শিক্ষাবিদ
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
মোহাম্মদ আনসারুজ্জামান
উনিশ
শতক বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক
ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনাকাল। এ নবজাগরণের পথিকৃৎ ছিলেন রাজা
রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩)। এ তেজস্বী মহাপুরুষের রূঢ় আঘাতেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হিন্দু
বাঙালি সমাজের চৈতন্য ফিরে আসতে শুরু করে।
এ
সময় আর একজন শক্ত, সামর্থ্যবান, দৃঢ়চেতা, প্রত্যয়ী
মানুষ বাঙালি সমাজকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আঠারো শত উনত্রিশ সালের পয়লা
জুন, নয় বছর বয়সে সংস্কৃত কলেজে তৃতীয়
শ্রেণীতে তিনি ভর্তি হন। বীরসিংহ গ্রামের গুরুমশায় কালীকান্ত
ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা ঠাকুর দাসকে ডেকে বলেছিলেন - ঈশ্বরের এ পাঠশালার শিক্ষা শেষ। তিনি এটাও বলেছিলেন ঈশ্বরকে কলকাতায়
নিয়ে ইংরেজি বিদ্যা শেখাতে। ঈশ্বরচন্দ্র কলকাতা যাবেন এটা
ঠিক। কিন্তু কী পড়বেন তিনি? এ
নিয়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব স্পষ্টতই দুভাগ
হয়ে গেলেন। একদল সংস্কৃত শিক্ষার পক্ষে অন্যদল
ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে। ইংরেজি অর্থকরী শিক্ষা - এটা
মানলেও বেঁকে বসলেন ঈশ্বরচন্দ্রের পিতা ঠাকুরদাস। ইংরেজি
লেখাপড়া শিখে ঈশ্বরচন্দ্র বেশি আয় করবেন - এটা চাইলেন না তিনি। তার চেয়ে সংস্কৃত শিখে ঈশ্বর
টোল - চতুষ্পাঠি খুলে শিক্ষকতা করবেন - এটাই চাইলেন ঠাকুর দাস। সুতরাং ঈশ্বরচন্দ্র ভর্তি হলেন
সংস্কৃত কলেজে।
এর
আগে থেকেই কলকাতা শহর দ্রুত নাগরিক রূপ পেতে শুরু করেছে। সেখানে
নতুন জীবনযাত্রা, নতুন কাজকর্ম, নতুন
শিক্ষা-দীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল কলকাতা।
গভর্নমেন্ট
সংস্কৃত কলেজের পাশেই হিন্দু কলেজ। একই বাড়ির দুই অংশে দুই কলেজ। দুই ঐতিহ্যের আর দুই মূল্যবোধের
দুই শিক্ষালয়। সংস্কৃত কলেজ তখন প্রবেশাধিকার
সংরক্ষিত শুধু ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য সন্তানদের।
হিন্দু
কলেজে আধুনিকতা বা ইংরেজি শিক্ষার অনুকূল আবহাওয়া পুষ্ট ধনিক শ্রেণীর সন্তানদের। ঈশ্বরচন্দ্র বার বছরের সংস্কৃত
কলেজের জীবনে অনেক কৃতিত্ব দেখিয়ে অনেক পুরস্কার ও বৃত্তি পেয়েছেন।
এই
কলেজের ছাত্রাবস্থাতেই ঈশ্বরচন্দ্র বেদান্ত,
স্মৃতি, ন্যায়
এবং ধর্মশাস্ত্রের নানা পাঠ ও সংস্কৃত সাহিত্যের ধ্র“পদী
রচনার সঙ্গে পরিচিত হন। এসবই তাকে করতে হয়েছে কলকাতার
ভাড়া বাড়িতে বিশাল পুরুষ সংসারের রান্না খাওয়া থেকে শুরু করে, সংশ্লিষ্ট
সব কাজ নিজ হাতে করে। দরিদ্র পিতার সাধ্য ছিল না এসব
কাজের জন্য একটি বাড়তি লোক রাখা। তবে পিতার একটিমাত্র আদেশ - পড়, পড়
এবং পড়। সুবোধ বালকের মত ঈশ্বরচন্দ্র
পিতার আদেশের একমাত্র শিরোধার্য মনে করেছেন।
ঈশ্বরচন্দ্র
যখন অধ্যয়নের তপস্যায় রত তখন বাইরে চলছে অন্যরকম কোলাহল। ১৮২৯
সালে লর্ড বেন্টিক সহমরণ ও সতীদাহ নিবারণ আইন চালু করলেন। এ
নিয়ে সমাজে পক্ষ ও বিপক্ষের তুমুল বিতর্ক চলছে। হিন্দু
কলেজের অধ্যাপক ডিরোজিওর আদর্শে গড়ে উঠেছে ইয়ং বেঙ্গল দল। যা
কিছু হিন্দুয়ানী সবকিছুই তাদের কাছে পরিত্যাজ্য। ডিরোজিও
ছিলেন আদর্শ শিক্ষক। তিনি ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাসের
অধ্যাপক। ডিরোজিও আরও ছিলেন কবি, বায়রনের
বিশেষ ভক্ত, হিউম ও কান্টের দর্শনের প্রতি
অনুরাগী। অধ্যয়ন ও অধ্যাপনায় তাঁর কোন
ক্লান্তি ছিল না। ছাত্রের মনে কৌতূহল জাগিয়ে তোলাই
ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। ছাত্রদের প্রতি ডিরোজিওর উপদেশ
ছিল - জিজ্ঞাসু হও, “ও ধিঃপয ঃযব মবহঃষব ড়ঢ়বহরহম ড়ভ
ুড়ঁৎ সরহফং” এবং সত্যনিষ্ঠ হও, “ঃড়
ষরাব ধহফ ফরব ভড়ৎ ঃৎঁঃয”. যাঁরা ডিরোজিওর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন
তাঁদের জন্য ইউরোপের জ্ঞানের ভাণ্ডার খুলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। ডিরোজিওর শিষ্যদের কেউ কেউ তখন
ধর্মান্তরিত হচ্ছেন, কেউ কেউ উগ্র বামাচারী ব্যবহার
করছেন। ঈশ্বরচন্দ্র এসবের প্রত্যক্ষদর্শী। কিন্তু এসবের কোন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
তাঁর মধ্যে দেখা যায় না।
১৮৩৯
সালের এপ্রিল মাসে ঈশ্বরচন্দ্র ল কমিটির পরীক্ষায় পাশ করলেন। এবার
আদালতের জজ পণ্ডিতের চাকুরি পাবার সম্ভাবনা দেখা দিল। কিন্তু
ঈশ্বরচন্দ্রের বাবা এত বড় চাকুরি ওটাও ছুঁড়ে ফেলে দিলেন - কারণ তখনও যে ঈশ্বরচন্দ্রের
পড়া শেষ হয় নি। দরিদ্র ঠাকুর দাস বিত্তের চেয়ে
বিদ্যাকেই সব সময় প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন।
বার বছর
পাঁচ মাস সংস্কৃত কলেজে পড়াশুনা করার পর ১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দে ৪ঠা ডিসেম্বর ঈশ্বরচন্দ্র
সংস্কৃত কলেজের প্রশংসাপত্র পেলেন।
কর্মবীর
ঈশ্বরচন্দ্র ভবিষ্যতের কর্মযজ্ঞের জন্য এভাবেই নিজেকে তৈরি করেছিলেন। এরপর সরাসরি কর্মজীবন। ১৮৪১ সালে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম
কলেজের সেরেস্তাদার বা প্রধান পণ্ডিত। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজটি ছিল ইংরেজ
সিভিলিয়ানদের এদেশী ভাষা শিক্ষা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। এই
প্রথম বিদ্যাসাগরের শিক্ষিত ইংরেজদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ। প্রায়
পাঁচ বছর ফোর্ট উইলিয়ামে কাজ করার পর বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে কাজ করার সুযোগ পান। ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কৃত কলেজের
সহকর্মী সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হন। খুব উৎসাহের সঙ্গে সংস্কৃত কলেজের
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের কিছু প্রস্তাব দেন। মার্শাল
সাহেব বিদ্যাসাগরের প্রস্তাবগুলোর খুব প্রশংসা করেন। কিন্তু
সংস্কৃত কলেজের তৎকালীন সম্পাদক রসময় দত্তের প্ররোচনাই বিদ্যাসাগরের রিপোর্টটি বাতিল
হয়ে যায়। বিদ্যাসাগর বুঝতে পারেন স্বাধীনভাবে
এখানে কাজ করা সম্ভব হবে না। শুধু টাকার জন্য চাকুরি করা অর্থহীন
মনে হল তাঁর কাছে। তাই সেখান থেকে পদত্যাগ করলেন
তিনি।
এরপর
আবার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। সেখানে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব
পালন করলেন। পরবর্তীতে শিক্ষা সাংসদের উদ্যোগে
বিদ্যাসাগরকে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদে ফিরিয়ে আনা হয়। এবার
বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজকে বিধিসম্মত ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার সুযোগ পেলেন।
সংস্কৃত
কলেজে ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য ছাড়া কেও ভর্তি হতে পারত না। বিদ্যাসাগর
এসেই প্রথমে কায়স্থ ও পরে যে কোন সম্ভ্রান্ত হিন্দু সন্তানের জন্য সংস্কৃত কলেজে পড়ার
সুযোগ করে দিলেন। সংস্কৃত কলেজ প্রথমে ‘প্রতিপদ’ ও
‘অষ্টমী তিথিতে’ বন্ধ থাকত। বিদ্যাসাগর নিয়ম করলেন, শুধু
রবিবার কলেজ বন্ধ থাকবে। সংস্কৃত কলেজে ছাত্ররা বিনা বেতনে
পড়ত। বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি ও মাসিক
বেতনের ব্যবস্থা করলেন। হিন্দু কলেজ ও মাদ্রাসার মেধাবী
ছাত্রদের সেকালে ডেপুটির চাকরি দেওয়া হত।
বিদ্যাসাগরের
চেষ্টায় সংস্কৃত কলেজের মেধাবী ছাত্রদেরও ডেপুটিগিরি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়।
১৮২৭
সালে সংস্কৃত কলেজে একটি ইংরেজি শ্রেণী খোলা হয়। এটি
বন্ধ হয়ে গেলে ১৮৪২ সালে আবার খোলা হয়।
বিদ্যাসাগর
বিশ্বাস করতেন সংস্কৃত কলেজের ছাত্রদের একই সঙ্গে সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত হয়ে
ওঠা দরকার। কলকাতা সংস্কৃত কলেজকে উপযুক্ত
করে গড়ে তুলতে চাইলেন বিদ্যাসাগর। সংস্কৃত কলেজের ইংরেজি শ্রেণীর
জন্য নতুন ও বিস্তৃত নিয়মাবলি রচিত হল।
ইংরেজি
হয়ে উঠল অবশ্য শিক্ষণীয় বিষয়। আগে অঙ্ক শেখান হতে সংস্কৃতে, পড়ানো
ভাষ্করাচার্যের ‘‘লীলাবতী ও বীজগণিত’’। বিদ্যাসাগর সে ব্যবস্থা রদ করে
ইংরেজিতে শেখানোর ব্যবস্থা করলেন। নতুন ব্যবস্থায় সংস্কৃত কলেজের
ছাত্রসংখ্যা বেড়ে গেল। এতে কাউন্সিল অভ এডুকেশনও তুষ্ট।
আসলে
বিদ্যাসাগরের দূরদর্শিতা ছিল অসাধারণ।
পাশ্চাত্য
ও প্রাচ্যবিদ্যার সম্মিলনের কথা সেদিন আর কেও ভাবেন নি। রবীন্দ্রনাথ
এ প্রসঙ্গে বলেছেন-“তিনি (বিদ্যাসাগর) পাশ্চাত্য
ও প্রাচ্যবিদ্যার মধ্যে সম্মিলনের সেতুস্বরূপ হয়েছিলেন ...। তিনি
যা কিছু পাশ্চাত্ত্য, তাকে অশুচি বলে অপমান করেন নি। তিনি জানতেন, বিদ্যার
মধ্যে পূর্ব পশ্চিমের দিগবিরোধ নেই। তিনি নিজে সংস্কৃত শাস্ত্রে বিশেষ
পারদর্শী ছিলেন, অথচ তিনিই বর্তমান য়ুরোপীয় বিদ্যার
অভিমুখে ছাত্রদের অগ্রসর করবার প্রধান উদ্যোগী হয়েছিলেন।১
বিদ্যাসাগরের
একটি বড় অবদান ছিল নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে।
ছোটলাট
হ্যালিডের অনুরোধে বিদ্যাসাগর বিভিন্ন অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয় প্রবর্তন করেন। ১৮৫৫-৫৮ সালের খ্রিষ্টাব্দের
মধ্যে বিদ্যাসাগর ৪০টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সরকার
এ বিদ্যালয়গুলোর ব্যয়ভার বহন না করায় নিজের চেষ্টায় বহুদিন এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে
রাখেন।
স্ত্রী
শিক্ষার ক্ষেত্রে বেথুন কলেজ গড়ে তোলা বিদ্যাসাগরের একটি বড় কাজ। ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে
বিদ্যাসাগর বেথুন স্কুলের সম্পাদক নিযুক্ত হন। বিদ্যাসাগরের
প্রচেষ্টায় নানাক্ষেত্রে বেথুন স্কুলের যথেষ্ট উন্নতি হয়।
উচ্চশিক্ষা
প্রসার ও প্রতিষ্ঠায়ও বিদ্যাসাগরের অবদান কম নয়। মেট্রোপলিটান
কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বিদ্যাসাগর সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। তখনও
কোন বাঙালি ইংরেজি কলেজ চালান নি। ভারতবর্ষে বিদ্যাসাগরই প্রথম
ব্যক্তি যিনি সাহেব অধ্যাপক না নিয়ে ইংরেজি কলেজ খুলেছিলেন। ইংরেজ
কর্তাব্যক্তিরা কলেজের ব্যাপারে খুব সন্দিহান ছিলেন। ইংরেজ
ছাড়া কলেজ চলবে না এটাই ছিল তাদের বিশ্বাস।
বিদ্যাসাগর
ঠিকই ইংরেজি কলেজ সাফল্যের সঙ্গে চালিয়ে গেলেন। ১৮৭৪
সালে মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনের ভাল ফলাফল হল। প্রেসিডেন্সি
কলেজের অধ্যক্ষ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সাটক্লিফ সাহেব বললেন, “ঞযব
চঁহফরঃ যধং ফড়হব ড়িহফবৎং”. ১৮৭৯ সালে মেট্রোপলিটান কলেজ
ফাস্টগ্রেড কলেজে পরিগণিত হল। মেট্রোপলিটান কলেজ থেকে ছাত্ররা
বি. এ. পরীক্ষা দিল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- “সংস্কৃত
কলেজের কর্ম ছাড়িয়ে দিবার পর বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন। বাঙালীর নিজের চেষ্টায় এবং নিজের
অধীনে উচ্চতর শিক্ষার কলেজ স্থাপন এই প্রথম।
আমাদের
দেশে ইংরেজি শিক্ষাকে স্বাধীনভাবে স্থায়ী করিবার এই প্রথম ভিত্তি বিদ্যাসাগর কর্তৃক
প্রতিষ্ঠিত হইল। যিনি দরিদ্র ছিলেন, তিনি
দেশের প্রধান দাতা হইলেন। যিনি লোকাচার রক্ষক ব্রাহ্মণ
পণ্ডিতের বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, তিনি লোকাচারের একটি সুদৃঢ় বন্ধন
হইতে সমাজকে মুক্ত করিবার জন্য সুকঠোর সংগ্রাম করিলেন এবং সংস্কৃত বিদ্যায় যাঁহার অধিকারের
ইয়ত্তা ছিল না। তিনিই ইংরেজি বিদ্যাকে প্রকৃত
প্রস্তাবে স্বদেশের ক্ষেত্রে বদ্ধমূল করিয়া রোপণ করিয়া গেলেন।২
আজীবন
শিক্ষার সাঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। রামমোহনের হাতে বাংলা গদ্য একটি
পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল নিঃসন্দেহে। বিদ্যাসাগর সেই আরও সুশৃঙ্খল, পরিমিতিবোধ
ও অবিচ্ছিন্ন ধ্বনিপ্রবাহ সৃষ্টি করে তাকে একটি উচ্চস্তরে উন্নীত করেন। বিদ্যাসাগর প্রধানত শিক্ষক ও
জনসেবকের ভূমিকার প্রয়োজনেই সাহিত্য ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। বিদ্যাসাগর
রচিত গ্রন্থের অধিকাংশই বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক ও কিছু সাহিত্যের ভাবানুবাদ। বিদ্যাসাগরের গ্রন্থ রচনার প্রথম
কারণ ছিল শিক্ষা, দ্বিতীয় কারণ ছিল সাহিত্য সৃষ্টি। ‘বর্ণপরিচয়’ রচনা
গণশিক্ষা বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার। শকুন্তলা, ভ্রান্তিবিলাস, সীতার
বনবাস অনুবাদ হলেও তা অভিনব রূপান্তর, যা মানসকে সাহিত্যরসে সিঞ্চিত
করে। অনুবাদ হলেও এ গ্রন্থগুলোর মধ্যে
সাহিত্যের রসানুভূতিকে অনুভব করা যায়।
সমাজ
সংস্কারকের ভূমিকায় বিদ্যাসাগরের অবদানও বিরাট। মানবকেন্দ্রিক
চিন্তাধারাই ছিল নবযুগের ঐতিহাসিক লক্ষণ।
এই সঙ্গে
যুক্ত ছিল কুসংস্কার, অন্যায় অযৌক্তিক, বুদ্ধিহীন
ও মোহাচ্ছন্ন সবকিছুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ।
বিদ্যাসাগর
এ নবযুগের এক অক্লান্ত কর্মী। তবে বিদ্যাসাগরকে সমাজ সংস্কারক, সাহিত্য
অনুবাদক, পাঠ্যপুস্তক লেখক, শিক্ষক, শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান নির্মাণকারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাণসঞ্চারী
- কোনটি বিদ্যাসাগরের প্রধান পরিচয় তা এক কথায় বলা মুশকিল। তবে
বিদ্যাসাগর চরিত্রের মূলে ছিল শিক্ষা, শিক্ষার আধুনিকায়ন ও সমাজকে বিশ্লেষণ
করার অভূতপূর্ব ক্ষমতা। তবে সবকিছু হিসেবে এনেও ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগরকে আমরা বলতে চাই ‘‘শিক্ষাব্রতী শিক্ষাবিদ’’ ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগর। সে সঙ্গে স্মরণ করি সেই বিখ্যাত
পংক্তি - ‘‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ
...”।
গ্রন্থপঞ্জী
১. শিক্ষাদর্শন পদ্ধতি ও সমস্যার ইতিহাস, রণজিৎ
দাস, কলিকাতা ১১৮৬, পৃ.
১৫৭
২. ঐ, পৃ. ১৬২-১৬৩
৩. বিদ্যাসাগর রচনাবলী, প্রথম
খণ্ড, রাজসংস্করণ, তুলি-কলম, ১
কলেজ রোড, কলকাতা
৪. বিদ্যাসাগর রচনাবলী, দ্বিতীয়
খণ্ড, রাজসংস্করণ, তুলি-কলম, ১
কলেজ রোড, কলকাতা
৫. বাঙলা সাহিত্যের রূপরেখা, দ্বিতীয়
খণ্ড, গোপাল হালদার, এ
মুখার্জী অ্যান্ড কোং প্রাইভেট লি:, কলকাতা
৬. সাহিত্যে রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ, প্রথম
পর্ব, জীবেন্দ্র সিংহ রায়, ক্যালকাটা
পাবলিশার্স
৭. মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, বিদ্যাসাগর
সংখ্যা, এয়োদশ বর্ষ, প্রথম
সংখ্যা
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন