতনোন্মুখ উচ্চতা লাভ করিত এবং তাহা না দেবায় না ধর্মায় হইত কিন্তু সেই বরফ নির্ঝররূপে গলিয়া প্রবাহিত হইলে হিমালয়েরও অনাবশ্যক ভার লাঘব হয় এবং সেই সজীব ধারায় সুদূরপ্রসারিত তৃষাতুর ভূমি সরস শস্যশালী হইয়া উঠে ইংরাজি বিদ্যা যতক্ষণ বদ্ধ থাকে ততক্ষণ তাহা সেই জড় নিশ্চল বরফ-ভাবের মতো; দেশীয় সাহিত্যযোগে তাহা বিগলিত প্রবাহিত হইলে তবে সেই বিদ্যারও সার্থকতা হয়, বাঙালির ছেলের মাতারও ঠিক থাকে এবং স্বদেশের তৃষ্ণাও নিবারিত হয় অবরুদ্ধ ভাবগুলি অনেকের মধ্যে ছাড়াইয়া গিয়া তাঁহার আতিশয্য বিকার দূর হইতে থাকে সে সকল ইংরাজি ভাব যথার্থরূপে আমাদের দেশের লোক গ্রহণ করিতে পারে, অর্থাৎ যাহা বিশেষরূপে ইংরাজি নহে, যাহা সার্বভৌমিক, তাহাই থাকিয়া যায় এবং বাকি সমস্ত নষ্ট হইতে থাকে আমাদের মধ্যে একটা মানসিক প্রবাহ উৎপন্ন হয়, সাধারণের মধ্যে একটা আদর্শের এবং আনন্দের ঐক্য জাগিয়া ওঠে, বিদ্যার পরীক্ষা হয়, ভাবের আদান-প্রদান চলে, ছাত্রগণ বিদ্যালয়ে যাহা শেখে বাড়িতে আসিয়া তাহার অনুবৃত্তি দেখিতে পায় এবং বয়স্ক সমাজে প্রবেশ করিবার সময় বিদ্যাভারকে বিদ্যালয়ের বহির্দ্বারে ফেলিয়া আসা আবশ্যক হয় না এই যে স্কুলের সহিত গৃহের সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ, ছাত্রবয়সের সহিত কর্মকালের সম্পূর্ণ ব্যবধান, নিজের সহিত আত্মীয়ের সম্পূর্ণ ভিন্ন শিক্ষা, এরূপ অস্বাভাবিক অবস্থা দূর হইয়া যায়, দেশীয় সাহিত্যের সংযোজনী শক্তি প্রভাবে বাঙালি আপনার মধ্যে আপনি ঐক্যলাভ করে - তাহার শিক্ষাও সম্পূর্ণ হইতে পারে, তাহার জীবনও সফলতাপ্রাপ্ত হয়
কিন্তু এখনো আমাদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যাঁহারা বাঙালি ছাত্রদিগকে অধিকতর পরিমাণে বাংলা শিখাইবার আবশ্যকতা অনুভব করেন না, এমনকি সে প্রস্তাবের প্রতিবাদ করেন যদি তাঁহাদিগকে স্পষ্ট করিয়া জিজ্ঞাস করা যায় যে, আমরা যে দেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছি সেই দেশের ভাষায় আমাদের নবলব্ধ জ্ঞান বিস্তার করিবার, আমাদের নবজাত ভাব প্রকাশ করিবার ক্ষমতা নূন্যাধিক পরিমাণে আমাদের উচিত কি-না, তাহারা উত্তর দেন, ‘উচিত’; কিন্তু তাঁহাদের মতে, সেজন্য বিশেষরূপে প্রস্তুত হইবার আবশ্যকতা নাই তাঁহারা বলেন, ইচ্ছা করিলেই বাঙালির ছেলেমাত্রই বাংলা শিখিতে ও লিখিতে পারে
কিন্তু ইচ্ছা জন্মিবে কেন? সকলেই জানেন, পরিচয়ের পর যে সকল বিষয়ের প্রতি আমাদের পরম অনুরাগ জন্মিয়া থাকে পরিচয় হইবার পূর্বে তাহাদের প্রতি অনেক সময় আমাদের বৈমুখভাব অসম্ভব নহে অনুরাগ জন্মিবার একটা অবসর দেওয়াও কর্তব্য এবং পূর্ব হইতে পথকে কিয়ৎপরিমাণেও সুগম করিয়া রাখিলে কর্তব্যবুদ্ধি সহজেই তদভিমুখে ধাবিত হইতে পারে সন্মুখে একেবারে অনভ্যস্ত পথ দেখিলে কর্তব্য ইচ্ছা স্বভাবতই উদবোধিত হইতে চাহে না
কিন্তু বৃথা এ সকল যুক্তি প্রয়োগ করা আমাদের মধ্যে এমন একদল লোক আছেন বাংলার প্রতি যাঁহাদের অনুরাগ রুচি এবং শ্রদ্ধা নাই, তাহাদিগকে যেমন করিয়া যেদিকে ফিরানো যায় তাঁহাদের কম্পাসের কাঁটা ইংরাজির দিকেই ঘুরিয়া বসে তাঁহারা অনেকে ইংরাজি আহার এবং পরিচ্ছদকে বিজাতীয় বলিয়া ঘৃণা করেন; তাঁহারা আমাদের জাতির বাহ্য শরীরকে বিলাতী অশনবসনের সহিত সংসক্ত দেখিতে চাহেন না; কিন্তু সমস্ত জাতির মনঃ শরীরকে বিদেশীর ভাষার পরিচ্ছদে মণ্ডিত এবং বিজাতীয় সাহিত্যের আহার্যে পরিবর্ধিত দেখিতে তাঁহাদের আক্ষেপ বোধ হয় না শরীরের সহিত বস্ত্র তেমন করিয়া সংলিপ্ত হয় না মনের সহিত ভাষা যেমন করিয়া জড়িত হইয়া যায় যাঁহারা আপন সন্তানকে তাহার মাতৃভাষা শিখিবার অবসর দেন না, যাঁহারা পরমাত্মীয়দিগকেও ইংরাজি ভাষায় পত্র লিখিতে লজ্জাবোধ করেন না, যাঁহারা পদ্মবনে মত্তকরীসমবাংলা ভাষার বানান এবং ব্যাকরণ ক্রীড়াচ্ছলে পদদলিত করিতে পারেন অথচ ভ্রমক্রমে ইংরাজি ফোঁটা অথবা মাত্রার বিচ্যুতি ঘটিলে ধরণীকে দ্বিধা হইতে বলেন, যাঁহাদিগকে বাংলায় হস্তিমূর্খ বলিলে অবিচলিত থাকেন, কিন্তু ইংরাজিতে ইগ্লোরেন্ট বলিলে মূর্ছাপ্রাপ্ত হন, তাঁহাদিগকে এ কথা বুঝানো কঠিন যে, তাঁহারা ইংরাজি শিক্ষার সন্তোষজনক পরিণাম নহেন
কিন্তু ইংরাজি অভিমানী মাতৃভাষাদ্বেষী বাঙালির ছেলেকে আমরা দোষ দিতে চাহি না ইংরাজির প্রতি এই উৎকট পক্ষপাত স্বাভাবিক কারণ, ইংরাজি ভাষাটা একে রাজার ঘরের মেয়ে, তাহাতে আবার তিনি আমাদের দ্বিতীয় পক্ষের সংসার, তাঁহার আদর যে অত্যন্ত বেশি হইবে তাহাতে বিচিত্র নাই তাঁহার যেমন রূপ তেমনি ঐশ্বর্য, আবার তাঁহার সম্পর্কে আমাদের রাজপুত্রদের ঘরেও আমরা কিঞ্চিৎ সম্মানের প্রত্যাশা রাখি সকলেই অবগত আছেন ইহার প্রসাদে উক্ত যুবরাজদের প্রাসাদ দ্বারপ্রান্তে আমরা কখনো কখনো স্থান পাইয়া থাকি, আবার কখনো কর্ণপীড়নও লাভ হয় - সেটাকে আমরা পরিহাসের স্বরূপ উড়াইয়া দিবার চেষ্টা করি, কিন্তু চক্ষু দিয়া অশ্রধারা বিগলিত হইয়া পড়ে
আর, আমাদের হতভাগিনী প্রথম পক্ষটি, আমাদের দরিদ্র বাংলা ভাষা, পাকশালার কাজ করেন - সে কাজটি নিতান্ত সামান্য নহে, তেমন আবশ্যক কাজ আর আমাদের আছে কিনা সন্দেহ, কিন্তু তাঁহাকে আমাদের আপনার বলিয়া পরিচয় দিতে লজ্জা করে পাছে তাঁহার মলিন বসন লইয়া তিনি আমাদের ধনশালী নবকুটুম্বদের চক্ষে পড়েন এইজন্য তাঁহাকে গোপন করিয়া রাখি; প্রশ্ন করিলে বলি, চিনি না
সে দরিদ্রঘরের মেয়ে তাহার বাপের রাজত্ব নাই সে সম্মান দিতে পারে না, সে কেবল মাত্র ভালোবাসা দিতে পারে তাহাকে যে ভালবাসে তাহার পদবৃদ্ধি হয় না, তাহার বেতনের আশা থাকে না, রাজদ্বারে তাহার কোনো পরিছয় প্রতিপত্তি নাই কেবল যে অনাথাকে সে ভালোবাসে সেই তাহাকে গোপনে ভালোবাসার পূর্ণ প্রতিদান দেয় এবং সেই ভালোবাসার যথার্থ স্বাদ যে পাইয়াছে সে জানে যে, পদমান-প্রতিপত্তি এই প্রেমের নিকট তুচ্ছ
রূপকথায় যেমন শুনা যায় এক্ষেত্রেও সেইরূপ দেখিতেছি; আমাদের ঘরের এই নূতন রানী সুয়োরানী নিষ্ফল, বন্ধ্যা এতকাল এত যতেœ এত সম্মানে সে মহিষী হইয়া আছে, কিন্তু তাহার গর্ভে আমাদের একটি সন্তান জন্মিল না তাহার দ্বারা আমাদের কোনো সজীব ভাব আমরা প্রকাশ করিতে পারিলাম না একেবারে বন্ধ্যা যদি বা না হয় তাহাকে মৃতবৎসা বলিতে পারি, কারণ প্রথম প্রথম গোটাকতক কবিতা এবং স¤প্রতি অনেকগুলো প্রবন্ধ জন্মলাভ করিয়াছে, কিন্তু সংবাদপত্র শয্যাতেই তাহারা ভূমিষ্ঠ হয় এবং সংবাদপত্ররাশির মধ্যেই তাহাদের সমাধি
আর, আমাদের দুয়োরানীর ঘরে আমাদের দেশের সাহিত্য, আমাদের দেশের ভারী আশা-ভরসা, আমাদের হতভাগ্য দেশের একমাত্র স্থায়ী গৌরব জন্মগ্রহণ করিয়াছে এই শিশুটাকে আমরা বড়ো একটা আদর করি না, ইহাকে প্রাঙ্গণের প্রান্তে ফেলিয়া রাখি এবং সমালোচনা করিবার সময় বলি, ‘ছেলেটার শ্রী দেখো! ইহার না আছে বসন, না আছে ভূষণ- ইহার সর্বাঙ্গেই ধুলা!ভালো, তাই মানিলাম ইহার বসন নাই, ভূষণ নাই, কিন্তু ইহার জীবন আছে এ প্রতিদিন বাড়িয়া উঠিতে থাকিবে এ মানুষ হইবে এবং সকলকে মানুষ করিবে আর আমাদের ওই সুয়োরানীর মৃত সন্তানগুলিকে বসনে-ভূষণে আচ্ছন্ন করিয়া যতই হাতে-হাতে কোলে-কোলে নাচাইয়া বেড়াইয়া বেড়াই না কেন, কিছুতেই উহাদের মধ্যে জীবনসঞ্চার করিতে পারিব না
আজ আমরা একথা বলিয়া অলীক গর্ব করিতে পারিব না যে, আমাদের অদ্যকার তরুণ বঙ্গসাহিত্য পৃথিবীর ঐশ্বর্যশালী বয়স্ক সাহিত্যসমাজে স্থান পাইবার অধিকারী হইয়াছে বঙ্গসাহিত্যের যশস্বিবৃন্দের সংখ্যা অত্যল্প, আজিও বঙ্গসাহিত্যের আদরণীয় গ্রন্থ গণনায় যৎসামান্য, একথা স্বীকার করি কিন্তু স্বীকার করিয়াও তথাপি বঙ্গসাহিত্যকে ক্ষুদ্র মনে হয় না সে কি কেবল অনুরাগের অন্ধ মোহবশত? তাহা নহে আমাদের বঙ্গসাহিত্যে এমন একটি সময় আসিয়াছে যখন সে আপন ভাবী সম্ভাবনাকে আপনি সচেতনভাবে অনুভব করিতেছে এইজন্য বর্তমান প্রত্যক্ষ ফল তুচ্ছ হইলেও সে আপনাকে অবহেলাযোগ্য বলিয়া মনে করিতে পারিতেছে না বসন্তের প্রথম অভ্যাগমে যখন বনভূমিতলে নবাঙ্কুর এবং তরুশাখায় নবকিশলয়ের প্রচুর উদগম অনারধ্ব আছে, যখন বনশ্রী আপন অপরিসীম পুষ্পেশ্বর্যের সম্পূর্ণ পরিচয় দিবার অবসরপ্রাপ্ত হয় নাই, তখনো সে যেমন আপন অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে শিরায়-উপশিরায় এক নিগুঢ় জীবনসঞ্চার, এক বিপুল ভারী মহিমা উপলব্ধি করিয়া আসন্ন যৌবনগর্বে সহসা উৎফুল্ল হইয়া উঠে - সেইরূপ আজ বঙ্গসাহিত্য আপন অন্তরের মধ্যে এক নূতন প্রাণশক্তি, এক বৃহৎ বিশ্বাসের পুলক অনুভব করিয়াছে; সমস্ত বঙ্গহৃদয়ের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষার আন্দোলনে সে আপনার নাড়ীর মধ্যে উপলব্ধি করিতেছে; সে জানিতে পারিয়াছে সমস্ত বাঙালির অন্তর-অন্তঃপুরের মধ্যে তাহার স্থান হইয়াছে, এখন সে ভিখারিণীবেশে কেবল ক্ষমতাশালীর দ্বারে দাঁড়াইয়া নাই, তাহার আপন গৌরবের প্রাসাদে তাহার অক্ষুণœ অধিকার প্রতিদিন বিস্তৃত এবং দৃঢ় হইতে চলিয়াছে এখন হইতে সে শয়নে-স্বপনে সুখে-দুঃখে-সম্পদে-বিপদে সমস্ত বাঙালির ...
গৃহিণী সচিবঃ সখী মিথঃ
প্রিয়শিষ্যা ললিতে কলাবিধৌ।। ৫২
সেদিনকার উচ্চশিক্ষার নামে গর্বিত ও আত্মভিমানীরা মাতৃভাষা বাংলাকে কখনো শিক্ষিতজনের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এ মানসিকতা ছিলো না তিনি বিশ্বাস করতেন-
ইংরেজি কোন উপায়েই আমাদের সাধারণ ভাষা হইতে পারে না কারণ তাহা অত্যন্ত উৎকট বিদেশী এবং যে সকল ভাষার ভিত্তি বহু সহস্র বৎসরের প্রাচীন এবং মহৎ সংস্কৃত বাণীর মধ্যে নিহিত এবং যে সকল ভাষা বহু সহস্র বৎসরের পুরাতন কাব্য দর্শন সমাজরীতি ও ধর্মনীতি হইতে বিচিত্র রস আকর্ষণ করিয়া লইয়া নরনারীর হৃদয়কে বিবিধরূপে সজল সফল শস্যশ্যামল করিয়া রাখিয়াছে, তাহা কখনোই মরিবার নহে৫৩
বাংলা ভাষা অন্যকথায় বলা যায় মাতৃভাষা বাংলা প্রশ্নে রবীন্দ্র মানসে কোনো খণ্ডিত রেখা বা সীমাবদ্ধতা ছিলো না ইংরেজ আমাদের অনেক ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি ও সবচেয়ে বড়ো শত্রতা করেছে শিকল টেনে বাংলাদেশকে বিভক্ত কের আজকের বাংলাদেশ ইংরেজের শিকলটানা খণ্ডিত বাংলাদেশ এই শিকল টেনে খণ্ডিত করার ফল এতোদিনে আমরা  ভোগ করতেছি আমাদের আজ ভাষাবিচ্ছেদ হয়েছে, জাতি বিচ্ছেদ হয়েছে, আমাদের আত্মিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসে ফাঁটল ধরেছে-শত্রতা ও সা¤প্রদায়িকতা বেড়েছে ভাইয়ের বুকে ভাই ছুরি মেরেছে সন্ত্রাসী ও সা¤প্রদায়িকতার উন্মত্ততায় আমরা রক্তের হোলি উৎসব করেছি
পাকিস্তান আমলে এই শত্রতা, সা¤প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা আরো বেশি চরম ও উৎকট রূপ লাভ করেছে রবীন্দ্রনাথ অতীব সূক্ষ্ম ও দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখেছিলেন এর মূলে রয়েছে ভাষা বিচ্ছেদ চর্যাপদের ভাষা নিয়ে যে এতো বিতর্ক ও সমস্যা এর মূলেও এই ভাষা বিচ্ছেদ ইংরেজের শিকল টানা বাংলাদেশের বৃত্তে আবদ্ধ বলেই আজ আমাদের ভাষা সমস্য ও জাতিগত সমস্যা এবং আমাদের ভাষা ও জাতিসত্তা নিয়ে এতো বিতর্ক
আমাদের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা চেতনা এবং সাধনা ও ব্রত বাঙালির স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যকে উজ্জ্বল ও ভাস্বর করে তোলা এর অর্থ এই নয় যে, আমরা আল তুলে প্রাচীর বেঁধে অচলায়তনে বন্দি হয়ে থাকবো মহৎ ভাব সম্পদ, চিন্তাচেতনা ও মাল-মসলা এবং উপকরণের জন্য আমরা সমগ্র বিশ্বের কাছেই হাত পাতবো- তবে পরের কাছ থেকে যা নেবো তা আত্মস্থ করে ও হজম করে নেবো অর্থাৎ আমাদের দৃষ্টি থাকবে আকাশের দিকে, সমগ্র বিশ্বের দিকে কিন্তু আমাদের পা থাকবে দেশের মাটিতে আমাদের শিকড়সন্ধানী হতে হবে এবং আমাদের উৎসের ও স্বরূপের সন্ধান করতে হবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বিশেষত বাংলা কবিতার আদি নিদর্শনেই আমাদের পরিচয়ের উজ্জ্বল অভিজ্ঞান ১৯৭১ সনে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ে আমরা আমাদের আত্মপরিচয় নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মাটিতে গর্বের সাথে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু আমাদের পরিচয় একাত্তর থেকেই নয়-আমাদের পরিচয় সে সুপ্রাচীনকাল থেকেই আমাদের পরিচয় চর্যাপদে নাথ সাহিত্যে, পদাবলী লোক সাহিত্যে, গাঁথা-পুঁথি সাহিত্যে, বাউল ও মারফতী সাহিত্যে
আমাদের প্রকৃত পরিচয় পাহাড়পুর ও ময়নামতিতে, মহাস্থানগড়ে এবং বরেন্দ্র ও সমতটে আমাদের পরিচয় মঠ বিহারে মন্দিরে ও মসজিদে এসব থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলা কবিতার ইতিহাস এবং বাঙালিত্ব ও বাঙালির পরিচয় হতে পারে না এবং আমাদের ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস রচনাও সম্ভব নয়
আমাদের যতোদিন পর্যন্ত চর্যাপদ ও নাথ সাহিত্য, পদাবলী ও মরমী সাহিত্য, গাঁথা ও পুঁথি সাহিত্য, বাউ ও মারফতী থাকবে এবং যতোদিন পর্যন্ত আমাদের মীন নাথ ও ভুসুক থাকবে, সত্যপীর, পাঁচপীর ও খোয়াজ খিজির থাকবে, যতোদিন পর্যন্ত শাহসগীর, আলাওল, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস থাকবে, লালন ও হাছনরাজা থাকবে, যতোদিন পর্যন্ত মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও শামসুর রহমান থাকবে এবং যতোদিন পর্যন্ত আমাদের জয়নুল ও কামরুল থাকবে ততোদিন পর্যন্ত আমাদের পরিচয়কে কেউই ম্লান করতে পারবে না বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বাংলা কবিতা আমাদের এ পরিচয়কে ও আমাদের সংস্কৃতিকে স্বাতন্ত্র্যকেই উজ্জ্বল ও দীপান্বিত করে তুলেছে৫৪
বাঙলা ও বাঙালি এবং ভাষা ও জাতিসত্তায় রবীন্দ্রনাথের কোনো সংকীর্ণতা ছিলো না বলেই তিনি গেয়েছেন-
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল-
পূণ্য হউক, পূণ্য হউক, পূণ্য হউক হে ভগবান।।
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ-
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান।।
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির বাষা-
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।।
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন-
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।।
এই এক হওয়া থেকে- এই ঐক্য থেকে সুচতুর ইংরেজ ধূর্ততামীর মাধ্যমে আমাদের শুধু পৃথকই করেনি শত্রতাও সৃষ্টি করেছে ভাষা বিচ্ছেদের মাধ্যমে আমি প্রবন্ধের আরো কিছু অংশ তুলে ধরেছি-
উড়িষ্যা এবং আসামে বাংলাশিক্ষা যেরূপ সবেগে ব্যাপ্ত হইতেছিল, বাধা না পাইলে বাংলার এই দুই উপরিভাগ ভাষার সামান্য অন্তরালটুকু ভাঙিয়া একদিন একগৃহবর্তী হইতে পারিত
সামান্য অন্তরাল এইজন্যই বলিতেছি যে, বাংলা ভাষার সহিত আসামি ও উড়িষ্যার যে প্রভেদ সে প্রভেদ সূত্রে পরস্পর ভিন্ন হইবার কোনো কারণ দেখা যায় না উক্ত দুই ভাষা চট্টগ্রামের ভাষা অপেক্ষা বাংলা হইতে স্বতন্ত্র নহে বীরভূমের কথিত ভাষার সহিত ঢাকার কথিত ভাষার যে প্রভেদ, বাংলার সহিত আসামির প্রভেদ তাহা অপেক্ষা খুব বেশি নহে
কিন্তু যদিচ একীকরণ ইংরেজ রাজত্বের স্বাভাবিক গতি, তথাপি দুর্ভাগ্যক্রমে ভেদনীতি ইংরেজের রাজকৌশল সেই নীতি অবলম্বন করিয়া তাঁহারা আমাদের ভাষার ব্যবধানকে পূর্বাপেক্ষা স্থায়ী ও দৃঢ় করিবার চেষ্টায় আছেন তাঁহারা বাংলাকে আসাম ও উড়িষ্যা হইতে যথাসম্ভব নির্বাধিত করিয়া স্থানীয় ভাষাগুলিকে কৃত্রিম উত্তেজনায় পরিপুষ্ট করিয়া তুলিতে প্রবৃত্ত
স্থানীয় চাকরি পাওয়া সম্বন্ধে রাজপুরুষেরা বাঙালির বিরুদ্ধে যে গণ্ডি টানিয়া দিয়াছেন এবং সেই সূত্রে বেহারি প্রভৃতি বঙ্গশাখীদের সহিত বাঙালির যে একটি ঈর্ষার সম্বন্ধ দাঁড় করাইয়াছেন, তাহা আমরা স্বল্প অশুভেরই কারণ মনে করি; কিন্তু ভাষার ঐক্য যাহা নিত্য, যাহা সুগভীর, যাহা আমাদের এই বিচ্ছিন্ন দেশের একমাত্র মুক্তির কারণ, তাহাকে আপন রাজশক্তির দ্বারা পরাহত করিয়া ইংরেজ আমাদের নিরুপায় দেশকে চিরদিনের মতো ভাঙিয়া রাখিতেছেন
ইংরেজি ভাষা কোনো উপায়েই আমাদের দেশের সাধারণ ভাষা হইতে পারে না কারণ, তাহা অত্যন্ত উৎকট বিদেশী এবং যে সকল ভাষার ভিত্তি বহুসহস্র বৎসরের প্রাচীন ও মহৎ সংস্কৃত বাণীর মধ্যে নিহিত, এবং যে সকল ভাষা বহুসহস্র বৎসরের পুরাতন কাব্য দর্শন সমাজরীতি ও ধর্মনীতি হইতে বিচিত্র রস আকর্ষণ করিয়া লইয়া নরনারীর হৃদয়কে বিবিধরূপে সজল সফল শস্যশ্যামল করিয়া রাখিয়াছে, তাহা কখনোই মরিবার নহে
কিন্তু সেই সংস্কৃতমূলক ভাষা রাজনৈতিক ও অন্যান্য নানাপ্রকার বাধায় শতধা বিচ্ছিন্ন হইয়া স্বতন্ত্র স্থানে স্বতন্ত্ররূপে বাড়িয়া উঠিতেছিল তাহাদের মধ্যে শক্তিপরীক্ষা ও যোগ্যতমের প্রচেষ্টার অবসর হয় নাই
এক্ষণে সেই অবসরের সূত্রপাত হইয়াছিল এবং আমরা সাহস করিয়া বলিতে পারি, ভাষা সম্বন্ধে ভারতবর্ষে যদি প্রাকৃতিক নির্বাচনের স্বাধীন হস্ত থাকে তবে বাংলাভাষার পরাভবের কোনো আশঙ্কা নাই
প্রথমত, বাঙালি ভাষীর জনসংখ্যা ভারতবর্ষের অপরভাষীর তুলনায় অধিক প্রায় পাঁচ কোটি লোক বাংলা বলে
কিন্তু আপন সাহিত্যের মধ্যে বাংলা যে প্রতিষ্ঠা লাভ করিতেছে তাহাতেই তাহার অমরতা সূচনা করে
এক্ষণে ভারতবর্ষে বাংলা ছাড়া বোধ হয় এমন কোনো ভাষাই নাই, যে ভাষার আধুনিক সাহিত্যে ইংরেজি শিক্ষিত এবং ইংরেজি অনভিজ্ঞ উভয় স¤প্রদাযেরই সজাগ ঔৎসুক্য অন্যত্র শিক্ষিত ব্যক্তিরা জনসাধারণকে শিক্ষাদানের জন্যই দেশীয় ভাষা প্রধানত অবলম্বনীয় জ্ঞান করেন, - কিন্তু তাঁহাদের মনের শ্রেষ্ঠভাব ও নূতন উদ্ভাবন সকলকে তাঁহারা ইংরেজি ভাষায় রক্ষা করিতে ব্যগ্র
বাংলাদেশে ইংরেজিতে প্রবন্ধ রচনার প্রয়াস প্রায় তিরোধান করিয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হয় না ইংরেজি বিশ্ববিদ্যালয় হইতে উত্তীর্ণ যে সকল ছাত্রের রচনা করিবার স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে, বাংলা সাহিত্য অনতিবিলম্বে তাঁহাদিগকে আকর্ষণ করিয়া লইতে পারে, আমাদের সাহিত্য এমন একটি সবেগতা, এমন একটি প্রবলতা লাভ করিয়াছে চতুর্দিকে জীবনদান এবং জীবনগ্রহণ করিবার শক্তি ইহার জন্মিয়াছে ইহার দেশপরিধি যত বাড়িবে ইহার জীবনীশক্তিও তত বিপুলতর হইয়া উঠিবে এবং বেগবান বৃহৎ নদী যেমন যে দেম দিয়া যায় সে দেশ স্বাস্থ্যে সৌন্দর্যে বাণিজ্যে ও ধনে-ধান্যে ধন্য হইয়া উঠে, তেমনই ভারতবর্ষে যতদূর পর্যন্ত বাংলা ভাষার ব্যাপ্তি হইবে ততদূর পর্যন্ত একটা মানসিক জীবনের প্রবাহ প্রবাহিত হইয়া দুই উপকূলকে নিত্য নব নব ভাবসম্পদে ঐশ্বর্যশালী করিয়া তুলিবে
সেইজন্য বলিতেছিলাম, আসাম ও উড়িষ্যার বাংলা যদি লিখনপঠনের ভাষা হয় তবে তাহা যেমন বাংলা সাহিত্যের পক্ষে শুভজনক হইবে তেমনই সেই দেশের পক্ষেও
কিন্তু ইংরেজের কৃত্রিম উৎসাহে বাংলার এই দুই উপকণ্ঠবিভাগের একদল শিক্ষিত যুবক বাংলা প্রচলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহধ্বজা তুলিয়া স্থানীয় ভাষার জয়কীর্তন করিতেছেন
একথা আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, দেশীয় ভাষা আমাদের রাজভাষা নহে, আসামির সহিত হিন্দুস্থানির আর কোনো সাদৃশ্য নাই এবং তাহার সমস্ত সাদৃশ্যই বাংলার সহিত
যাহাই হউক, যে ভাষা ভ্রাতাদের মধ্যে অবাধ ভাবপ্রবাহ সঞ্চারের জন্য হওয়া উচিত, তাহাকেই প্রাদেশিক অভিমান ও বৈদেশিক উত্তেজনায় পরস্পরের মধ্যে ব্যবধানের প্রাচীনস্বরূপে দৃঢ় ও উচ্চ করিয়া তুলিবার যে চেষ্টা তাহাকে স্বদেশহিতৈষিতার লক্ষণ বলা যায় না এবং তাহা সর্বতোভাবে অশুভকর৫৫

তিন
আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষার মাধ্যমে মাতৃভাষা প্রসঙ্গে শিক্ষা সমস্যারবীন্দ্রনাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ শিক্ষায় যান্ত্রিকতা রবীন্দ্রনাথ কখনো পছন্দ করতেন না যান্ত্রিক শিক্ষায় ছাঁদে ঢাকা মানুষ কখনো মানুষ হয়ে উঠতে পারে না অথচ আমাদের শিক্ষা একান্তভাবেই যান্ত্রিক আমাদের স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় যেনো এ ধরনের একটা কল বা কারখানা মাত্র কল বা কারখানা থেকে যেমন একই ছাঁচে জিনিস বের হয়; চৈচিত্র্য নেই - আমাদের ছাত্রছাত্রীরাই ঠিক তাই রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য-
ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দিবার কল মাষ্টার এই কারখানার একটা অংশ সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে কল চলিতে আরম্ভ হয় মাষ্টারের মুখ চলিতে থাকে চারটেয় সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাষ্টার করও তখন মুখ বন্ধ করেন, ছাত্ররা দুই-চার পাত কলে-ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে তার পর পরীক্ষার সময় এই বিদ্যার যাচাই হইয়া তাহার উপরে মার্কা পড়িয়া যায়৫৬
ইউরোপের বিদ্যালয় থেকে যে সৃজনশীল মানুষ বের হচ্ছে এর মূল কারণ সেখানকার শিক্ষার সাথে মাটি ও পরিবেশ এবং দেশজ আবহের একটা সম্পৃক্ততা আছে তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
মানুষ সমাজের ভিতরে থাকিয়া মানুষ হইতেছে, ইস্কুল তাহার কথঞ্চিৎ সাহায্য করিতেছে লোকে যে বিদ্যালাভ করে সে বিদ্যাটা সেখানকার মানুষ হইতে বিচ্ছিন্ন নহে, সেইখানেই তাহার চর্চা হইতেছে, সেইখানেই তাহার বিকাশ হইতেছে, সমাজের মেধ্য নানা আকারে নানাভাবে তাহার বিকাশ হইতেছে, সমাজের মধ্যে নানা আকারে নানাভাবে তাহার সঞ্চার হইতেছে, লেখাপড়ায় কথাবার্তায় কাজে-কর্মে তাহা অহরহ প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিতেছে সেখানে জনসমাজ যাহা কালে কালে নানা ঘটনায় নানা লোকের দ্বারায় লাভ করিয়াছে, সঞ্চয় করিয়াছে এবং ভোগ করিতেছে, তাহাই বিদ্যালয়ের ভিতর দিয়া বালকদিগকে পরিবেশনের একটা উপায় করিয়াছে মাত্র
এইজন্য সেখানকার বিদ্যালয় সমাজের সঙ্গে মিশিয়া আছে, তাহা সমাজের মাটি হইতেই রস টানিতেছে এবং সমাজকেই ফলদান করিতেছে
কিন্তু বিদ্যালয় যেখানে চারিদিকের সমাজের সঙ্গে এমন এক হইয়া মিশিতে পারে নাই-যাহা বাহির হইতে সমাজের উপর চাপাইয়া দেওয়া তাহা শুষ্ক, তাহা নির্জীব, তাহার কাছ হইতে যাতা পাই তাহা কষ্টে পাই, এবং সে বিদ্যা প্রয়োগ করিবার বেলা কোনো সুবিধা করিয়া উঠিতে পারে না দশটা হইতে চারটে পর্যন্ত যাহা মুখস্থ করি, জীবনের সঙ্গে, চারিদিকের মানুষের সঙ্গে, ঘরের সঙ্গে, তাহার মিল দেখিতে পাই না বাড়িতে বাপ মা ভাই বন্ধুরা যাহা আলোচনা করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার সঙ্গে তাহার যোগ নাই, বরঞ্চ অনেক সময়ে বিরোধ আছে এমন অবস্থায় বিদ্যালয় একটা এঞ্জিনমাত্র হইয়া থাকে, তাহা বস্তু জোগায়, প্রাণ জোগায় না৫৭
বিলাতের শিক্ষা আর আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ আলাদা বিলাতের নজির দিয়ে ঐ ছাঁচে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি হতে পারে না
বিলাতের ইতিহাস, বিলাতের সমাজ আমাদের নহে আমাদের দেশের লোকের মনকে কোন আদর্শ বহুদিন মুগ্ধ করিয়াছে, আমাদের দেশের হৃদয়ে রস সঞ্চার হয় কিসে তাহা ভালো করিয়া বুঝিতে হইবে আমরা ইংরেজি স্কুলে পড়িয়াছি, যেদিকে তাকাই ইংরেজের দৃষ্টান্ত আমাদের চোখের সামনে প্রত্যক্ষ ইহার আড়ালে, আমাদের দেশের ইতিহাস, আমাদের স্বজাতির হৃদয়, অস্পষ্ট হইয়া আছে আমরা ন্যাশনাল পতাকাটাকে উচ্চে তুলিয়া যখন স্বাধীন চেষ্টায় কাজ করিব বলিয়া কোমর বাঁধিয়া বসি তখনও বিলাতের বেড়ি কোমরবন্ধ হইয়া আমাদিগকে বাঁধিয়া ফেলে, আমাদিগকে নজিরের বাহিরে নড়িতে দেয় না৫৮
রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য শিক্ষা বা ইউরোপীয় শিক্ষার প্রতি কটাক্ষ করেননি কিন্তু আমাদের শিক্ষা যে এতদিন মাটি, মানুষ ও জীবনের অনুষঙ্গ ছিলো একথা তিনি বার বার বলেছেন-
আশ্রমে যাঁহারা বাস করিতেন তাঁহারা গৃহী ছিরেন এবং শিষ্যগণ সন্তানের মতো তাঁহাদের সেবা করিয়া তাঁহাদের নিকট হইতে বিদ্যা গ্রহণ করিতেন ...
পুথির পড়াটাই সবচেয়ে বড়ো জিনিস নয়, সেখানে চারিদিকেই অধ্যয়ন আধ্যাপনার হাওয়া বহিতেছে গুরু নিজেও ওই পড়া লইয়া আছেন, শুধু তাই নয়, সেখানে জীবনযাত্রা নিতান্ত সাদাসিধে; বৈষয়িক বিলাসিতা মনকে টান ছেঁড়া করিতে পারে না, সুতরাং শিক্ষাটা একেবারে স্বভাবের সঙ্গে মিশ খাইবার সময়ও সুবিধা পায়৫৯
ছোট বেলায় পড়েছিলাম আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাইরে শুধু দাঁগানো কয়েকটি প্রশ্ন মুখস্থ করে আর বিদ্যালয় স্বরূপ কারাগারে বন্দী থেকে এ উদার শিক্ষা লাভ সম্ভব নয় এজন্যই চাই নদীর প্রবাহ, ঝর্ণার গান, উন্মুক্ত আকাশ ও প্রাঙ্গন এবং বনের ও প্রকৃতির সমারোহ কবির ভাষায়-
তথাপি, খোলা আকাশ খোলা বাতাস এবং গাছাপালা মানবসন্তানের শরীরমনের সুপরিণতির জন্য যে অত্যন্ত দরকার একথা বোধ হয় কেজো লোকেরাও একেবারেই উড়াইয়া দিতে পারিবেন না বয়স যখন বাড়িবে, আপিস যখন টানিবে, লোকেরা ভিড় যখন ঠেলিয়া লইয়া বেড়াইবে, মন যখন নানা মতলবে নানা দিকে ফিরিবে তখন বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ হৃদয়ের যোগ অনেকটা বিচ্ছন্ন হইয়া যাইবে তাহার পূর্বে যে জলস্থল-আকাশবায়ুর চিরন্তন ধাত্রীক্রোড়ের মধ্যে জন্মিয়াছি, তাহার সঙ্গে যথার্থভাবে পরিচয় হইয়া যাক, মাতৃস্তন্যের মতো তাহার অমৃতরস আকর্ষণ করিয়া লই, তাহার উদার মন্ত্র গ্রহণ করি, তবেই সম্পূর্ণরূপে মানুষ হইতে পারিব বালকদের হৃদয় যখন নবীন আছে, কৌতূহল যখন সজীব এবং সমুদয় ইন্দ্রিয়শক্তি যখন সতেজ তখনই তাহাদিগকে মেঘ ও রৌদ্রের লালীভূমি অবারিত আকাশের তলে খেলা করিতে দাও - তাহাদিগকে এই ভূমার আলিঙ্গন হইতে বঞ্চিত করিয়া রাখিও না স্নিগ্ধনির্মল প্রাতঃকালে সূর্যোদয় তাহাদের প্রত্যেক দিনকে জ্যোতির্ময় আঙ্গুলির দ্বারা উদঘাটিত করুক এবং সূর্যাস্তদীপ্ত সৌম্যগম্ভীর সায়াহ্ন তাহাদের দিবাবসানকে নক্ষত্রখচিত অন্ধকারের মধ্যে নিঃশব্দে নিমীলিত করিয়া দিক তরুলতার শাখাপল্লবিত নাট্যশালায় ছয় অঙ্কে ছয় ঋতুর নানারসবিচিত্র গীতিনাট্যাভিনয় তাহাদের সম্মুখে ঘটিতে দাও তাহারা গাছের তলায় দাঁড়াইয়া দেখুক, নববর্ষ প্রথমযৌবরাজ্যে অভিষিক্ত রাজপুত্রের মতো তাহার পুঞ্জ পুঞ্জ সজলনিবিড় মেঘ লইয়া আনন্দগর্জনে চিরপ্রত্যাশী বনভূমির উপরে আসন্ন বর্ষণের ছায়া ঘনাইয়া তুলিতেছে; এবং শরতে অন্নপূর্ণা ধরিত্রীর বক্ষে শিশিরে সিঞ্চিত, বাতাসে চঞ্চল, নানাবর্ণে বিচিত্র, দিগন্তব্যাপ্ত শ্যামল সপলতার অপর্যাপ্ত বিস্তার স্বচক্ষে দেখিয়া তাহাদিগকে ধন্য হইতে দাও হে প্রবীণ অভিভাবক, হে বিষয়ী, তুমি কল্পনাবৃত্তিকে যতই নির্জীব, হৃদয়কে যতই কঠিন করিয়া থাক, দোহাই তোমার, এ কথা অন্তত লজ্জাতেও বলিয়ো না যে, ইহার কোনো আবশ্যক নাই; তোমার বালকদিগকে বিশাল বিশ্বের মধ্য দিয়অ বিশ্বজননীর প্রত্যক্ষলীলাস্পর্শ অনুভব করিতে দাও-তাহা তোমার ইনস্পেক্টরের তদন্ত এবং পরীক্ষকের প্রশ্নপত্রিকার চেয়ে যে কত বেশি কাজ করে তাহা অন্তরে অনুভব কর না বলিয়াই তাহাকে নিতান্ত উপেক্ষা করিয়ো না
মন যখন বাড়িতে থাকে তখন তাহার চারিদিকে বৃহৎ অবকাশ থাকা চাই বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে সেই অবকাশ বিশালভাবে বিচিত্রভাবে সুন্দরভাবে বিরাজমান কোনো মতে সাড়ে নয়টা-দশটার মধ্যে তাড়াতাড়ি অন্ন গিলিয়া বিদ্যাশিক্ষার হরিণবাড়ির মধ্যে হাজিরা দিয়া কখনই ছেলেদের প্রকৃতি সুস্থভাবে বিকাশ লাভ করিতে পারে না শিক্ষাকে দেয়াল দিয়া ঘিরিয়া, গেট দিয়া রুদ্ধ করিয়া, দারোয়ান দিয়া পাহারা বসাইয়া, শাস্তি দ্বারা কণ্টকিত করিয়া, ঘণ্টা দ্বারা তাড়া দিয়া মানবজীবনের আরম্ভে এ কী নিরানন্দের সৃষ্টি করা হইয়াছে শিশু যে অ্যালজেব্রা না কষিয়াই, ইতিহাসের তারিখ মুখস্থ করিয়াই মাতৃগর্ভে হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়াছে সে জন্য কি অপরাধী তাই সে হতভাগ্যদের নিকট হইতে তাহাদের আকাশ বাতাস তাহাদের আনন্দ অবকাশ সমস্ত কাড়িয়া লইয়া শিক্ষাকে সর্বপ্রকারেই তাহাদের পক্ষে শাস্তি করিয়া তুলিতে হইবে? না জানা হইতে ক্রমে ক্রমে জানিবার আনন্দ পাইবে বলিয়াই কি শিশুরা অশিক্ষিত হইয়া জন্মগ্রহণ করে না আমাদের অক্ষমতা ও বর্বরতাবশত জ্ঞানশিক্ষাকে যদি আমরা আনন্দজনক করিয়া না তুলিতে পারি তবু চেষ্টা করিয়া, ইচ্ছা করিয়া, নিতান্ত নিষ্ঠুরতাপূর্বক নিরপরাধ শিশুদের বিদ্যাগারকে কেন আমরা কারাগারের আকৃতি দিই শিশুদের জ্ঞানশিক্ষাকে বিশ্বপ্রকৃতির উদার রমণীয় অবকাশের মধ্য দিয়া উন্মেষিত করিয়া তোলাই বিধাতার অভিপ্রায় ছিল - সেই অভিপ্রায় আমরা যে পরিমাণে ব্যর্থ করিতেছি সেই পরিমাণেই ব্যর্থ হইতেছি হরিণবাড়ির প্রাচীর ভাঙিয়া ফেলো - মাতৃগর্ভের দশমাসে পণ্ডিত হইয়া মাঠে নাই বলিয়া শিশুদের প্রতি সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান করিয়ো না, তাহাদিগকে দয়া করো তাই আমি বলিতেছি, শিক্ষার জন্য এখনও আমাদের বনের প্রয়োজন আছে এবং গুরুগৃহও চাই বন আমাদের সহৃদয় শিক্ষক এই বন, এই গুরুগৃহে আজও বালকদিগকে ব্রহ্মচর্যপালন করিয়া শিক্ষা সমাধা করিতে হইবে কালে আমাদের অবস্থার যতই পরিবর্তন হইয়া থাক এই শিক্ষানিয়মের উপযোগিতার কিছুমাত্র হ্রাস হয় নাই, কারণ এ নিয়ম মানবচরিত্রের নিত্যসত্যোর উপরে প্রতিষ্ঠিত
অতএব, আদর্শ বিদ্যালয যদি স্থাপন করিতে হয় তবে লোকালয় হইতে দূরে নির্জনে মুক্ত আকাশ ও উদার প্রান্তরে গাছপালার মধ্যে তাহার ব্যবস্থা করা চাই সেখানে অধ্যাপকগণ নিভৃতে অধ্যয়ন ও অধ্যাপনায় নিযুক্ত থাকিবেন এবং ছাত্রগণ সেই জ্ঞানচর্চার যজ্ঞক্ষেত্রের মধ্যে বাড়িয়া উঠিতে থাকিবে
যদি সম্ভব হয় তবে এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে খানিকটা ফসলের জমি থাকা আবশ্যক; এই জমি হইতে বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় আহার্য সংগ্রহ হইবে, ছাত্ররা চাষের কাজে সহায়তা করিবে দুধ-ঘি প্রভৃতির জন্য গোরু থাকিবে এবং গোপালনে ছাত্রদিগকে যোগ দিতে হইবে পাঠের বিশ্রামকালে তাহারা স্বহস্তে বাগান করিবে, গাছের গোড়া খুঁড়িবে, গাছে জল দিবে, বেড়া বাঁধিবে এইরূপে তাহারা প্রকৃতির সঙ্গে কেবল ভাবের নহে, কাজের সম্বন্ধও পাতাইতে থাকিবে
অনুকূল ঋতুতে বড়ো বড়ো ছায়াময় গাছের তলায় ক্লাস বসিবে তাহাদের শিক্ষার কতক অংশ অধ্যাপকের সহিত তরুশ্রেণীর মধ্যে বেড়াইতে বেড়াইতে সমাধা হইবে সন্ধ্যার অবকাশ তাহারা নক্ষত্রপরিচয়ে, পুরাণকথা ও ইতিহাসের গল্প শুনিয়া যাপন করিবে৬০
বিদ্যা বাজারে পণ্য নহে যে তা বেচাকেনা চলবে জ্ঞানদান মানেই ভাবের আদানপ্রদান এ হৃদয়ে মনে মনে সঞ্চারিত হবে যেমন সক্রেটিশ থেকে প্লেটো আর প্লেটো থেকে এ্যারিস্টটল ভাবের বিনিময় হলেই এখানে স্বার্থ নেই - আছে আত্মিক সম্পর্ক হেরা পর্বতে এজন্য মহানবী আর জিব্রাইলের মধ্যে ঐশী বাণী বিনিময়ের পূর্বে বুকে বুকে আলিঙ্গন হয়েছিলো রবীন্দ্রনাথও বলেছেন-
আজকাল প্রয়োজনের নিয়মে শিক্ষকের গরজ ছাত্রের কাছে আসা, কিন্তু স্বভাবের নিয়মে শিষ্যের গরজ গুরুকে লাভ করা শিক্ষক দোকানদার তাঁহার ব্যবসায় তিনি খরিদ্দারের সন্ধানে ফেরেন ব্যবসাদারের কাছে লোকে বস্তু কিনিতে পারে কিন্তু তাহার পণ্য তালিকার মধ্যে স্নেহ শ্রদ্ধা নিষ্ঠা প্রভৃতি হৃদয়ের সামগ্রী থাকবে এমন কেহ প্রত্যাশা করিতে পারে না এই প্রত্যাশা অনুসারেই শিক্ষক বেতন গ্রহণ করেন ও বিদ্যাবস্তু বিক্রয় করেন -এইখানে ছাত্রের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক শেষ এইরূপ প্রতিকূল অবস্থাতেও অনেক শিক্ষক দেনাপাওনার সম্বন্ধ ছাড়াইয়া উঠেন - সে তাঁহাদের বিশেষ মাহাত্য গুণে এই শিক্ষকই যদি জানেন যে তিনি গুরুর আসনে বসিয়াছেন - যদি তাহার জীবনের দ্বারা ছাত্রের মধ্যে জীবনসঞ্চার করিতে হয়, তাঁহার জ্ঞানের দ্বারা তাহার জ্ঞানের বাতি জ্বালিতে হয়, তাঁহার স্নেহের দ্বারা তাহার কল্যাণসাধন করিতে হয়, তবেই তিনি গৌরব লাভ করিতে পারেন - তবে তিনি এমন জিনিস দান করিতে বসেন যাহা পণ্য দ্রব্য নহে, যাহা মূল্যের অতীত; সুতরাং ছাত্রের নিকট হইতে শাসনের দ্বারা নহে, ধর্মের বিধানে স্বভাবের নিয়মে তিনি ভক্তিগ্রহণের যোগ্য হইতে পারেন তিনি জীবিকার অনুরোধ বেতন লইলেও তাহার চেয়ে বেশি দিয়া আপন কর্তব্যকে মহিমান্বিত করেন৬১
আমরা উৎসের সন্ধানী ও শিকড় সন্ধানী নই আমরা কখনো পরিচয় ও স্বরূপের সন্ধানে তৎপর নই আমাদের শিশুদের বিজাতীয় স্বভাবে ও মেজাজে গড়ে তোলাকেই আমরা গর্ববোধ করি
আমরা জানি, অনেকের ঘরে বালকবালিকা সাহেবিয়ানায় অভ্যস্ত হইতেছে তাহারা আয়ার হাতে মানুষ হয়, বিকৃত হিন্দুস্থানি শেখে, বাংলা ভুলিয়া যায় এবং বাঙালির ছেলে বাংলা সমাজ হইতে যে শত সহস্র ভাবসূত্রে আজন্মকাল বিচিত্র রস আকর্ষণ করিয়া পরিপুষ্ট হয় সেই সকল সজাতীয় নাড়ির যোগ হইতে তাহারা বিচ্ছিন্ন হয় - অথচ ইংরেজি সমাজের সঙ্গে তাহাদের সম্বন্ধ থাকে না তাহারা অরণ্য হইতে উৎপাটিত হইয়া বিলাতি টিনের টবের মধ্যে বড়ো হইতেছে আমি স্বকর্ণে শুনিয়াছি এই শ্রেণীর একটি ছেলে দূর হইতে কয়েকজন দেশীভাবাপন্ন আত্মীয়কে দেখিয়া তাহার মাকে সম্বোধন করিয়া বলিয়াছে গধহহধ গধহহধ, ষড়ড়শ, ষড়ঃং ড়ভ ইধনঁং ধৎব পড়সরহম বাঙালির ছেলের এমন দুর্গতি আর কী হইতে পারে বড়ো হইয়া স্বাধীন রুচি ও প্রবৃতিত বশত যাহারা সাবেকি চাল অবলম্বন করে তাহারা করুক, কিন্তু তাহাদের শিশু অবস্থায় যে সকল বাপ-মা বহু অপব্যয়ে ও বহু অপচেষ্টায় সন্তানদিগকে সকল সমাজের বাহির করিয়া দিয়া স্বদেশে অযোগ্য  এবং বিদেশে অগ্রাহ্য করিয়া তুলিতেছে, সন্তানদিগকে কেবলমাত্র কিছুকাল নিজের উপার্জনের নিতান্ত অনিশ্চিত আশ্রয়ের মধ্যে বেষ্টন করিয়া রাখিয়া ভবিষ্যৎ দুর্গতির জন্য বিধিমতে প্রস্তুত করিতেছে; এই সকল অভিভাবকদের নিকট হইতে বালকগণ দূরে থাকিলেই কি অত্যন্ত দুশ্চিন্তার কারণ ঘটিবে৬২
দেশকে ভালোবাসা মানে দেশের ভাষা ও সাহিত্যকেও ভালোবাসা কিন্তু আমরা মুখে দেশ প্রেমের কথা বলি আবার সর্বক্ষেত্রেই সাহেবীপনার বাহাদুরীও করে থাকি অথচ দেশের ভাষা ও সাহিত্যকে আপঙক্তেয় করে রাখি রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি ভাষার বিরোধিতা করেন নি যেখানে ইংরেজির প্রয়োজন ও আবশ্যক সেখানে তিনি অবশ্য ইংরেজি ব্যবহারের পক্ষে বললেন,
‘‘ইংরাজের প্রভাব আমাদের দেশে এত প্রবল হইয়াছে যে, তাহা সকল প্রভাবকে ছাড়াইয়া উঠিয়াছে দেশের লোককে আমরা পণ্য জ্ঞান করি না দেশের লোকের কাছে প্রশংসা পাওয়ার কোনো স্বাদ নাই ... ইংরাজি শিক্ষিত এবং ইংরেজিতে অশিক্ষিত লোকদের মধ্যে যে কেবল শিক্ষার তারতম্য তাহা নহে, শিক্ষার শ্রেণীভেদ বর্তমান পরস্পরের বিশ্বাস সংস্কার রুচি এবং চিন্তা করিবার প্রণালী ভিন্ন রকমের হইয়া যায় এবং ইংরাজি শিক্ষিত ব্যক্তি আপনাদিগকেই শিক্ষিত ও শ্রেষ্ঠ এবং অপরসাধারণকে অশিক্ষিত এবং পশ্চাদবর্তী না মনে করিয়া থাকিতে পারে না ... আমরা মাছ ধরিতে চাই কিন্তু জলের সহিত সংস্রব রাখিতে চাই না; আমরা দেশের হিত করিব, কিন্তু দেশকে আমরা স্পর্শ করিব না
দেশকে কেমন করিয়া স্পর্শ করিতে হয়? দেশের ভাষা বলিয়া, দেশের বস্ত্র পরিয়া ইংরাজের প্রবল আদর্শ যদি মাতার ভাষা এবং ভ্রাতার বস্ত্র হইতে আমাদিগকে দূরে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়া যায় তবে জননায়কের পদ গ্রহণ করিতে যাওয়া নিতান্তই অসংগত ...
... যেখানে ইংরেজি বলা দরকার সেখানে অবশ্য ইংরাজি বলিবে কিন্তু তোমার ভাষাটা কী? তোমার লেখাপড়া ধ্যানধারণা মন্ত্রতন্ত্র সমস্তই ইংরাজিতে কিনা? জনসভার বাহিরে দেশের সহিত তুমি কিরূপ সংস্রব রাখিয়া চল? ইংরাজি ভাষায় যেটুকু কর্তব্য তাহা যেন সাধন করিলে, কিন্তু দেশী ভাষায় যে কর্তব্যপুঞ্জ পড়িয়া আছে, যাহা কাগজে রিপোর্টের জন্য নহে, যাহা সমুদ্রপারে উদবেলিত হইবার জন্য নহে, যাহা ফলাফল যাহার ধ্বনি প্রতিধ্বনি শুধুমাত্র আমাদের দেশীমণ্ডলীর মধ্যে বদ্ধ, তাহাতে হাত দিতে তোমার মন উঠে? ... ইংরাজের সহিত সমান অধিকার ভিক্ষা করিয়া লইবার জন্য ইংরাজি ভাষা আবশ্যক হইতে পারে, কিন্তু স্বদেশকে উচ্চতর অধিকারের উপযোগী করিয়া তুলিবার জন্য দেশীয় ভাষা দেশীয় সাহিত্য দেশীয় সমাজের মধ্যে থাকিয়া সমাজের উন্নতিসাধন একমাত্র উপায় যাঁহারা স্বদেশ অপেক্ষা আপনাকে অনেক ঊর্ধ্বে অধিষ্ঠিত বলিয়া জানেন, যাঁহারা স্বদেশের সহিত এক পঙক্তিতে বসিতে লজ্জাবোধ করেন তাঁহারাও স্বদেশকে অনুগ্রহ করিয়া থাকেন, স্বীকার করি কিন্তু সেটুকু না করিয়া যদি তাঁহারা নিজের দেশকে উপযুক্ত জ্ঞান করেন এবং নিজেকে স্বদেশের উপযুক্ত করিয়া তুলিতে চেষ্টা করেন তবে তাহাতে তাঁহাদেরও আত্মসম্মান থাকে এবং দেশকেও সম্মান করা হয়’’৬৩
দেশের শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে একদিন এমন একটা হীনমন্যতাও গড়ে উঠেছিলো যে বাংলা বই পড়াকেও তারা সাহেবীপনা নষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে করতো বাংলা বই অন্তপুর মেয়েরাই পড়তো বেশি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-
একদিন শিক্ষিত পুরুষ সমাজে ইহার অবজ্ঞার সীমা ছিল না তখন পুরুষেরা বাংলা বই কিনিয়া লজ্জার সহিক কৈফিয়ৎ দিতেন যে, আমরা পড়িব না, বাড়ির ভিতরে মেয়েরা পড়িবে আচ্ছা আচ্ছা, তাঁহাদের সে লজ্জার ভার আমরাই বহন করিয়াছি, কিন্তু ত্যাগ করি নাই আজ তো সে লজ্জার দিন ঘুচিয়াছে যে বাড়ির ভিতরে মেয়েদের কোলে বাংলাদেশের শিশুসন্তানেরা - তাহারা কালোই হউক আর ধলোই হউক - পরম আদরে মানুষ হইয়া উঠিতেছে, বঙ্গসাহিত্যও সেই বাড়ির ভিতরে মেয়েদের কোলেই তাহার উপেক্ষিত শিশু অবস্থা যাপন করিয়াছে, অন্নবস্ত্রের দুঃখ পায় নাই৬৪
অবস্থা ও ব্যবস্থাপ্রবন্ধ তিনি বলেন-
বিদেশী শাসনকালে বাংলাদেশের যদি এমন কোনো জিনিসের সৃষ্টি হইয়া থাকে যাহা লইয়া বাঙালি যথার্থ গৌরব করিতে পারে, তাহা বাংলা সাহিত্য তাহার একটা প্রধান কারণ, বাংলা সাহিত্য সরকারের নেমক খায় নাই পূর্বে প্রত্যেক বাংলা বই সরকার তিনখানি করিয়া কিনিতেন, শুনিতে পাই এখন মূল্য দেওয়া বন্ধ করিয়াছেন ভালোই করিয়াছে গবর্ণমেন্টের উপাধি-পুরস্কার-প্রসাদের প্রলোভন বাংলা সাহিত্যের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারে নাই বলিয়াই, এই সাহিত্য বাঙালির স্বাধীন আনন্দ উৎস হইতে উৎসারিত বলিয়াই, আমরা এই সাহিত্যের মধ্যে হইতে এমন বল পাইতেছি হয়তো গণনায় বাংলা ভাষায় উচ্চশ্রেণীর গ্রন্থ সংখ্যা অধিক না হইতে পারে, হয়তো বিষয়বৈচিত্র্যে এ সাহিত্য অন্যান্য সম্পদশালী সাহিত্যের সহিত তুলনীয় নহে, কিন্তু তবু ইহাকে আমরা বর্তমান অসম্পূর্ণতা অতিক্রম করিয়া বড়ো করিয়া দেখিত পাই - কারণ, ইহা আমাদের নিজের শক্তি হইতে, নিজের অন্তরের মধ্যে উদ্ভূত হইতেছে এক্ষীণ হউক, দীন হউক, এ রাজার প্রশয়ের প্রত্যাশী নহে - আমাদেরই প্রাণ ইহাকে প্রাণ জোগাইতেছে অপরপক্ষে, আমাদের স্কুল-বইগুলির প্রতি ন্যূনাধিক পরিমাণে অনেকদিন হইতেই সরকারের গুরুহস্তের ভার পড়িয়াছে, এই রাজপ্রসাদের প্রভাবে এই বইগুলির কিরূপ শ্রী বাহির হইতেছে তাহা কাহারও অগোচর নাই
এই যে স্বাধীন বাংলাসাহিত্য যাহার মধ্যে বাঙালি নিজের প্রকৃত শক্তি যথার্থভাবে অনুভব করিয়াছে, এই সাহিত্যই নাড়ীজালের মতো বাংলার পূর্ব-পশ্চিম উত্তর-দক্ষিণকে এক বন্ধনে বাঁধিয়াছে; তাহার মধ্যে এক চেতনা, এক প্রাণ সঞ্চার করিয়া রাখিতেছি, যদি আমাদের দেশে স্বদেশীসভা স্থাপন হয় তবে বাংলা সাহিত্যের পুষ্টিসাধন সভ্যগণের একটি বিশেষ কার্য হইবে বাংলা ভাষা অবলম্বন করিয়া ইতিহাস বিজ্ঞান অর্থনীতি প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ে দেশে জ্ঞানবিস্তারের চেষ্টা তাঁহাদিগকে করিতে হইবে ইহা নিশ্চয় জানিতে হইবে যে, বাংলা সাহিত্য যত উন্নত সতেজ, যতই সম্পূর্ণ হইবে, ততই এই সাহিত্যই বাঙালি জাতিকে এক করিয়া ধারণ করিবার অনশ্বর আধার হইবে৬৫
বিদেশী ভাষায় এতোদিন ভিক্ষে কুড়িয়ে আমরা লাভের অপেক্ষা যে ঘৃণা ও লাঞ্ছনাই কুড়িয়েছি এবং জাতীয় মর্যাদাকে ক্ষুণœ করেছি সাহিত্য সম্মেলনপ্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ তা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন-
আমরা বিদেশী ভাষায় পরের দরবারে এতকাল যে ভিক্ষা কুড়াইলাম তাহাতে লাভের অপেক্ষা লাঞ্ছনার বোঝাই জমিল, আর দেশী ভাষায় স্বদেশী হৃদয় দরবারে যেমনি হাত পাতিলাম অমনি মুহূর্তের মধ্যেই মাতা যে আমাদের মুঠা ভরিয়া দিলেন৬৬
 দেশ আমাদের, ভাষা আমাদের অথচ আমরা দেশের ভাষা ও সাহিত্য এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্বন্ধে উদাসীন থাকবো - অবহেলা করবো এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কি হতে পারে?
দেশে থাকিয়া দেশের বিবরণ সংগ্রহ করিতে আমরা একেবারে উদাসীন, এমন লজ্জা আর নাই ইহা আমাদের পক্ষে কতো বড়ো গালি তাহা অনুভব করি না বেদনা সম্বন্ধে সংজ্ঞা না থাকা যেমন রোগের চরম অবস্থা তেমনি যখন হীনতার লক্ষণগুলি সম্বন্ধে আমাদের চেতনাই থাকে না তখনই বুঝিতে হইবে, দুর্গতিপ্রাপ্ত াজতির এই লজ্জাহীনতাই চরম লজ্জার বিষয় আমাদের দেশে এই একান্ত অসাড়তার ছোটো বড়ো প্রমাণ সর্বদাই দেখিতে পাই বাঙালি হইয়া বাঙালিকে, পিতাভ্রাতা আত্মীয় স্বজনকে ইংরেজিতে পত্র লেখায় কতো বড়ো লাঞ্ছনা তাহা আমরা অনুভব করিতে পারি না, আমরা যখন অসংগত করতালি দ্বারা স্বদেশী বক্তাকে এবং হিপ হিপ হুররে ধ্বনিতে স্বদেশী মান্য ব্যক্তিকে উৎসাহ জানাইয়া থাকি তখন সেই কর্ণকটু বিজাতীয় বর্বরতায় আমরা কেহ সংকোচমাত্র বোধ করি না৬৭
শিক্ষার পরগাছাবৃত্তি ও পুচ্ছানুবৃত্তি এবং পরানুগ্রহিতাকে রবীন্দ্রনাথ সাংঘাতিকভাবে ধিক্কার দিয়েছেন অথচ আমাদের মধ্যে এ দোষগুলোই বেশি পাশ্চাত্য শিক্ষার মত্ততায় আজ আমরা টালমাটাল অথচ আমরা কি কখনো আমাদের শিক্ষা শিকড়ের সন্ধান নিয়েছি? আমাদের শিক্ষার কি কোনো গৌরবময় ঐতিহ্য ছিলো না, যে শিক্ষার শিকড় দেশের মাটি ও স্বাভাবিকত্বের ভেতরে প্রোথিত ছিলো? শিক্ষায় সেই স্বভাবকে অমান্য করিলে বিশেষ লাভ আছে এমন তো আমার মনে হয় না৬৮
রবীন্দ্রনাথ ক্ষোভের সাথে আরো বলেছেন-
যে ধনী পশ্চিমের পোষ্যপুত্র, বিলিতি বাপের কায়দায় সে বাপকেও ছাড়াইয়া যাইতে চায় যতোই বলি না কেন শিক্ষাটাকে যতদূর পারি উচ্ছে রাখিব, কায়দাটাকে আমাদের মত করিতে দাও - সে কথায় কেহ কান দেয় না বলে কি না, ্ওই কায়দাইতো শিক্ষা তাই তোমাদের ভালোর জন্য কায়দাটাকে যথাসাধ্য দুঃসাধ্য করিয়া তুলিব৬৯
আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনা ও শিক্ষাপদ্ধতি এবং শিক্ষার মাধ্যম বাংলা ভাষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে সংগ্রাম করেছেন তা আজও আমাদের কাছে অনেকটা অগোচরেই রয়েছে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এনট্রেন্স ও এফ, এ পরীক্ষায় শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে মর্যাদা দানের সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের অবদান আমরা অনেকেই স্মরণ করিনে
১৩০১ সালে এন্ট্রেন্স ও এফ, এ পরীক্ষায় ইতিহাস, ভূগোল ও অঙ্ক প্রভৃতি বিষয়ের উত্তর যাতে বাংলায় লেখা যায় সেজন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, স্যার গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও অন্যান্যদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয় কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের কাছে প্রস্তাব পেশ করেন উপরোক্ত বিষয়গুলো মাতৃভাষা বাংলায় উত্তর লেখার জন্য কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর উপর কোন গুরুত্ব আরোপ করেননি অনেক সংগ্রামের পর ১৩১০ সালে এন্ট্রেস পরীক্ষার পাঠ্য হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি লাভ করে ঠিক এর দুবছর পর বাংলা ভাষার কবি নোবেল প্রাইজ পেলেও শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলা ভাষা কোনো মর্যাদা পায়নি শিক্ষার বাহনেরবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
মাতৃভাষা বাংলা বলিয়াই কি বাঙালিকে দণ্ড দিতেই হইবে? এই অজ্ঞানকৃত অপরাধের জন্য সে চিরকাল অজ্ঞানই হইয়াই থাক, সমস্ত বাঙালির প্রতি কয়জন শিক্ষিত বাঙালির এই রায়ই কি বহাল রহিল? যে বেচারা বাংলা বলে সেই কি আধুনিক মনুসংহিতার শুদ্র? তার কানে উচ্চশিক্ষার মন্ত্র চলিবে না? মাতৃভাষা হইতে ইংরেজি ভাষার মধ্যে জন্ম লইয়া তবেই আমরা দ্বিজ হই?
বলাবাহুল্য, ইংরেজি আমাদের শেখা চাইই, শুধু পেটের জন্য নয় কেবল ইংরেজি কেন, ফরাসি-জার্মান শিখিলে আরো ভালো সেই সঙ্গে এ কথা বলাও বাহুল্য, অধিকাংশ বাঙালি ইংরেজি শিখিবে না সেই লক্ষ লক্ষ বাংলা ভাষীদের জন্য বিদ্যার অনশন কিংবা অর্ধাশনই ব্যবস্থা একথা কোন মুখে বলা যায়?৭০
বাংলা ভাষা কেয নিজের গুণে ও ঐশ্বর্যেই বিশ্বের দুয়ারে, গৌরবের আসনে মহিমান্বিত কবি একথাও দৃঢ়তার সাথে বলেন-
একদিন ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি নিজের ইংরেজি লেখার অভিমানে বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করিয়াছিল, কিন্তু কোথা হইতে নব বাংলা সাহিত্যের ছোট একটি অঙ্কুর বাংলা হৃদয়ের ভিতর হইতে গজাইয়া উঠিল-তখন তার ক্ষুদ্রতাকে তার দুর্বলতাকে পরিহাস করা সহজ ছিল - কিন্তু সে যে সজীব, ছোটো হইলেও উপেক্ষার সামগ্রী নয়, আজ সে মাথা তুলিয়া বাঙালির ইংরেজি রচনাকে অবজ্ঞা করিবার সামর্থ্য লাভ করিয়াছে অথচ, বাংলা সাহিত্যের কোনো পরিচয় কোনো আদর রাজদ্বারে ছিল না - আমাদের মতো অধীন জাতির পক্ষে সেই প্রলোভনের অভাব কম নয় - বাহিরের সেই সমস্ত অনাদরকে গণ্য না করিয়া বিলাতি বাজারের যাচনাদারের দৃষ্টির বাহিরে কেবলমাত্র নিজের প্রাণের আনন্দেই সে আজ পৃথিবীতে চিরপ্রতিষ্ঠা লাভের যোগ্য হইতেছে এতদিন ধরিয়া আমাদের সাহিত্যিকেরা যদি ইংরেজি কপিবুক নকল করিয়া আসিতেন তাহা হইলে জগতের যে প্রভূত আবর্জনার সৃষ্টি হইত তাহা কল্পনা করিলেও গায়ে কাঁটা দিয়া উঠে৭১
শিক্ষাবিস্তারে এবং মাতৃভাষা বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত করার ব্যাপারে আমাদের অবহেলার কথা বলতেও রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাবোধ করেননি
... আমাদের বিলাতি বিদ্যাটা কেমন ইস্কুলের জিনিস হইয়া সাইনবোর্ডে টাঙানো থাকে, আমাদের জীবনের ভিতরের সামগ্রী হইয়া যায় না তাই পশ্চিমের শিক্ষায় যে ভালো জিনিস আছে তার অনেকখানি আমাদের নোটবুকেই আছে, সে কি চিন্তায় কি কাজে ফলিয়া উঠিতে চায় না
আমাদের দেশের আধুনিক পণ্ডিত বলেন, ইহার একমাত্র কারণ জিনিসটা বিদেশী একথা মানি না যা সত্য তার জিয়োগ্রাফি নাই আসল কথা, আধুনিক শিক্ষায় তার বাহন পায় নাই, তার চলাফেরার পথ খোলাসা হইতেছে না এখনকার দিনে সর্বজনীন শিক্ষা সকল সভ্যদেশেই মানিয়া লওয়া হইয়াছে যে কারণেই হউক আমাদের দেশে এটা চলিল না মহাত্মা গোখলে এই লইয়া লড়িয়াছিলেন শুনিয়াছি, দেশের মধ্যে বাংলাদেশের কাছ হইতেই তিনি সবচেয়ে বাধা পাইয়াছেন বাংলাদেশে শুভবুদ্ধির ক্ষেত্রে আজকাল হঠাৎ সকল দিক হইতেই একটা অদ্ভূত মহামারীর হাওয়া বহিয়াছে ভূতের পা পিছন দিকে, বাংলাদেশে সামাজিক সকল চেষ্টারই পা পিছনে ফিরিয়াছে আমরা ঠিক করিয়াছি, সংসারে চরিবার পথে আমরা সামনের দিকে উড়িব, আমাদের পা যে দিকে আমাদের ডানা ঠিক তার উল্টা দিকে গজাইবে
শিক্ষার জন্য আমরা আব্দার করিয়াছি, গরজ করি নাই শিক্ষাবিস্তারে আমাদের গা নাই তার মানে, শিক্ষার ভোজে নিজেরা বসিয়া যাইব, পাতের প্রসাদটুকু পর্যন্ত আর কোনো ক্ষুধিত পায় বা না পায় সেদিকে খেয়ালই নাই এমন কথা যারা বলে নিম্নসাধারণের জন্য যথেষ্ট শিক্ষার দরকার নাই, তাতে তাদের ক্ষতিই করিবে তারা কর্তৃপক্ষের কাছ হইতে একথা শুনিবার অধিকারী যে, বাঙালির পক্ষে বেশি শিক্ষা অনাবশ্রক, এমনকি অনিষ্টকর জনসাধারণকে লেখাপড়া শিখাইলে আমাদের চাকর জুটিবে নাএকথা যদি সত্য হয় তবে আমরা লেখাপড়া শিখিলে আমাদেরও দাস্যভাবের ব্যাঘাত হইবে এ আশঙ্কাও মিথ্যা নহে
এ সম্বন্ধে নিজের মনের ভাবটা ঠিকমত যাচাই করিতে হইলে দুটো-একটা দৃষ্টান্ত দেখা দরকার! আমরা বেঙ্গল প্রোভিনশ্যাল কনফারেনস নামে একটা রাষ্ট্রসভার সৃষ্টি করিয়াছি সেটা প্রাদেশিক, তার প্রধান উদ্দেশ্য বাংলার অভাব ও অভিযোগ সম্বন্ধে সকলে মিলিয়া আলোচনা করিয়া বাঙালির চোখ ফুটাইয়া দেওয়া বহুকাল পর্যন্ত এই নিতান্ত সাদা কথাটা কিছুতেই আমাদের মনে আসে নাই যে, তা করিতে হইলে বাংলা ভাষায় আলোচনা করা চাই তার কারণ, দেশের লোককে দেশের লোক বলিয়া সমস্ত চৈতন্য দিয়া আমরা বুঝি না এইজন্যই দেশের পুরা দাম দেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব যা চাহিতেছি তা পেট ভরিয়া পাই না তার কারণ এ নয় যে, দাতা প্রসন্ন মনে দিতেছে না, তার কারণ এই যে আমরা সত্য মনে চাহিতেছি না
বিদ্যাবিস্তারের কথাটাকে যখন ঠিকমত মন দিয়া দেখি তখন তার সর্বপ্রধান বাধাটা এই দেখিতে পাই যে তার বাহনটা ইংরেজি বিদেশী মাল জাহাজে করিয়া শহরের ঘাট পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছিতে পারে, কিন্তু সেই জাহাজটিতে করিয়াই দেশের হাটে হাটে আমদানি রফতানি করাইবার দুরাশা মিথ্যা যদি বিলিতি জাহাজটাকেই কায়মনে আঁকড়াইয়া ধরিতে চাই তবে ব্যবসা শহরেই আটকা পড়িয়া থাকিবে
এ পর্যন্ত এ অসুবিধাটাতে আমাদের অসুখ বোধ হয় নাই কেননা মুখে যাই বলি, মনের মধ্যে এই শহরটাকে দেশ বলিয়া ধরিয়া লইয়াছিলাম দাক্ষিণ্য যখন বেশি হয় তখন এই পর্যন্ত বলি : আচ্ছা বেশ, খুব গোড়ার দিকের মোটা শিক্ষাটা বাংলাভাষায় দেওয়া চলিবে, কিন্তু সে যদি উচ্চ শিক্ষার দিকে হাত বাড়ায় তবে গমিষ্যত্যুপহাস্যতাম
আমাদের এই ভীরুতা কি চিরদিনই থাকিয়া যাইবে? ভরসা করিয়া এটুকু কোনোদিন বলিতে পারিব না যে উচ্চ শিক্ষাকে আমাদের দেশের ভাষায় দেশের জিনিস লইতে হইবে? পশ্চিম হইতে যা কিছু শিখিবার আছে জাপান তা দেখিতে দেখিতে সমস্ত দেশে ছড়াইয়া দিল তার প্রদান কারণ, সেই শিক্ষাকে তারা দেশী ভাষার আধারে বাঁধাই করিতে পারিয়াছে
অথচ, জাপানি ভাষার ধারণাশক্তি আমাদের ভাষার চেয়ে বেশি নয় নূতন কথা সৃষ্টি করিবার শক্তি আমাদের ভাষায় অপরিসীম তা ছাড়া ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তির আকার প্রকার যতটা আমাদের সঙ্গে মেলে এমন জাপানির সঙ্গে নয় কিন্তু উদ্যোগী পুরুষসিংহ কেবল লক্ষ্মীকে পায় না, সরস্বতীকেও পায় জাপান জোর করিয়া বলিল: ইউরোপের বিদ্যাকে নিজের বাণীমন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করিব যেমন বলা তেমনি করা, তেমনি তার ফল লাভ আমরা ভরসা করিয়া এ পর্যন্ত বলিতেই পারিলাম না যে, বাংলা ভাষাতেই আমরা উচ্চশিক্ষা দিব এবং দেওয়া যায় এবং দিলে তবেই বিদ্যার ফসল দেশ জুড়িয়া ফলিবে
বিদ্যালয়ের কাজে আমরা যেটুকু অভিজ্ঞতা তাতে দেখিয়াছি, এক দল ছেলে স্বভাবতই ভাষা শিক্ষায় অপটু ইংরেজি ভাষা কায়দা করিতে না পারিয়া যদি বা তারা কোনোমতে এনট্রেনসের দেউড়িটা তরিয়া যায়, উপরের সিঁড়ি ভাঙিবার বেলাতেই চিত হইয়া পড়ে
এমনতরো দুর্গতির অনেকগুলো কারণ আছে এক তো যে ছেলের মাতৃভাষা বাংলা তার পক্ষে ইংরেজি ভাষার মতো বালাই আর নাই, ও যেন বিলিতি তলোয়ারের খাপের মধ্যে দিশি খাঁড়া ভরিবার ব্যায়াম তার পরে, গোড়ার দিকে ভালো শিক্ষকের কাছে ভালো নিয়মে ইংরেজি শিখিবার সুযোগ অল্প ছেলেরই হয়, গরিবের ছেলের তো হয়ই না তাই অনেক স্থলেই বিশল্যকরণীয় পরিচয় ঘটে না বলিয়া আস্ত গন্ধমাদন বহিতে হয়, ভাষা আয়ত্ত হয় না বলিয়া গোটা ইংরেজি বই মুখস্থ করা ছাড়া উপায় থাকে না অসামান্য স্মৃতিশক্তির জোরে যে ভাগ্যবানরা এমনতরো কিঙ্কিন্ধ্যাকাণ্ড করিতে পারে তারা শেষ পর্যন্ত উদ্ধার পাইয়া যায়, কিন্তু যাদের মেধা সাধারণ মানুষের মাপে প্রমাণসই তাদের কাছে এতটা আশা করাই যায় না তারা এই রুদ্ধ ভাষার ফাঁকের মধ্য দিয়া গলিয়া পার হইতেও পারে না, ডিঙাইয়া পার হওয়াও তাদের পক্ষে অসাধ্য
এখন কথাটা এই , এই যেসব বাঙালির ছেলে স্বাভাবিক বা আকস্মিক কারণে ইংরেজি ভাষা দখল করিতে পারল না তারা কি এমন কিছু মারাত্মক অপরাধ করিয়াছে যে জন্য তারা বিদ্যামন্দির হইতে যাবজ্জীবন আন্দামানে চালান হইবার যোগ্য? ইংল্যান্ড একদিন ছিল যখন সামান্য কলাটা মূলাটা চুরি করিলেও মানুষের ফাঁসি হইতে পারিত, কিন্তু এ যে তার চেয়েও কড়া আইন এ যে চুরি করিতে পারে না বলিয়া ফাঁসি কেননা মুখস্থ করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি যে ছেলে পরীক্ষামালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়, আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায়, সেই বা কম কী করিল? সভ্যতার নিয়ম অনুসারে মানুষের স্মরণশক্তির মহলটা ছাপাখানায় অধিকার করিয়াছে অতএব, যারা বই মুখস্থ করিয়া পাস করে তারা অসভ্য রকেম চুরি করে, অথচ সভ্যতার যুগে পুরস্কার পাইবে তারাই?
যাই হোক, ভাগ্যক্রমে যারা পার হইল তাদের বিরুদ্ধে নালিশ করিতে চাই না কিন্তু যারা পার হইল না তাদের পক্ষে হাওড়ার পুলটাই না হয় দুফাঁক হইল, কিন্তু কোনো রকমের সরকারি খেয়াও কি তাদের কপালে জুটিবে না? স্ট্রীমার না হয় তো পানসি?
ভালোমত ইংরেজি শিখিতে পারিল না এমন ঢের ঢের ভালো ছেলে বাংলাদেশে আছে তাদের শিখিবার আকাক্সক্ষাও উদ্যমকে একেবারে গোড়ার দিকেই আটক করিয়া দিয়া দেশের শক্তির কি প্রভূত অপব্যয় করা হইতেছে না?
আমার প্রশ্ন এই, প্রেপারেটরি ক্লাস পর্যন্ত একরকম পড়াইয়া তার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মোড়টার কাছে যদি ইংরেজি বাংলা দুটো বড়ো রাস্তা খুলিয়া দেওয়া যায়, তা হইলে কি নানা প্রকারে সুবিধা হয় না? এক তো ভিড়ের চাপ কিছু রকমেই, দ্বিতীয়তঃ শিক্ষার  বিস্তার অনেক বাড়ে
ইংরেজি রাস্তাটার দিকেই বেশি লোক ঝুঁকিবে তা জানি এবং দুটো রাস্তার চলাচল ঠিক সহজ অবস্থায় পৌঁছিতে কিছূ সময়ও লাগিবে রাজভাষার দর বেশি সুতরাং আদরও বেশি কেবল চাকরির বাজারে নয় বিবাহের বাজারেও বরের মূল্যবৃদ্ধি ঐ রাস্তাটাতেই তাই হোক, বাংলা ভাষা অনাদর সহিতে রাজি, কিন্তু অকৃতার্থতা সহ্য করা কঠিন ভাগ্যমন্তের ছেলে ধাত্রীস্তন্যে মোটাসোটা হইয়া উঠুক-না, কিন্তু গরিবের ছেলেকে তার মাতৃস্তন্য হইতে বঞ্চিত করা কেন?৭২
বাঙালির ছেলে ইংরেজিতে দক্ষ হলেই দেশের মঙ্গল হবে না বরং অধিতবিদ্যাকে মাতৃভাষার মাধ্যমে আত্মস্থ করতে না পারলে দেশের মঙ্গল হবে না দেশে বিদ্যাশিক্ষার যে বড়ো কারখানা আছে তার কলের চাকার অল্পমাত্র বদল করিতে গেলেই হাতুড়ি পেটাপেটি করতে হয, সে খুব শক্ত হাতের কর্ম আশু মুখুজ্জে মশায় ওরই মধ্যে এক জায়গায় একটুখানি বাংলা হাতল জুড়িয়া দিয়াছেন তিনি যেটুকু, করিয়া দিয়াছেন তার ভিতরকার কথা এই, বাঙালির ছেলে ইংরেজিবিদ্যায় যতই পাকা হোক বাংলা না শিখিলে তার শিক্ষা পুরো হইবে না৭৩
বিশ্ববিদ্যালয় হবে আমাদের দেশের আর এর শিক্ষাব্যবস্থা হবে বিজাতীয় ও বিভাষায়-এমন তরো শিক্ষায় মানুষ কখনো মানুষ হতে পারে না এবং এ শিক্ষায় কখনো স্বাদেশিকতা ও দেশত্মবোধ জাগতে পারে না-
বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন বাড়িটার ভিতরের আঙিনায় যেমন চলিতেছে চলুক, কেবল তার এই বাইরের প্রাঙ্গণটাতে যেখানে আম-দরবারের নূতন বৈঠক বসিল সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাটাকে যদি সমস্ত বাঙালির জিনিস করিয়া তোলা যায় তাতে বাধাটাক কী? আহুত যারা তারা ভিতর-বাড়িতেই বসুক, আর যারা রবাহুত তারা বাহিরে পাত পাড়িয়া বসিয়া যাক-না তাদের জন্য বিলেতি টেবিল না হয় না রহিল, দিশি কলাপাত মন্দ কী? তাদের একেবারে দারোয়ান দিয়া ধাক্কা মারিয়া বিদায় করিয়া দিলে কি এ যজ্ঞে কল্যাণ হইবে? অভিশাপ লাগিবে না কি?
এমনি করিয়া, বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি এবং বাংলা ভাষার ধারা যদি গঙ্গাযমুনার মতো মিলিয়া যায় তবে বাঙালি শিক্ষার্থীর পক্ষে এটা একটা তীর্থস্থান হইবে দুই-স্রোতের সাদা এবং কালো রেখার বিভাগ থাকিবে বটে, কিন্তু তারা একসঙ্গে বহিয়া চলিবে ইহাতেই দেশের শিক্ষা যথার্থ বিস্তীর্ণ হইবে, গভীর হইবে, সত্য হইয়া উঠিবে৭৪
পরের ভাষায় মানুষ পরগাছা হতে পারে এবং দপৃ, গর্ব ও অহংকারে আস্ফালন করতে পারে কিন্তু প্রকৃত মানুষ হতে পারে না পুনরুক্তি হলেও উক্তিটি আবার এসে যায়
দেশের এই মনকে মানুষ করা কোনোমতেই পরের ভাষায় সম্ভবপর নহে আমরা লাভ করিব, কিন্তু সে লাভ আমাদের ভাষাকে পূর্ণ করিবে না, আমরা চিন্তা করিব, কিন্তু সে চিন্তার বাহিরে আমাদের ভাষা পড়িয়া থাকিবে, আমাদের মন বাড়িয়া চলিবে, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভাষা বাড়িতে থাকিবে না - সমস্ত শিক্ষাকে অকৃতার্থ করিবার এমন উপায় আর কী হইতে পারে
তার ফল হইয়াছে, উচ্চ-অঙ্গের শিক্ষা যদি বা আমরা পাই উচ্চ অঙ্গের চিন্তা আমরা করি না কারণ, চিন্তার স্বাভাবিক বাহন আমাদের ভাষা বিদ্যালয়ের বাহিরে আসিয়া পোশাকি ভাষাটা আমরা ছাড়িয়া ফেলি, সেই সঙ্গে তার পকেটে যা কিছু সঞ্চয় থাকে তা আলনায় ঝোলানো থাকে, তার পরে আমাদের চিরদিনের আটপৌরে ভাষায় আমরা গল্প করি, গুজব করি, রাজা-উজির মারি, তর্জমা করি, চুরি করি এবং খবরের কাগজে অশ্রাব্য কাপুরুষতার বিস্তার করিয়া থাকি এ সত্ত্বেও আমাদের দেশে বাংলায় সাহিত্যের উন্নতি হইতেছে না এমন কথা বলি না, কিন্তু এ সাহিত্যে উপবাসের লক্ষণ যথেষ্ট দেখিতে পাই যেমন, এমন রোগী দেখা যায় যে খায় প্রচুর তার হাড় বাহির হইয়া পড়িয়াছে, তেমনি দেখিতে আমরা যতটা শিক্ষা করিতেছি তার সমস্তটা আমাদের সাহিত্যের সর্বাঙ্গে পোষণ সঞ্চার করিতেছে না খাদ্যের সঙ্গে আমাদের প্রাণের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগ হইতেছে না তার প্রধান কারণ, আমরা নিজের ভাষার রসনা দিয়া খাই না, আমাদের কলে করিয়া খাওয়ানো হয়, তাতে আমাদের পেট ভর্তি করে, দেহপূর্তি করে না৭৫
তাই দেখা যায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় হতে আমরা যে শিক্ষালাভ করি এতে জীবন মন ও আত্মার বিকাশ ঘটে না - আমাদের আচার ও আচরণের শিক্ষার কোনো লক্ষণই প্রকাশিত হয় না আমরা সবাই একই ছাঁদে তৈরি হই
... ... ... আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় হইতেও আমরা সেই ডিগ্রীর টাকাশালার ছাপ লওয়াকেই বিদ্যালাভ বলিয়া গণ্য করিয়াছি ইহা আমাদের অভ্যাস হইয়া গেছে আমরা বিদ্যা পাই বা না পাই বিদ্যালয়ের একটা ছাঁচ পাইয়াছি আমাদের মুশকিল এই যে, আমরা চিরদিন ছাঁচের উপাসক ছাঁচে ঢালাই করা রীতিনীতি চালচলনকেই নানা আকারে পূজার অর্ঘ্য দিয়া এই ছাঁচদেবীর প্রতি অচলা ভক্তি আমাদের মজ্জাগত সেইজন্য ছাঁদে-ঢালা বিদ্যাটাকে আমরা দেবীর বরদান বলিয়া মাথায় করিয়া লই, ইহার চেয়ে বড়ো কিছু আছে একথা মনে করাও আমাদের পক্ষে শক্ত
তাই বলিতেছি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি একটা বাংলা অঙ্গের সৃষ্টি হয় তার প্রতি বাঙালি অভিভাকদের প্রসন্ন দৃষ্টি পড়িবে কি না সন্দেহ তবে কিনা ইংরেজি চালুনির ফাঁক দিয়ে যারা গলিয়া পড়িতেছে এমন ছেলে এখানে পাওয়া যাইবে কিন্তু আমার মনে হয় তার চেয়ে একটা বড়ো সুবিধার কথা আছে
 সে সুবিধাটি এই যে, এই অংশেই বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনভাবে ও স্বাভাবিকরূপে নিজেকে সৃষ্টি করিয়া তুলিতে পারিবে তার একটা কারণ, এই অংশের শিক্ষা অনেকটা পরিমাণে বাজার দরের দাসত্ব হইতে মুক্ত হইবে আমাদের অনেককেই ব্যবসার খাতিরে জীবিকার দায়ে ডিগ্রী লইতেই হয়, কিন্তু সে পথ যাদের অগত্যা বন্ধ কিংবা যারা শিক্ষার জন্যই শিখিতে চাহিবে তারাই এই বাংলা বিভাগে আকৃষ্ট হইবে শুধু তাই নয়, যারা দায়ে পড়িয়া ডিগ্রী লইতেছে তারাও অবকাশ মতো বাংলা ভাষার টানে এই বিভাগে আনাগোনা করিতে ছাড়িবে না কারণ দুদিন না যাইতেই দেখা যাইবে, এই বিভাগেই আমাদের দেশের অধ্যাপকদের প্রতিভার বিকাশ হইবে এখন যাঁরা কেবল ইংরাজি শব্দের প্রতিশব্দ  ও নোটের ধুলা উড়াইয়া আঁধি লাগাইয়া দেন তাঁরাই সেদিন ধারা বর্ষণে বাংলার তৃষিত চিত্ত জুড়াইয়া দিবে৭৬
বিদেশী ভাষা আমরা যতোই শিখি না কেনো - তা বাইরেই থেকে যায় ভাষাকে ভাব প্রকাশের জন্য আত্মস্থ করতে না পারলে, রক্ত প্রবাহের সাথে স্পন্দমান করতে না পারলে এ ভাষায় যা বলি নিজের হতে পারে না মাতৃভাষা ছাড়া এ কখনো সম্ভব হতে পারে না জাপানে যে আজ এতো উন্নতি করেছে এর মূলে রয়েছে পাশ্চাত্য বিদ্যাকে মাতৃভাষায় আত্মস্থ করে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন-
বিদ্যা বিস্তার কথাটা যখন ঠিকমত মন দিয়া দেখি তখন তার সর্বপ্রধান বাঁধাটা এই দেখিতে পাই যে, তার বাহনটা ইংরেজি বিদেশী মাল জাহাজে করিয়া শহরের ঘাট পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছিতে পারে কিন্তু সেই জাহাজটাতে করিয়াই দেশের হাটে হাটে আমদানী রপ্তানী করাইবার দুরাশা মিথ্যা যদি বিলিতি জাহাজটাকেই কায়মনে আঁকড়াইয়া ধরিতে চাই তবে ব্যবসা শহরেই আটকা পড়িয়া থাকিবে
আমাদের এই ভীরুতা কি চিরদিনই থাকিয়া যাইবে? ভরসা করিয়া এটুকু কোনোদিন বলিতে পারিব না যে, উচ্চশিক্ষা আমাদের দেশের ভাষায় দেশের জিনিস করিয়া লইবে? পশ্চিম হইতে যা কিছু শিখিবার আছে জাপান তা দেখিতে দেখিতে সমস্ত দেশে ছড়াইয়া দিল, তার প্রধান কারণ, এই শিক্ষাকে তারা দেশীয় ভাষার আধারে বাঁধাই করিতে পারয়াছে৭৭
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা বলে আমাদের কোন অপরাধে অপাঙতেয় হয়ে থাকতে হবে এ প্রশ্ন তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার উপর তিনি বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখেছেন-
যতদিন পর্যন্ত না বাংলাভাষায় বিজ্ঞানের বই বাহির হইতে থাকিবে, ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটির মধ্যে বিজ্ঞানের শিকড় প্রবেশ করিতে পারিবে না৭৮
শিক্ষার বাহন প্রবন্ধে তিনি বলেছেন-
আমাদের ভরসা এতই কম যে, স্কুল কলেজের বাহিরে আমরা যেসব লোকশিক্ষার আয়োজন করিয়াছি সেখানেও বাংলা ভাষার প্রবেশ নিষেধ বিজ্ঞানশিক্ষা বিস্তারের জন্য দেশের লোকের চাঁদায় বহুকাল হইতে শহরে এক বিজ্ঞানসভা খাড়া দাঁড়াইয়া আছে প্রাচ্যদেশের কোনো কোনো রাজার মতো গৌরব নাশের ভয়ে জনসাধারণের কাছে সে বাহির হইতেই চায় না বরং অচল হইয়া থাকিবে তবু কিছুতে সে বাংলা বলিবে না ও যেন বাঙালির চাঁদা দিয়া বাঁধানো পাকা ভিতরে উপর বাঙলার অক্ষমতা ও ওদাসীন্যের স্মরণ-স্তম্ভের মতো স্থানু হইয়া আছে কথাও বলে না, নড়েও না উহাকে ভুলিতেও পারি না, উহাকে মনে রাখাও শক্ত ওজর এই যে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানশিক্ষা অসম্ভব ওটা অক্ষমের, ভীরুর ওজর কঠিন বৈকি সেইজন্যই কঠোর সংকল্প চাই একবার ভাবিয়া দেখুন, একে ইংরেজি তাতে সায়ান্স, তার উপরে দেশে যে সকল বিজ্ঞান বিশারদ আছে তাঁরা জগদবিখ্যাত হইতে পারেন কিন্তু দেশের কোণে এই যে, একটু খানি বিজ্ঞানের বীড় দেশের লোক বাঁধিয়া দিয়াছে এখানে তাঁদের ফলাও জায়গা নাই, এমন অবস্থায় এই পদার্থটা বঙ্গপসাগরের তলায় যদি ডুব মারিয়া বসে তবে ইহার সাহায্যে সেখানকার মৎস্যশাবকের বৈজ্ঞানিক উন্নতি আমাদের বাঙালি ছেলের চেয়ে যে কিছুমাত্র কম হইতে পারে এমন অপবাদ দিতে পারিব না৭৯
সবচেয়ে অবাকের বিষয় উচ্চশিক্ষার জন্য মাতৃভাষায় কোনো বই নেই এ ধরনের কথা আজও আমরা বলছি বাংলাদেশ আজ স্বাধীন কিন্তু এক শ্রেণীর লোকের কাছে আজও বাংলাভাষা অবজ্ঞাত ও অপরিচিত ভাষা হিসাবে ঘৃণিত ও অবহেলিত
যে ভাষায় প্রকাশিত কার্য ও চিন্তা চেতনা বিশ্বচৈতন্যকে আলোড়িত করেছে সে ভাষা নাকি আজও অফিস-আদালতের ভাষা হিসেবে এবং কারিগরী, প্রকৌশলী, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও উচ্চ শিক্ষার বাহন হবার অনুপযুক্ত অনেক পণ্ডিত আবার গর্ব ভরে বলে থাকেন যে, ‘‘আমি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছি তাই ইংরেজিটাই আমার কাছে সহজ এবং বাংলা বলতে গেলেই ভুল করি’’ ভাবটা এই যে, ইংরেজিটা তার মাতৃভাষা হয়ে গেছে আমাদের ধারণা শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে যারা ভালো বাংলা জানেন তারা ভালো ইংরেজিও জানে এবং যারা ভালো ইংরেজি জানে তারা ভালো বাংলাও জানে এমনতরো দৃষ্টান্তের অভাব নেই-উভয় বাংলার সাহিত্যিকদের নাম উল্লেখই যথেষ্ট অফিস আদালতে যারা বাংলার চেয়ে ইংরেজিতে কাজ চালানো সহজ মনে করে তারা আসলে বাংলা বা ইংরেজি কোনোটাই ভালো জানে না একটা বিশেষ গতবা ফরমা তাদের রপ্ত বা মুখস্থ এবং এখানেই তাদের চাতুর্য এর বাইরে গেলেই ইংরেজি বা বাংলা কোনটাতেই তারা দক্ষতা দেখাতে পারে না তবে এ গতবা ফর্মাটা যেহেতু ইংরেজিতে সাজানো তাই তারা ইংরেজির পক্ষপাতী
বিজাতি বিভাষীরা যখন বাংলা শিখে বাঙালির লেখা বাংলা বইয়ের ভূমিকা লিখে দেন, প্রাঞ্জল বাংলায় তারা বাংলা সাহিত্যের উপর গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন - তখন স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে এরা কোন বঙ্গসন্তান যারা উচ্চশিক্ষা লাভ করে মাতৃভাষাকে দেদার ভুলে গেছেন বলে গর্ব বোধ করেন
আরেক দল পণ্ডিত বছরের পর বছর আবেগভরে দুঃখ প্রকাশ করে বেড়াচ্ছেন যে, বাংলায় কোনো রেফারেন্সের বই নেই, সুতরাং বাংলা ভাষায় উচ্চ শিক্ষা কখনো সম্ভব নয় সবিনয়ে বলছি, বিদেশীরা যে সমস্ত বই লিখেন তা তারাতো তাদের মাতৃভাষায়ই লিখেন এবং এ বিষয় নিয়ে তারা চর্চা ও গবেষণা করেন বলেই তা সম্ভব হয় কোনো দেশের বই-ই ঠিকাদারার লিখেন না, যারা এ সমস্ত বিষয় নিয়ে চর্চা করেন তারাই লিখেন - তবে কি আমাদের জন্য রেফারেন্সের বইও বিদেশী ঠিকাদারদের নিয়ে লিখিয়ে নিতে হবে!
রবীন্দ্রনাথ এই মামুলি যুক্তির বিরুদ্ধে অনেক আগেই বলেছেন-
আমি জানি তর্ক এই উঠিবে, ‘তুমি বাংলা ভাষার যোগে উচ্চশিক্ষা দিতে চাও কিন্তু বাংলা ভাষায় উঁচুদরের শিক্ষাগ্রন্থ কই? নাই সে কথা মানি, কিন্তু শিক্ষা না চেিলল শিক্ষাগ্রন্থ হয় কী উপায়ে? শিক্ষাগ্রন্থ বাগানের গাছ নয় যে, শৌখিন লোকে শখ করিয়া তার কেয়ারি করিবে, কিংবা সে আগাছাও নয় যে মাঠে বাটে নিজের পুলকে নিজেই কণ্টকিত হইয়া উঠিবে শিক্ষাকে যদি শিক্ষাগ্রন্থের জন্য বসিয়া থাকিতে হয় তবে পাতার জোগাড় আগে হওয়া চাই তার পরে গাছের পালা, এবং কূলের পথ চাহিয়া নদীকে মাথায় হাত দিয়া পড়িতে হইবে
বাংলায় উচ্চ অঙ্গের শিক্ষাগ্রন্থ বাহির হইতেছে না এটা যদি আক্ষেপের বিষয় হয় তবে তার প্রতিকারের একমাত্র উপায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা উচ্চ অঙ্গের শিক্ষা প্রচলন করা বঙ্গসাহিত্য পরিষদ কিছুকাল হইতে এই কাজের  গোড়াপত্তনের চেষ্টা করিতেছেন পরিভাষা রচনা ও সংকলনের ভার পরিষৎ লাইয়াছেন, কিছু কছিু করিয়াছেন তাঁদের কাজ ঢিলা চালে চলিতেছে এইটেই আশ্চর্য দেশে এই পরিভাষা তৈরির তাগিদ কোথায়? ইহার ব্যবহারের প্রয়োজন বা সুযোগ কৈ? দেশে টাকা চলিবে না অথচ টাকশাল চলিতেই থাকিবে, এমন আব্দার করি কোন লজ্জায়?৮০
আমরা জোর করে আমাদের ছাত্রদের ইংরেজি ভাষা হয় মুখস্থ করিতে দেই অথবা গিলিতে দিই- অথচ ভাষাকে একটুও আয়ত্ত্ব করতে পারে না বলে অনেকক্ষেত্রেই অকাণ্ড করে বসে রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-
যে ছেলের মাতৃভাষা বাংলা তার পক্ষে ইংরেজি ভাষার মতো বালাই আর নাই, ও যেন বিলিতি তলোয়ারের খাপের মধ্যে দিশি খাঁড়া ভরিবার ব্যায়াম তার পরে, গোড়ার দিকে ভালো শিক্ষকের কাছে ভালো নিয়মে ইংরেজি শিখিবার সুযোগ অল্প ছেলেরই হয়, গরিবের ছেলের তো হয়ই না তাই অনেক স্থলেই বিশল্যকরণীয় পরিচয় ঘটে না বলিয়া আস্ত গন্ধমাদন বহিতে হয়, ভাষা আয়ত্ত হয় না বলিয়া গোটা ইংরেজি বই মুখস্থ করা ছাড়া উপায় থাকে না অসামান্য স্মৃতিশক্তির জোরে যে ভাগ্যবানরা এমনতরো কিঙ্কিন্ধ্যাকাণ্ড করিতে পারে তারা শেষ পর্যন্ত উদ্ধার পাইয়া যায়, কিন্তু যাদের মেধা সাধারণ মানুষের মাপে প্রমাণসই তাদের কাছে এতটা আশা করাই যায় না তারা এই রুদ্ধ ভাষার ফাঁকের মধ্য দিয়া গলিয়া পার হইতেও পারে না, ডিঙাইয়া পার হওয়াও তাদের পক্ষে অসাধ্য৮১
আমরা আগেই আলোচনা করেছি যে, আবেগের মোহে আমরা বিলেতি বিদ্যা মুখস্থ করতেছি, ঐ বিদ্যাকে দেশজ আবহে সম্পৃক্ত করে কখনো আত্মস্থ করতে পারিনি ফলে এ বিদ্যা আমাদের মানুষ করে না এক একটি সীল মারা বস্তু হয়ে উঠে মাত্র কবির ভাষায়-
... আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাঁচে তৈরীওই বিদ্যালয়টি পরীক্ষায় পাশ করা ডিগ্রীধারীদের নামের উপর মার্কা মারিবার একটা বড়ো গোছের সীলমোহর মানুষকে তৈরী করা নয়, মানুষকে চিহ্নিত করা তার কাজ মানুষকে হাটের মাল করিয়া বাজার দর দাগিয়া দিয়া ব্যবসাদারির সহায়তা সে করিয়াছে৮২
বিষয়বস্তুকে তথা অধিত বিষয়কে আত্মস্থ না করে মুখস্থ বিদ্যাকে রবীন্দ্রনাথ চৌর্যবৃত্তির সাথে তুলনা করেছেন মুখস্থ করে মগজের ভেতরে রাখাকে রবীন্দ্রনাথ সবচেয়ে বড়ো চৌর্যবৃত্তি বলেছেন-
... মুখস্থ করিয়া পাশ করাই তো চৌর্যবৃত্তি যে দেশে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে দেখাইয়া দেওয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায় সেই বা কম কী করিল৮৩
শিক্ষা ও শিক্ষার্থীকে রবীন্দ্রনাথ চেয়েছেন মাটির কাছাকাছি নিতে মানুষ, মাটি ও পরিবেশ এবং প্রকৃতিকে একান্ত করে শিক্ষার আবহন তৈরি করতে এই জন্যই তিনি বলেছেন-
আমাদের দেশ যেখানে ফল চাহিতেছে, ছায়া চাহিতেছে সেখানে কোঠাবাড়িগুলো ছাড়িয়া একবার মাটির দিকেই নামিয়া আসি না কেন? গুরুর চারিদিকে শিষ্য আসিয়া যেমন স্বভাবের নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি করিয়া তোলে, বৈদিককালে যেমন ছিল তপোবন, বৌদ্ধকালে যেমন ছিল নালন্দা, তক্ষশিলা- যেমন করিয়া টোল চতুষ্পাঠী দেশের প্রাণ লইয়া দেশকে প্রাণ দিয়া রাখিয়াছিল, তেমনি করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে জীবনের দ্বারা জীবলোক সৃষ্টি করিয়া তুলিবার কথাই সাহস করিয়া বলা যাক না কেন?
সৃষ্টির প্রথম মন্ত্র - আমরা চাই এই মন্ত্র কি দেশের চিত্তকুহর হইতে একেবারেই শুনা যাইতেছে না? দেশের যাঁরা আচার্য, যাঁরা সন্ধান করিতেছেন সাধনা করিতেছেন ধ্যান করিতেছেন তাঁরা কি এই মন্ত্রে শিষ্যদের কাছে আসিয়া মিলিবেন না? বাষ্পে যেমন মেঘে মেলে, মেঘ তেমন ধারাবর্ষণে ধরণীকে অভিসিক্ত করে তেমনি করিয়া কবে তাঁরা একত্রে মিলিবেন, কবে তাঁদের সাধনা মাতৃভাষায় গলিয়া পড়িয়া মাতৃভূমিকে তৃষ্ণার জলে ও ক্ষুধার অন্নে পূর্ণ করিয়া তুলিবে?৮৪
আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য আরো একটি বড়ো সমস্রা হলো আমাদের ভাষা যেমন পরের তেমনি বিদ্যাটাও আমরা না বুঝেই পরের কাছ থেকে পেয়ে থাকি এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাতের মন্তব্য-
আমাদের মুশকিল এই যে, আগাগোড়া সমস্ত বিদ্যাটাই আমরা পরের কাছ হইতে পাই সে বিদ্যা মিলাইব কিসের সঙ্গে, বিচার করিব কী দিয়া? নিজের যে বাটখারা দিয়া পরিমাপ করিতে হয় সেই বাটখারাই নাই কাজেই আমদানী মালের উপর ওজনের ও দামের যে টিকিট মারা তাকে সেই টিকিটাকেই ষোলো আনা মানিয়া লইতে হয় এই জন্যই ইস্কুলমাষ্টার এবং মাসিক পত্র-লেখকদের মধ্যে এই টিকিটে লিখিত মালের পরিছয় ও অঙ্ক যে যতটা ঠিকমত মুখস্থ রাখিতে ও আওড়াইতে পারে তাহার প্রসার বাড়ে এতকাল ধরিয়া কেবল এমনি করিয়াই কাটিল, কিন্তু চিরকাল ধরিয়াই কি এমনি করিয়া কাটিবে?৮৫
দীর্ঘদিন ধরে যে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলে আসছে এবং বাঙলা, বাঙালি ও বাংলা ভাষাকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা চলেছে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি হতে তাও এড়িয়ে যেতে পারেনি-
ইংরেজি সাহিত্যের রসমত্তায় নূতন মাতাল ইংরাজি শিক্ষিত ছাত্রেরা সেদিন বঙ্গভাষাকে অবজ্ঞা করেছিল আবার সংস্কৃত সাহিত্যের ঐশ্বর্যগর্বে গর্বিত সংস্কৃত পণ্ডিতেরা মাতৃভাষাকে অবহেলা করতে ত্রটি করেননি কিন্তু বহুকালের উপেক্ষিত ভিখারি মেয়ে যেমন বাহিরের সমস্ত অকিঞ্চনতা সত্ত্বেও হঠাৎ একদিন নিজের অন্তর হতে উন্মোষিত যৌবনের পরিপূর্ণতায় অপরূপ গৌরবে বিশ্বের সৌন্দর্যলোকে আপন আসন অধিকার করে, অনাদৃত বাংলাভাষা তেমনি করে একদিন সহসা কোন ভাবাবেগের ঔৎসুক্যে আপন বহুদিনের দীনতার কূল ছাপিয়ে দিয়ে মহিমান্বিত হয়ে উঠল৮৬
আমাদের ভাষা নিধনযজ্ঞ ও বাংলা ভাষাকে ইসলামীকরণ এবং বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দুকে চাপিয়ে দেবার যে সমস্যাটা আমরা বায়ান্নের ভাষার আন্দোলনের সময় থেকে প্রকট মনে করি তা অনেক আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি থেকে তাও এড়িয়ে যায়নি-
¤প্রতি হিন্দুর প্রতি আড়ি করিয়া বাংলাদেশের কয়েকজন মুসলমান বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কাড়িয়া লইতে উদ্যত হইয়াছেন এ যেন ভায়ের প্রতি রাগ কিরয়া মাতাকে তাড়াইয়া দিবার প্রস্তাব বাংলাদেশের শতকরা নিরানব্বইয়ের অধিক সংখ্যক মুসলমানের ভাষা বাংলা সেই ভাষাটাকেই কোণঠাষা করিয়া তাহাদের উপর যদি উর্দু চাপানো হয়, তাহা হইলে তাহাদের জিহ্বার আধখানা কাটিয়া দেওয়ার মতো হইবে না কি চীনদেশে মুসলমানের সংখ্যা অল্প নহে, সেখানে আজ পর্যন্ত এমন অদ্ভূত কথা কেহ বলে না যে, চীনভাষা ত্যাগ না করিলে তাহাদের মুসলমানির খর্বতা ঘটিবে বস্তুতই খর্বতা ঘটে যদি জবরদস্তি দ্বারা তাহাদিগকে ফার্শি শেখাইবার আইন করা হয় বাংলা যদি বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা হয়, তবে সেই ভাষার মধ্য দিয়াই তাহাদের মুসলমানিও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ হইতে পারে বর্তমান বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকেরা প্রতিদিন তাহার প্রমাণ দিতেছেন তাঁহাদের মধ্যে যাঁহারা প্রতিভাশালী তাঁহারা এই ভাষাতেই অমরতা লাভ করিবেন শুধু তাই নয়, বাংলা ভাষাতে তাঁহারা মুসলমানি মালমসলা বাড়াইয়া দিয়া ইহাকে আরও জোরালো করিয়া তুলিতে পারিবেন৮৭
রবীন্দ্রনাথ একটি সত্য স্পষ্ট করেই বুঝেছিলেন যে,
মুসলমান নিজের প্রকৃতিতেই মহৎ হইয়া উঠিবে এই ইচ্ছাই মুসলমানদের সত্য ইচ্ছা৮৮
১৯৩২ সনের আগস্ট মাসে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথকে রীডারশিপ পদ প্রদান করে উক্ত পদ গ্রহণ করে রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপশিক্ষার বিকিরণনামে দুটি বক্তৃতা দেন উক্ত বক্তৃতাগুলোতে রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট করেই বলেন যে, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা ব্যতীত দেশের প্রকৃত স্বরাজ ও স্বাধীনতা আসতে পারে না এবং দেশের মানুষও প্রকৃত মানুষ হতে পারে না শিক্ষার বিকিরণে তিনি বলেছেন-
বাঙালি যারা বাংলা ভাষাই জানে শিক্ষিতসমাজে তারা কি চিরদিন অন্ত্যজ শ্রেণীতেই গণ্য হয়ে থাকবে? এমনও এক সময় ছিল যখন ইংরেজি ইস্কুলের পয়লা শ্রেণীর ছাত্রেরা বাংলা জানি নেবলতে অগৌরব বোধ করত না, এবং দেশের লোকেরাও সসম্ভ্রমে তাদের চৌকি এগিয়ে দিয়েছে সেদিন আজ আর নেই বটে, কিন্তু বাঙালির ছেলেকে মাথা হেঁট করতে হয়, ‘শুধু কেবল বাংলাভাষা জানিবলতে এদিকে রাষ্ট্রক্ষেত্রে স্বাজ পাবার উৎসাহ আমাদের জাগেনি বললে কম বলা হয় এমন মানুষ আজও দেশে আছে যারা তার বিরুদ্ধতা করতে প্রস্তুত যারা মনে করে শিক্ষাকে বাংলা ভাষার আসনে বসালে তার মূল্য যাবে কমে৮৯
বিদেশী ভাষা যে মানুষকে স্বাধীন ও স্বকীয় সত্তায় উদ্দীপ্ত করতে পারে না তাও রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে উপলব্ধি করে বলেছিলেন -
অন্য স্বাধীন দেশের সঙ্গে আমাদের একটা মস্ত প্রভেদ আছে সেখানে শিক্ষার পূর্ণতার জন্যে যারা দরকার বোঝে তারা বিদেশী ভাষা শেখে কিন্তু, বিদ্যার জন্যে যেটুকু আবশ্যক তার বেশি তাদের না শিখলেও চলে কেননা, তাদের দেশের সমস্ত কাজই নিজের ভাষায় আমাদের দেশের অধিকাংশ কাজই ইংরেজি ভাষায় যাাঁ শাসন করেন তাঁরা আমাদের ভাষা শিখতে, অন্তত যথেষ্ট পরিমাণে শিখতে, বাধ্য নন
... বিদেশী ভাষাই প্রকাশচর্চার প্রধান অবলম্বন হলে সেটাতো যেন মুখোশের ভিতর দিয়ে ভাবপ্রকাশের অভ্যাস দাঁড়ায় মুখোশপরা অভিনয় দেখেছি; তাতে ছাঁচে-গড়া ভাবকে অবিচল করে দেখানো যায় একটা বাঁধা সীমানার মধ্যে, তার বাইরে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না বিদেশী ভাষায় আবরণের আড়ালে প্রকাশের চর্চা সেই জাতের একদা মধুসূদনের মতো ইংরেজি-বিদ্যায় অসামান্য পণ্ডিত এবং বঙ্কিমচন্দ্রের মতো বিজাতীয় বিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র এই মুখোশের ভিতর দিয়ে ভাব বাংলাতে চেষ্টা কিেছলেন, শেষকালে হতাশ হয়ে সেটা টেনে ফেলে দিতে হল
রচনার সাধনা অমনিতেই সহজ নয় সেই সাধনাকে পরভাষার দ্বারা ভারাক্রান্ত করলে চিরকালের মতো তাকে পঙ্গু করার আশঙ্কা থাকে বিদেশী ভাষার চাপে বামন হওয়া মন আমাদের দেশে নিশ্চয়ই বিস্তর আছে প্রথম থেকেই মাতৃভাষার স্বাভাবিক সুযোগে মানুষ হলে সেই মন কী হতে পারত আন্দাজ করতে পারিনে বলে, তুলনা করতে পারিনে৯০
মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় বৈষয়িক কাজ চালানো যেতে পারে কিন্তু মনের ভাব প্রকাশ করতে গেলে জোর করে করতে হয় বলে সেখানে কৃত্রিমতার বহরটাই বেশি থাকি-
‘‘বিশেষ কাজের প্রয়োজনে কোনো বিশেষ ভাষাকে কৃত্রিম উপায়ে স্বীকার করা চলে, যেমন আমরা ইংরেজি ভাষাকে স্বীকার করেছি কিন্তু ভাষার একটা অকৃত্রিম প্রয়োজন আছে, সে প্রয়োজন কোনো কাজ চালাবার জন্যে নয়, আত্মপ্রকাশের জন্যে
রাষ্ট্রিক কাজের সুবিধা করা চাই বৈকি, কিন্তু তার চেয়ে বড়ো কাজ দেশের চিত্তকে সরস ও সমুজ্জ্বল করা সে কাজ আপন ভাষা নইলে হয় না দেউড়িতে একটা সরকারি প্রদীপ জ্বালানো চলে, কিন্তু একমাত্র তারই তেল জোগাবার খাতিবে ঘরে ঘরে প্রদীপ নেবানো চলে না৯১
শিক্ষা পদ্ধতিতে আমাদের শহরের শিক্ষা ও গ্রামের শিক্ষার মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান শিক্ষার বিকিরণপ্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ তাও উল্লেখ করেন-
‘‘একালে যাকে আমরা এডুকেশন বলি তার আরম্ভ শহরে তার পিছনে ব্যবসা ও চাকরি চলেছে আনুষঙ্গিক হয়ে এই বিদেশী শিক্ষাবিধি রেলকামরার দীপের মতো কামরাটা উজ্জ্বল, কিন্তু যে যোজন যোজন পথ গাড়ি চলেছে ছুটে সেটা অন্ধকারে লুপ্ত কারখানার গাড়িটাই যেন সত্য, আর প্রাণবেদনায় পূর্ণ সমস্ত দেশটাই যেন অবাস্তব
শহরবাসী একদল মানুষ এই সুযোগে শিক্ষা পেলে, মান পেলে, অর্থ পেলে তারাই হল এনলাইটেনড, আলোকিত সেই আলোর পিছনে বাকি দেশটাতে লাগল পূর্ণ গ্রহণ ইস্কুলের বেঞ্চিতে বসে যাঁরা ইংরেজি পড়া শুখস্থ করলেন শিক্ষাদীপ্ত দৃষ্টিতে অন্ধতায় তাঁরা দেশ বলতে বুঝলেন শিক্ষিত সমাজ, ময়ূর বলতে বুঝলেন তার পেখমটা, হাতি বলতে তার গজদন্ত সেই দিন থেকে জলকষ্ট বলো, পথকষ্ট বলো, রোগ বলো, অজ্ঞান বলো, জমে উঠল কাংস্যবাদ্যমন্দ্রিত নাট্যমঞ্চের নেপথ্যে নিরানন্দ নিরালোক গ্রামে গ্রামে নগরী হল সুজলা-সুফলা টানাপাখাশীতলা; সেইখানেই মাথা তুলতে আরোগ্য নিকেতন, শিক্ষার প্রসাদ দেশের বুখে একপ্রান্ত থেকে আর প্রান্তে এত বড়ো বিচ্ছেদের ছুরি আর কোনোদিন চালানো হয়নি, সে কথা মনে রাখতে হবে একে আধুনিকের লক্ষণ বলে নিন্দা করলে চলবে না কেননা কোনো সভ্য দেশেরই অবস্থা এরকম নয় আধুনিকতা সেখানে সপ্তমীর চাঁদের মতো অর্ধেক আলোয় অর্ধেক অন্ধকারে খণ্ডিত হয়ে নেই জাপানে পাশ্চাত্য বিদ্যায় সংস্রব ভারতবর্ষের চেয়ে অল্পকালের, কিন্তু সেখানে সেটা তালিদেওয়া ছেঁড়া কাঁথা নয় সেখানে পরিব্যাপ্ত বিদ্যার প্রভাবে সমস্ত দেশের মনে চিন্তা করবার শক্তি অবিচ্ছিন্ন সঞ্চারিত এই চিন্তা এক ছাঁচে ঢালা নয় আধুনিককালেরই লক্ষণ অনুসারে এই চিন্তায় বৈচিত্র্য আছে অথচ ঐক্যও আছে, সেই ঐক্য যুক্তির ঐক্য
একদিন আমাদের দেশে সনাতন শিক্ষার ব্যাপ্তি রুদ্ধ হয়ে জনসাধারণের মধ্যে জ্ঞানের অনাবৃষ্টি চিরকালীন হয়ে দাঁড়ালো, অন্যদিকে আধুনিককালের নতুন বিদ্যার যে আবির্ভাব হল তার প্রবাহ রইল না সর্বজনীন দেশের অভিমুখে পাথরে-গাঁথা কুণ্ডের মতো স্থানে স্থানে সে আবদ্ধ হয়ে রইল: তীর্থের পাণ্ডাকে দর্শনী দিয়ে দূর থেকে এসে গণ্ডুষ ভর্তি করতে হয়, নানা নিয়মে তার আটঘাট বাঁধা মন্দাকিনী থাকেন শিবের ঘোরালো জটাজুটের মধ্যে বিশেষভাবে, তবুও দেবললাট থেকে তিনি তাঁর ধারা নামিয়ে দেন, বহে যান সাধারণভাবে ঘাটে ঘাটে মর্ত্যজনের দ্বারের সম্মুখ দিয়ে ঘটে ঘটে ভরে দেন আপন প্রসাদ কিন্তু আমাদের দেশে প্রবাসিনী আধুনিকী বিদ্যা তেমন নয় তার আছে বিশিষ্ট রূপ, সাধারণ রূপ নেই সেইজন্য ইংরেজি শিখে যাঁরা বিশিষ্টতা পেয়েছেন তাদের মনের মিল হয় না সর্বসাধারণের সঙ্গে দেশে সকলের চেয়ে বড়ো জাতিভেদ এইখানেই শ্রেণীতে শ্রেণীতে অস্পৃশ্যতা
ইংরেজি ভাষার অবগুণ্ঠিত বিদ্যা স্বভাবতই আমাদের মনের সহবর্তিনী হয়ে চলতে পারে না সেইজন্যেই আমরা অনেকেই যে পরিমাণে শিক্ষা পাই সে পরিমাণে বিদ্যা পাইনে চারদিকের আবহাওয়া থেকে এবিদ্যা বিচ্ছিন্ন; আমাদের ঘর আর স্কুলের মধ্যে ট্রাম চলে, মন চলে না স্কুলের বাইরে পড়ে আছে আমাদের দেশ, সেই দেশে স্কুলের প্রতিবাদ রয়েছে বিস্তর, সহযোগিতা নেই বলিলেই হয় সেই বিচ্ছেদের আমাদের ভাষা ও চিন্তা অধিকাংশ স্থলেই স্কুলের ছেলের মতোই ঘুচল না আমাদের নোট বইয়ের শাসন, আমাদের বিচারবুদ্ধিতেই নেই সাহস আছে নজির মিলিয়ে অতি সাবধানে পা ফেলে চলা শিক্ষার সঙ্গে দেশের মনের সহজ মিলন ঘটাবার আয়োজন আজ পর্যন্ত হল না যেন কনে রইল বাপের বাড়ির অন্তপুরে, শ্বশুরবাড়ি নদীর ওপারে বালির চর পেরিয়ে খেয়া-নৌকাটা গেল কোথায়?
পারাবারের একখানা ডোঙা দেখিয়ে দেওয়া হয়, তাকে বলে সাহিত্য একথা মানতেই হবে, আধুনিক বঙ্গসাহিত্য বর্তমান যুগের অন্নে-বস্ত্রে মানুষ এই সাহিত্য আমাদের মনে লাগিয়েছে এ কালের ছোঁওয়া, কিন্তু খাদ্য তো ওপার থেকে পুরোপুরি বহন করে আনছে না যে বিদ্যা বর্তমান যুগের বিত্তশালিকে বিচিত্র আকারে প্রকাশ করছে, উদঘাটন করছে বিশ্বরহস্যের নব নব প্রবেশদ্বার, বাংলা সাহিত্যের পাড়ায় তার যাওয়া-আসা নেই বললেই হয় চিন্তা করে যে মন, যে মন বিচার করে, বুদ্ধির সঙ্গে ব্যবহারের যোগসাধন করে যে, সে পড়ে আছে পূর্বে যুগান্তরে, আর যে মন রসসম্ভোগ করে সে যাতায়াত শুরু করেছে আধুনিক ভোজের নিমন্ত্রণশালার আঙিনায় স্বভাবতই তার ঝোঁক পড়েছে সেই দিকটাতে যে দিকে চলেছে মদের পরিবেশন, যেখানে ঝাঁঝালো গন্ধে বাতাস হয়েছে মাতাল
একদিন অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সে যখন আমার শক্তি ছিল তখন কখনো কখনো ইংরেজি সাহিত্য মুখে মুখে বাংরা করে শুনিয়েছি আমার শ্রোতারা ইংরেজি জানতেন সবাই তবু তাঁরা স্বীকার করেছেন, ইংরেজি সাহিত্যের বাণী বাংলা ভাষায় তাঁদের মনে সহজ সাড়া পেয়েছে বস্তুত আধুনিক শিক্ষা ইংরেজি ভাষা বাহিনী বলেই আমাদের মনের প্রবেশ পথে তার অনেকখানি মারা যায় ইংরেজি খানার টেবিলে আহারের জটিল পদ্ধতি যার অভ্যস্ত নয় এমন বাঙালির ছেলে বিলেতে পাড়ি দেবার পথে পি, এন্ড, , কোম্পানীর ডিনার কামরায় যখন খেতে বসে তখন ভোজ্য ও রসনার মধ্যপথে কাঁটাছুরির দৌত্য তার পক্ষে বাধাগ্রস্ত বলেই ভরপুর ভোজের মাঝখানেও ক্ষুধিত জঠরের দাবি সম্পূর্ণ মিটতে চায় না আমাদের শিক্ষার ভোজেও সেই দশা, আছে সবই, অথচ মাঝপথে অনেকখানি অপচয় হয়ে যায় এ যা বলছি এ কলেজি যজ্ঞের কথা, আমরার আজকের আলোচ্য বিষয় এ নিয়ে নয় আমার বিষয়টা সর্বসাধারণের শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার জলের কল চালানোর কথা নয়, পাইপ যেখানে পৌঁছায় না সেখানে পানীয়ের ব্যবস্থার কথা মাতৃভাষায় সেই ব্যবস্থা যদি গোষ্পদের চেয়ে প্রশস্ত না হয় তবে এই বিদ্যাহারা দেশের মরুবাসী মনের উপায় হবে কী?
বাংলা যার ভাষা সেই আমার তৃষিত মাতৃভূমির হয়ে বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে চাতকের মতো উৎকণ্ঠিত বেদনায় আবেদন জানাচ্ছি : তোমার অভ্রভেদী শিক্ষারচূড়া বেষ্টন করে পুঞ্জ পুঞ্জ শ্যামল মেঘের প্রসাদ আজ বর্ষিত হোক ফলে শস্যে, সুন্দর হোক পুষ্পে-পল্লবে, মাতৃভাষার অপমান দূর হোক, যুগশিক্ষার উদবেল ধারা বাঙালি চিত্তের শূষ্ক নদীর রিক্ত পথে বান ডাকিয়ে বয়ে যাক, দুই কূল জাগুক পূর্ণ চেতনায়, ঘাটে ঘাটে উঠুক আনন্দধ্বনি৯২
আধুনিক শিক্ষা ও শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার শিক্ষা পদ্ধতির সাথে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতির তুলনা করে বলেছেন-
আমাদের দেশে আধুনিক শিক্ষাবিধি বলে একটা পদার্থের আবির্ভাব হয়েছে তারই নামে স্কুল-কলেজে ব্যাঙের ছাতার মতো ইতস্তত মাথা তুলে উঠেছে এমনভাবে এটা তৈরি যে, এর আলো কলেজি মণ্ডলের বাইরে অতি অল্পই পৌঁছায়- সূর্যের আলো চাঁদের আলোয় পরিণত হয়ে যতটুকু বিকীর্ণ হয় তার চেয়েও কম বিদেশী ভাষার স্থূল বেড়া তার চারদিকে মাতৃবাষার যোগে শিক্ষাবিস্তার সম্বন্ধে যখন চিন্তা করি সে চিন্তার সাহস অতি অল্প সে যেন অন্তঃপুরিকা বধুর মতোই ভীরু আঙিনা পর্যন্তই তার অধিকার, তার বাইরে চিবুক পেরিয়ে ঘোমটা নেমে পড়ে মাতৃভাষার আমল প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যেই অর্থাৎ সে কেবল শিশুশিক্ষারই যোগ্য - অর্থাৎ মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা শেখবার সুযোগ নোই, সেই বিরাট জনসংঘকে বিদ্যার অধিকার সম্বন্ধে চিরশিশুর মতোই গণ্য করা হয়েছে তারা কোনোমতেই পুরো মানুষ হয়ে উঠবে না, অথচ স্বরাজ সম্বন্ধে তারা পুরো মানুষের অধিকার লাভ করবে, চোখ বুজে এইটে আমরা কল্পনা করি জ্ঞানলাভের ভাগ নিয়ে দেশের অধিকাংশ জনমণ্ডলী সম্বন্ধে এত বড়ো অনশনের ব্যবস্থা আর কোনো নবজাগ্রত দেশে নেই - জাপানে নেই, পারস্যে নেই, তুরস্কে নেই, ইজিপ্টে নেই যেন মাতৃভাষা একটা অপরাধ, যাকে খ্রীষ্টান ধর্মশাস্ত্রে বলে আদিম পাপ দেশের লোকের পক্ষে মাতৃভাষাগত শিক্ষার ভিতর দিয়ে জ্ঞানের সর্বাঙ্গ সম্পূর্ণতা আমরা কল্পনার বাইরে ফেলে রেখেছি ইংরেজি হোটেলওয়ালার দোকানছাড়া আর কোথাও দেশের লোকের পুষ্টিকর অন্ন মিলবে না এমনকথা বলাও যা, আর ইংরেজি ভাষা ছাড়া মাতৃভাষার যোগে জ্ঞানের সম্যক সাধনা হতেই পারবে না বলা এও তাই
এই উপলক্ষে একথা মনে রাখা দরকার যে, আধুনিক সমস্ত বিদ্যাকে জাপানি ভাষায় সম্পূর্ণ আয়ত্তগম্য করে তবে জাপানি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সত্য ও সম্পূর্ণ করে তুলেছে তার কারণ, শিক্ষা বলতে জাপান সমস্ত দেশের শিক্ষা বুঝেছে - ভদ্রলোক বলে এক সংকীর্ণ শ্রেণীর শিক্ষা বোঝে নি মুখে আমরা যাই বলি, দেশ বলতে আমরা যা বুঝি সে হচ্ছে ভদ্রলোকের দেশ জনসাধারণকে আমরা বলি ছোটলোক; এই সংজ্ঞাটা বহুকাল থেকে আমাদের অস্থিমজ্জায় প্রবেশ করেছে ছোটোলোকদের পক্ষে সকল প্রকার মাপকাঠিই ছোটো তারা নিজেও সেটা স্বীকার করে নিয়েছে বড়ো মাপের কিছুই দাবি করবার ভরসা তাদের নেই তারা ভদ্রলোকের ছায়াচর, তাদের প্রকাশ অনুজ্জ্বল, অথচ দেশের অন্তত, বারো আনা অনালোকিত ভদ্রসমাজ তাদের স্পষ্ট করে দেখতেই পায় না, বিশ্ব সমাজের তো কথাই নেই
রাষ্ট্রীূয় আলোচনার মত্ত অবস্থায় আমরা মুখে যাই কিছু বলি না কেন, দেশাভিমান যত তারস্বরে প্রকাশ করি না কেন, আমাদের দেশ প্রকাশহীন হয়ে আছে বলেই কর্মের পথ দিয়ে দেশের সেবায় আমাদের এত ঔদাসীন্য যাদের আমরা ছোট করে রেখেছি মানবস্বভাবের কৃপণতাবশত, তাদের আমরা অবিচার করেই থাকি তাদের দোহাই দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে অর্থ সংগ্রহ করি, কিন্তু তাদের ভাগে পড়ে বাক্য, অর্থটা হচ্ছে, দেশের যে অতি ক্ষুদ্র অংশে বুদ্ধি বিদ্যা, ধন মান সেই শতকরা পাঁচ পরিমাণ লোকের সঙ্গে পঁচান্নব্বই পরিমাণ লোকের ব্যবধান মহাসমুদ্রে ব্যবধানের চেয়ে বেশি আমরা এক দেশে আছি, অথচ আমাদের এক দেশ নয়৯৩
রাশিয়ার অনেক কড়াকড়িকে স্বীকার করেও প্রশংসা করেছেন যে, শিক্ষার আলোকে অন্তত পক্ষে তাহা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন এবং এখানে ধনী নির্ধনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই - কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষাটা যেনো উচ্চবিত্তের জন্য শুধু তাই কবি বলেছেন-
আমাদের দেশের আথিৃক দারিদ্র দুঃখের বিষয়, লজ্জার বিষয়, আমাদের দেশের শিক্ষার অকিঞ্চিৎকরত্ব এই অকিঞ্চিৎকরত্বের মূলে আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অস্বাভাবিকতা, দেশের মাটির সঙ্গে এই ব্যবস্থার বিচ্ছেদ চিত্তবিকাশের যে আয়োজনটা স্বভাবতই সকলেই চেয়ে আপন হওয়া উচিত ছিল সেইটাই রয়েছে সবচেয়ে পর হয়ে- তার সঙ্গে আমাদের দড়ির যোগ হয়েছে, নাড়ীর যোগ হয় নি, এর ব্যর্থতা আমাদের স্বজাতিক ইতিহাসের শিকড়কে জীর্ণ করছে, খর্ব করে দিচ্ছে সমস্ত জাতির মানসিক পরিবৃদ্ধিকে দেশের বহুবিধ অভিপ্রয়োজনীয় বিধি ব্যবস্থায় অনাত্মীয়তার দুঃসহ ভার অগত্যাই চেপে রয়েছে; আইন আদালত, সকলপ্রকার সরকারি কার্যবিধি, যা বহুকোটি ভারতবাসীর ভাগ্য চালনা করে, তা সেই বহুকোটি ভারতবাসীর পক্ষে সম্পূর্ণ দুর্বোধ, দুর্গম
... দেশের চিত্তের সঙ্গে এই দূরত্ব এবং সেই শিক্ষার অপমানজনক স্বল্পতা দীর্ঘকাল আমাকে বেদনা দিয়েছে, কেননা নিশ্চিত জানি সকল পরাশ্রয়তার চেয়ে ভয়াবহ শিক্ষায় পরধর্ম এ সম্বন্ধে বরাবর আমি আলোচনা করেছি, আবার তার পুনরুক্তি করতে প্রবৃত্ত হলেম, যেখানে ব্যথা সেখানে বারবার হাত পড়ে আমার এই প্রসঙ্গে পুনরুক্তি অনেকেই হয়তো ধরতে পারবেন না, কেননা অনেকেরই কানে আমার সেই পুরোনা কথা পৌঁছায় নি
... যে সমাজের এক অংশে শিক্ষার আলোক পড়ে অন্য বৃহত্তর অংশ শিক্ষাবিহীন, সে সমাজ আত্মবিচ্ছেদের অভিশাপে অভিশপ্ত সেখানে শিক্ষিত অশিক্ষিতের মাঝখানে অসূর্যস্পশ্য অন্ধকারের ব্যবধান দুই ভিন্নজাতীয় মানুষের চেয়েও এদের চিত্তের ভিন্নতা আরও বেশি প্রবল৯৪
মাতৃভাষার মাধ্যমে যেসব জীবনের পূর্ণতা আসে তেমনি মনুষ্যত্বের বিকাশ দেশপ্রেমের গভীরতা এবং স্বাদেশিক চেতনাও আসে-
আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, আমরা যেমন মাতৃক্রোড়ে জন্মেছি তেমনি মাতৃভাষার ক্রোড়ে আমাদের জন্ম, এই উভয় জননীই আমাদের পক্ষে সজীব ও আপরিহার্য
মাতৃভাষায় আমাদের আপন ব্যবহারের অতীত আর একটি বড়ো সার্থকতা আছে আমার ভাষা যখন আমার নিজের মনোভাবের প্রকৃষ্ট বাহন হয় তখনই অন্য ভাষার মর্মগত ভাবের সঙ্গে আমার সহজ ও সত্য সম্বন্ধ স্থাপিত হতে পারে আমি যদিচ বাল্যকালে ইস্কুল পালিয়েছি কিন্তু বুড়ো বয়সে সেই ইস্কুল আবার আমাকে ফিরিয়ে এনেছে আমি তাই ছেলে পড়িয়ে কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করেছি আমার বিদ্যালয়ে নানা শ্রেণীর ছাত্র এসেছে, তার মধ্যে ইংরেজি শেখা বাঙালি ছেলেও কখনও কখনও আমরা পেয়েছি আমি দেখেছি, তাদেরই ইংরেজি শেখানো সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার যে বাঙালির ছেলে বাংলা জানে না, তাকে ইংরেজি শেখাই কী অবলম্বন করে ভিক্ষুকের সঙ্গে দাতার যে সম্বন্ধ তা পরস্পরের আন্তরিক মিলনের সম্বন্ধ নয় ভাষাশিক্ষায় সেইটে যদি ঘটে, অর্থাৎ একদিকে শূন্য ঝুলি আর একদিকে দানের অন্ন, তা হলে তাতে গ্রহীতাকে একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে হয় কিন্তু, এই ভিক্ষাবৃত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত উপজীবিকাতে কখনও কল্যাণ হয় না নিজের ভাষা থেকে দাম দিয়ে তার প্রতিদানে অন্য ভাষাকে আয়ত্ত করাই সহজ
সুতরাং প্রত্যেক দেশ যখন তার স্বকীয় ভাষাতে পূর্ণতা লাভ করবে তখনই অন্য দেশের ভাষার সঙ্গে তার সত্যসম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে ভাষার এই সহযোগিতায় প্রত্যেক জাতির সাহিত্য উজ্জ্বলতর হয়ে প্রকাশমান হবার সুযোগ পায় যে নদী আমার গ্রামের কাছ দিয়ে বহমান, তাতে যেমন গ্রামের এপারে ওপারে খেয়া-পারাপার চলে তেমনি আবার তাতে পণ্যদ্রব্য বহন করে বিদেশের সঙ্গে কারবার হতে পারে কেননা সেই বহমান নদীর সঙ্গে অন্যান্য নানা নদীর সম্বন্ধ সচল৯৫
১৯১৯ সালের ৭ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ মুরারি চাঁদ কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সংবর্ধনার পর একটি ভাষণ দেন ভাষণটি শান্তি নিকেতনপত্রিকায় এবং পরবর্তীকালে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে মডার্ন রিভিউতেপ্রকাশিত হয় শান্তি নিকেতনপত্রিকায় প্রকাশিত ভাষণটির শিরোনাম ছিলো - আকাক্সক্ষা প্রবন্ধটির সর্বত্রই তিনি আমাদের শিক্ষার কথাই বলেছেন ভাষণের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি
কোন পাথেয় নিয়ে তোমরা এসেছ? মহৎ আকাক্সক্ষা তোমরা বিদ্যালয়ে শিখবে বলে ভর্তি হয়েছ কি শিখতে হবে ভেবে দেখ পাখি তার বাপ-মায়ের কাছে কি শেখে? পাখা মেলতে শেখে, উড়তে শেখে মানুষকেও তার অন্তরের পাখা মেলতে শিখতে হবে; তাকে শিখতে হবে কি করে বড় করে আকাক্সক্ষা করতে হয় পেট ভরাতে হবে ও শেখাবার জন্য বেশি সাধনার দরকার নেই কিন্তু পুরোপুর মানুষ হতে হবে এই শিক্ষার জন্যে যে অপরিমিত আকাক্সক্ষার দরকার তাকেই শেষ পর্যন্ত জাগিয়ে রাখবার জন্য মানুষের শিক্ষা ৯৬
শিক্ষা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের এ চিন্তা আজীবন জাগরুক ছিল
তথ্যনির্দেশ
১.         শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী
২.         আশ্রমের শিক্ষা, রবীন্দ্র রচনাবলী ২৭, পৃ. ৩২৫
৩.        শিক্ষা ও শিক্ষার লক্ষ্য, রবীন্দ্র রচনাবলী ১২, পৃ. ২৯০
৩.(ক)  তোতাকাহিনী, লিপিকা, রবীন্দ্র রচনাবলী ২৬, পৃ. ১৩২
৪.         পুলিনবিহারী সেন, রবীন্দ্রায়ন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৩০
৫.        বৃত্তাবদ্ধ রবীন্দ্রনাথ, সফিউদ্দিন আহমদ, পৃ. ৫৯
৬.        পুলিন বিহারী সেন, রবীন্দ্রায়ন, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৩২
৭.         রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ধর্ম, বিশ্বভারতী, পৃ. ১২৯
৮.        রবীন্দ্র ঠাকুর, লক্ষ্য ও শিক্ষা, রবীন্দ্র রচনাবলী-২৬, পৃ.  ৫৭৩
৯.        আহ্বান সঙ্গীত, রবীন্দ্র রচনাবলী-২য় খণ্ড, পৃ. ১১৫
১০.        প্রবন্ধটি ১২৯০ সালের কার্তিক মাসে ‘‘ভারতী’’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, পৃ. ২৮৯-৯০
১১.        রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিক্ষা সংস্কার, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ২৮৯
১২.        শিক্ষার হেরফের, শিক্ষা সংস্কার, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৫৬০
১৩.       জীবন স্মৃতি, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৭, পৃ. ২৬১
১৪.        সাহিত্য সম্মেলন, রবীন্দ্র রচনাবলী-৮, পৃ. ৫০২
১৫.        সভাপতির ভাষণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-২৩, পৃ. ৪৭১
১৬.       জীবন স্মৃতি, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৭, পৃ. ২৬৮
১৭.        জীবন স্মৃতি, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৭, পৃ. ২৬৮
১৮.       আহবান সঙ্গীত, রবীন্দ্র রচনাবলী-২, পৃ. ১১৫
১৯.       লাইব্রেরী, রবীন্দ্র রচনাবলী-৫, পৃ. ৪৩৯
২০.        সাহিত্য সম্মেলন, রবীন্দ্র রচনাবলী-৮, পৃ. ৪৯৩
২১.        শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৪১৮
২২.        ছাত্র সম্ভাষণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-৩, পৃ. ৫৭৯
২৩.       সাহিত্য সম্মেলন, রবীন্দ্র রচনাবলী-৮, পৃ. ৫১২
২৪.        শিক্ষার বাহন, পরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৪৯৭
২৫.        শিক্ষার বাহন, পরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৪৯৭ 
২৬.       শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ২৭৭ 
২৭.        শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ২৯০
২৮.       শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ২৯৮
২৯.        শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৩১২
৩০.       শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৩১৫
৩১.       শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৩৪০
৩২.       ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-৩য় খণ্ড, পৃ. ৫৭৯-৮০
৩৩.       ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-৩য় খণ্ড, পৃ. ৫৭৯-৮০  
৩৪.       বাংলা সাহিত্যের প্রতি অবজ্ঞা, রবীন্দ্র রচনাবলী-৮ম খণ্ড, পৃ. ৪৬১
৩৫.       জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ২৬১
৩৬.       শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ৭০৯
৩৭.       ছেলেবেলা, রবীন্দ্র রচনাবলী-২৬, পৃ. ৫৯৪
৩৮.       শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৭০৯-৭১০
৩৯.       শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৭৫৬
৪০.        শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ২৭৮
৪১.        শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ২৮১
৪২.        শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ২৮২-৮৩
৪৩.       শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ২৮৫-৮৬
৪৪.        শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ২৮৫-৮৬
৪৫.        শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ২৮৬-৮৭
৪৬.       শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ২৮৭-৮৮
৪৭.        গ্রন্থ পরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ৬১৮-১৯
৪৮.       সাহিত্যের গৌরব, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ৫১৮
৪৯.       শিক্ষার হেরফের প্রবন্ধের অনুবৃত্তি, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২শ খণ্ড, পৃ. ২৯২
৫০.       শিক্ষার সংস্কার, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ২৯২
৫১.        শিক্ষার সংস্কার, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ২৯৪
৫২.        বাংলা জাতীয় সাহিত্য, রবীন্দ্র রচনাবলী-৮, পৃ. ৪১৫
৫৩.       ভাষা বিচ্ছেদ, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৫৪৭
৫৪.    মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আমাদের কবিতা, সফিউদ্দিন আহমদ, ৭ম জাতীয় কবিতা উৎসবে মূলপ্রবন্ধ (১৯৯৩), দৈনিক সংবাদ
৫৫.       ভাষা বিচ্ছেদ, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৫৪৬-৪৭
৫৬.       শিক্ষা সমস্যা, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ২৯৭
৫৭.        শিক্ষা সমস্যা, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ২৯৭
৫৮.       শিক্ষা সমস্যা, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ২৯৯
৫৯.       শিক্ষা সমস্যা, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৩০৩
৬০.       শিক্ষা সমস্যা, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৩০৮
৬১.       শিক্ষা সমস্যা, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৩১০
৬২.       শিক্ষা সমস্যা, রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ. ৩১২
৬৩.       অপর পক্ষের কথা, রবীন্দ্র রচনাবলী-১০, পৃ. ৫৮৩-৮৫
৬৪.       ব্রতধারণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-৩, পৃ. ৬২০
৬৫.       অবস্থা ও ব্যবস্থা, রবীন্দ্র রচনাবলী-৩, পৃ. ৬০০
৬৬.       সাহিত্য সম্মেলন, রবীন্দ্র রচনাবলী-৮ম খণ্ড, পৃ. ৫০২
৬৭.       সাহিত্য সম্মেলন, রবীন্দ্র রচনাবলী-৮ম খণ্ড, পৃ. ৫০২
৬৮.       শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮শ খণ্ড, পৃ. ৫০০
৬৯.       শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮শ খণ্ড, পৃ. ৫০১
৭০.        শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮শ খণ্ড, পৃ. ৫০৩
৭১.        শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮শ খণ্ড, পৃ. ৫০৫
৭২.        শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮শ খণ্ড, পৃ. ৫১০
৭৩.       শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮শ খণ্ড, পৃ. ৫১২
৭৪.        শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮শ খণ্ড, পৃ. ৫১৩
৭৫.        শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮শ খণ্ড, পৃ. ৫১৬
৭৬.       শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮শ খণ্ড, পৃ. ৫১৮
৭৭.        শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮শ খণ্ড, পৃ. ৫০৪
৭৮.       বিজ্ঞান সভা, রচনাবলী-১২, পৃ. ৫১৯
৭৯.        শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৫০২
৮০.       শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৫০৪
৮১.       শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৫০৫
৮২.       শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৫১০
৮৩.       শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৫০৭
৮৪.       শিক্ষার বাহন, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৫১২
৮৫.       বিদ্যা যাচাই, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৩৬০
৮৬.       সভাপতির অভিভাষণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-ঐ ২৩
৮৭.      সাহিত্য সম্মেলন, রবীন্দ্র রচনাবলী-৮ম খণ্ড, পৃ. ৪৮৫
৮৮.      হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৪৭৬
৮৯.      শিক্ষার বিকিরণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৩০৮
৯০.      শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ, রবীন্দ্র রচনাবলী-১৮, পৃ. ৩১৮
৯১.      বাংলা ভাষা পরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী-২৬, পৃ. ৩৯২
৯২.       শিক্ষার বিকিরণ,
৯৩.      রাশিয়ার চিঠি, রবীন্দ্র রচনাবলী-২০, পৃ. ২৮৩
৯৪.      শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ
৯৫.      সাহিত্যের পথে, রবীন্দ্র রচনাবলী-২৩, পৃ. ৪৭৩
৯৬.     রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আকাক্সক্ষা, শান্তিনিকেতন পত্রিকা, ১৯১৯

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন